ফ্যামিলি কার্ড
মিলবে কিছুটা স্বস্তি

স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত পন্থায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণের ফলে হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মিলবে কিছুটা স্বস্তিÑ এমনটাই বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, সুনির্দিষ্ট একটি সংস্থা বা সংগঠনের মাধ্যমে হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের নির্দিষ্ট তালিকা করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দিতে হবে। তবে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারকে এই কার্ডে আওতায় আনার প্রয়োজন নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারকে কেন কার্ড দেওয়া হবে। বাংলাদেশের মতো একটি দরিদ্র রাষ্ট্রের পক্ষে এত বিশাল সংখ্যক মানুষকে কার্ড দেওয়া প্র্যাকটিক্যাল বা বাস্তবসম্মত নয়।
তবে গ্রেট ব্রিটেনের মতো ওয়েলফেয়ার স্টেট এবং আমেরিকার উদাহরণ টেনে তারা বলেন, সে সব দেশে কেবল প্রকৃত দরিদ্রদেরই সামাজিক নিরাপত্তা ও ফুড স্ট্যাম্প দেওয়া হয়। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরা সেখানে এই ধরনের সুবিধা পায় না। কার্ড বিতরণের ক্ষেত্রে কোন এজেন্সির মাধ্যমে করা হবে এবং কিভাবে মনিটরিং করা হবে সে বিষয়ে আগেই ভাবতে হবে। স্বচ্ছতা ও সঠিক তদারকি ছাড়া কার্ড বিতরণ প্রক্রিয়ায় চরম দুর্নীতির ঝুঁকি থাকবে-এমনই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ফ্যামিলি কার্ড : কী, কেন ও কাদের জন্য? : হতদরিদ্র, দরিদ্র, নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত চারটি শ্রেণিতে ভাগ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড কেবল একটি সহায়তা কর্মসূচি নয়; এটি একটি ‘সামাজিক চুক্তি’ হিসেবে দেখছে সরকার। সরকারের দিক থেকে এটি একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থান। সরকার মনে করছে, এর ফলে নারী যে করুণার বস্তু নয়, উন্নয়নের অংশীদার- সেটি বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে দারিদ্র্য দূর করা মানে যে দান নয়, মানুষের সক্ষমতায় বিনিয়োগ-সেটিও প্রমাণিত হবে।
নারীকেন্দ্রিক উদ্যোগ : এই কার্ড দেওয়া হবে পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক নারী সদস্যের নামে। সরকার মনে করে, নারীরাই পরিবারের ব্যয়ের সবচেয়ে দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপক।
সুবিধা : কার্ডধারী প্রতিটি পরিবার মাসে ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকা সমমূল্যের খাদ্য সহায়তা (চাল, আটা, ডাল, তেল) অথবা নগদ অর্থ পাবে।
লক্ষ্য: পর্যায়ক্রমে দেশের সব পরিবারকে এই সুবিধার আওতায় এনে একটি ‘সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা’ বলয় তৈরি করা।
সরকারী সূত্রে জানা গেছে, মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র’ বিনির্মাণের প্রতিশ্রুতি মতে, দেশে পাঁচ কোটি পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নবনির্বাচিত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর লক্ষ্যে গতকাল সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে ১৪টি উপজেলায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কার্যক্রম পরীক্ষামূলকভাবে চালু করবে সরকার। আগামী ১০ মার্চ এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে।
ফ্যামিলি কার্ড আবেদন করতে যা যা লাগবে: ফ্যামিলি কার্ডের আবেদনের জন্য-আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি, একটি সচল মোবাইল নম্বরসহ কাগজগুলো সংগ্রহে রাখতে বলা হয়েছে।
আবেদন কোথায় করবেন: পাইলট কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর কার্যালয়, সরকারি ডেডিকেটেড অনলাইন পোর্টাল (যা চালুর প্রক্রিয়া চলছে) থেকে আবেদন ফর্ম সংগ্রহ করা যাবে।
বাস্তবায়নে চার মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়: প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে মূল দায়িত্ব দিয়ে একটি নীতিমালা তৈরির করছে। এই কাজে সহায়তা করছে অর্থ, স্থানীয় সরকার এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
ফ্যামিলি কার্ডের কার্যক্রম শুরুর বিষয়ে সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, আগামী ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ প্রকল্পের পাইলটিং কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন। এই কার্যক্রমের জন্য আমরা এই মুহূর্তে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিভাগের ১৪টি উপজেলাকে নির্ধারণ করেছি। এই ১৪টি উপজেলার প্রতিটি থেকে একটি করে ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ডে সর্বজনীনভাবে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হবে। ইনশাআল্লাহ, ১০ মার্চ একযোগে এই ১৪ উপজেলায় কার্যক্রমটি শুরু হবে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং পর্যায়ক্রমে তা সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেয়া হবে।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. জাহিদ বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন ও তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলাই আমাদের লক্ষ্য। একজন নারী স্বাবলম্বী হলে একটি পরিবার স্বাবলম্বী হয় এবং এর মাধ্যমে আগামী প্রজন্মও স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। এটি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রকল্পের ওপর কাজ করেছেন। তার সভাপতিত্বে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়েছে। এই ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সুবিধাভোগীরা প্রতি মাসে ইনশা আল্লাহ দুই হাজার পাঁচ শত (২৫০০) টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবেন।
ধাপে ধাপে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে জানিয়ে পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ঈদের আগেই পাইলট প্রকল্প হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড চালু হবে। হতদরিদ্র পরিবার সবার আগে ফ্যামিলি কার্ড পাবে।
তিনি আরো জানান, নির্বাচনী ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ডের ইস্যু নিয়ে বিস্তারিত উল্লেখ আছে। এটা কার্যকর কিভাবে করবে, সেটা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে, এটা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এদিকে, বিএনপি সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচির মধ্যেও প্রত্যেক পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার বিষয়টি রয়েছে। সবচেয়ে আগে এতে হতদরিদ্ররা অন্তর্ভূক্ত হবেন।
এ প্রসঙ্গে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু আন্তর্জাতিক সূচক রয়েছে, সেটা অনুসরণ করে এবং রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করে যদি দেওয়া হয় তাহলে প্রকৃত বঞ্চিতরা সুবিধাভোগী হবে এবং নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ার পর ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। কারণ হিসাবে তিনি বলছেন, নির্বাচনের আগে দিলে একদিকে কার্ড নির্বাচনের ক্ষেত্রে দুর্নীতির আশঙ্কা বেশি থাকবে, অন্যদিকে কার্ড নির্ধারণের জন্য প্রকৃত ডাটার ঘাটতি থাকতে পারে। সেজন্য একটু সময় দিয়ে দিলে প্রকৃতভাবে যারা পাওয়ার যোগ্য তারা পাবেন।
এ বিষয়ে বিএনপি নেতা ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার এক লেখায় বলেছেন, এই ‘ফ্যামিলি কার্ডের’ শক্তিশালী দিক হলো এর সর্বজনীনতা। এখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রয়োজন হবে না, এটি হবে নাগরিকের অধিকার। বিএনপির তরফ থেকে জানানো হয়, প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হবে। এর মাধ্যমে প্রতি মাসে ২৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। অর্থ ও পণ্য-সেবার পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে বলেও জানানো হয়।
এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত পন্থায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণের ফলে হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মিলবে কিছুটা স্বস্তি।
তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট একটি সংস্থা বা সংগঠনের মাধ্যমে হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের নির্দিষ্ট তালিকা করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দিতে হবে। তবে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারকে এই কার্ডে আওতায় আনার প্রয়োজন নেই।
ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারকে কেন কার্ড দেওয়া হবে। বাংলাদেশের মতো একটি দরিদ্র রাষ্ট্রের পক্ষে এত বিশাল সংখ্যক মানুষকে কার্ড দেওয়া প্র্যাকটিক্যাল বা বাস্তবসম্মত নয়।
তবে গ্রেট ব্রিটেনের মতো ওয়েলফেয়ার স্টেট এবং আমেরিকার উদাহরণ টেনে তারা বলেন, সে সব দেশে কেবল প্রকৃত দরিদ্রদেরই সামাজিক নিরাপত্তা ও ফুড স্ট্যাম্প দেওয়া হয়। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরা সেখানে এই ধরনের সুবিধা পায় না।
তিনি আরও বলেন, কার্ড বিতরণের ক্ষেত্রে কোন এজেন্সির মাধ্যমে করা হবে এবং কিভাবে মনিটরিং করা হবে সে বিষয়ে আগেই ভাবতে হবে। স্বচ্ছতা ও সঠিক তদারকি ছাড়া কার্ড বিতরণ প্রক্রিয়ায় চরম দুর্নীতির ঝুঁকি থাকবে।
ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, এই প্রকল্পটি কার্যকর করতে হলে এটিকে নতুন করে রিভাইজ করা দরকার। তার কিছু সুপারিশ রয়েছে- ১. তালিকা থেকে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের বাদ দিতে হবে। ২. প্রকৃত টার্গেট গ্রুপ (হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্ত) সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে। ৩. বিতরণের জন্য সঠিক এজেন্সি নিয়োগ এবং কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে।
ভোরের আকাশ/এসএইচ