মির্জা ফখরুলই হচ্ছেন বঙ্গভবনের বাসিন্দা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের মনোনীত রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়নপত্র গতকাল বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে জমা দেওয়া হয়। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় বিএনপির ঊর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দ ও সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে সরকার ও বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেন মির্জা ফখরুল। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট থেকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
সংবিধান অনুয়ায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন সংসদ সদস্যদের ভোটে। বর্তমানে জাতীয় সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধীদের সদস্যসংখ্যা সংরক্ষিত নারীসহ ৯০। ফলে ভোটে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীর জয় অনেকটাই নিশ্চিত। সে ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হচ্ছেন, এটা নিশ্চিত। কাজেই বঙ্গভবনের নতুন বাসিন্দা হচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নির্বাচিত হওয়া এখন ভোটের আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর মির্জা ফখরুলের এই নতুন রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত রাজনৈতিক অঙ্গন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের সরকার এমন একজনকে এই আলঙ্কারিক কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য বেছে নিয়েছে, যার গ্রহণযোগ্যতা দলমতের ঊর্ধ্বে। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের নতুন মোড় ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতিতে মির্জা ফখরুলের উত্থান ছিল অত্যন্ত ধৈর্যশীল ও নীতিনিষ্ঠ। প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও তিনি দলের হাল ধরে রেখেছিলেন। তার নম্র আচরণ এবং প্রাজ্ঞ বক্তব্য তাকে দেশজুড়ে পরিচিতি দিয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারে তার রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনীত হওয়া কেবল তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং দীর্ঘদিনের রাজপথের সংগ্রামের এক অনন্য স্বীকৃতি হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
ছাত্র রাজনীতির ইতিহাস: মির্জা ফখরুল ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র থাকাকালীন তার রাজনৈতিক অভিযান শুরু করেন। সেই সময় তিনি পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে (ইপিএসইউ) যোগদান করেন। তিনি সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এসএম হল ইউনিটের মহাসচিব নির্বাচিত হন। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন স্তরের মধ্য দিয়ে উঠে আসেন এবং ১৯৬৯ সালে রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের তুঙ্গে ওঠার সময়, সংগঠনের মর্যাদাপূর্ণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি হন। রাজনৈতিক কারণে তাকে গ্রেপ্তার এবং কারাগারে পাঠানো হয়।
জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ ও ইতিহাস: ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন এবং সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন মির্জা ফখরুল। ১৯৮৮ সালে তিনি নিরপেক্ষ প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে দেশব্যাপী এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে মির্জা ফখরুল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে মির্জা ফখরুলকে আলমগীরকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে আলমগীর তার নিজ জেলা ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৮ সালে তিনি নবম সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও পরাজিত হন। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে আলমগীরকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মনোনীত করা হয়। তিনি ২০১১ সালের ২০ মার্চ থেকে পাঁচ বছর দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হয়ে ২০২৬ সালের ১৩ আগস্ট (অথাৎ) রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দল থেকে অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে তিনি শপথ নিয়েছিলেন না। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন এই রাজনীতিবিদ।
চাকরিজীবন: ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁও জেলায় জন্মগ্রহণকারী আলমগীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক সহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবন শেষ করার পর, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (শিক্ষা ক্যাডারের) সদস্য হিসেবে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি বেশ কয়েকটি সরকারি কলেজে সফল শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অন্য সরকারি দায়িত্বের মধ্যে, তিনি বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরে উপ-পরিচালক এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনে কাজ করেন। তিনি ১৯৭৯ সালের শেষের দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও কাজ করেন। ১৯৮২ সালে এস এ বারী পদত্যাগ করার পূর্ব পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
ব্যক্তিগত জীবন: মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ব্যক্তিগত জীবনে রাহাত আরা বেগমের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছেন এবং বর্তমানে ঢাকায় একটি বীমা কোম্পানিতে কর্মরত। এই দম্পতির দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ এবং মির্জা সাফারুহ। শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছেন এবং এই প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। তিনি বর্তমানে ঢাকার একটি স্বনামধন্য স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।
পারিবারিক ইতিহাস: মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই মির্জা ফয়সল আমীন ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সাধারণ সভাপতি পদে আছেন। তিনিও ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়র ছিলেন। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন, একজন বিশিষ্ট আইনজীবী এবং প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ছিলেন। ঠাকুরগাঁও নির্বাচনি এলাকা থেকে বেশ কয়েকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশ সরকারের কৃষিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
তার চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন একজন বিএনপির রাজনীতিবিদ, যিনি ভূমিমন্ত্রী (১৯৭৮-৭৯), আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী (১৯৯১-৯৬) এবং বাংলাদেশের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের স্পিকার (১৯৭৯-৮২) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মির্জা হাফিজ ১৯৭৯ সালে ঢাকার একটি নির্বাচনি এলাকা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মির্জা ফখরুলের আরেক চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা ১৯৭১ সালের এপ্রিলে গঠিত মুজিবনগর প্রবাস সরকারে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ সুবিধা তদারকির জন্য নবগঠিত যুব শিবির অধিদফতরের প্রধান হিসেবে তাকে মনোনীত করা হয়েছিল।
ঠাকুরগাঁও-১ (সদর) সংসদীয় আসনটি শূন্য: ঠাকুরগাঁও-১ (সদর) সংসদীয় আসনটি শূন্য হচ্ছে। এখন জোর আলোচনা চলছে যে, কে হতে যাচ্ছেন ঠাকুরগাঁও-১ আসনের পরবর্তী সংসদ সদস্য? এ আসনে শিগগিরই উপনির্বাচনের আয়োজন করবে নির্বাচন কমিশন।মির্জা ফখরুলের বড় মেয়ে ড. শামারুহ মির্জা বাবার আসনে নির্বাচন করতে পারেন বলে জানা যাচ্ছে। তিনি গত নির্বাচনে বাবা মির্জা ফখরুলের জন্য ভোটের মাঠে কাজ করেছেন। পেশায় তিনি একজন চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও গবেষক। দীর্ঘদিন ধরে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছেন এবং সেখানে সমাজসেবামূলক কাজের জন্য তার বেশ পরিচিতি রয়েছে। এছাড়া আলোচনায় আছেন ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমীন। এর আগে তিনি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন। স্থানীয় রাজনীতিতে বেশ সক্রিয় তিনি। তিনি ফখরুলের ভাই।
ভোরের আকাশ/এসএইচ