বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার প্রত্যাশায় বাংলাদেশ

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে। এই আকস্মিক সংকট মোকাবিলায় সরকার এখন বিকল্প উৎসের সন্ধানে মরিয়া। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ।
বুধবার (৪ মার্চ) সচিবালয়ে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
বর্তমান বিশ্বের জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার মূলে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই প্রভাব সরাসরি অনুভূত হচ্ছে আমদানির ক্ষেত্রে।
আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে আগের ‘কমিটমেন্ট’ বা চুক্তিগুলো ছিল, পরিস্থিতির অবনতির কারণে সেগুলোর চালান বর্তমানে বন্ধ হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় অস্থিরতার কারণে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বেড়েছে, যা জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে।
সচিবালয়ে সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে বৈঠকে মন্ত্রী বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি চিত্র তুলে ধরেন। আমদানির বিকল্প উৎস হিসেবে এবং বর্তমান ঘাটতি মেটাতে ওয়াশিংটনের সরাসরি সহযোগিতা কামনা করা হয়।
জ্বালানিমন্ত্রী জানান, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের এই অনুরোধ গুরুত্বের সাথে নিয়েছে। পল কাপুর আশ্বস্ত করেছেন যে, তারা তাদের সরকারের উচ্চ পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবেন এবং দ্রুত একটি ইতিবাচক সমাধানের পথ খুঁজবেন। কূটনৈতিক মহলের ধারণা, এলএনজি (LNG) বা জ্বালানি তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ কোনো কোটা বা সহজ শর্তে সহায়তা প্রদান করতে পারে।
দেশের ভেতরে জ্বালানির বর্তমান মজুদের চিত্র খুব একটা সুখকর নয়। মন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, বর্তমানে যে পরিমাণ জ্বালানি দেশে মজুদ আছে, তা দিয়ে বড়জোর চলতি মার্চ মাস পর্যন্ত কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে।
আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার কয়েকটি পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। মজুদকৃত জ্বালানি যাতে অপচয় না হয়, সে বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি সকল পর্যায়ে জ্বালানি ব্যবহারে কৃচ্ছ্রসাধন করতে বলা হয়েছে। শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর না করে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্ত থেকেও জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। সামনে পবিত্র ঈদুল ফিতর। মন্ত্রী আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, যদি দ্রুত নতুন চালান না আসে, তবে ঈদের সময় পর্যন্ত এই সংকট প্রলম্বিত হতে পারে।
জ্বালানি সংকট থাকলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে জনগণকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বলেন, পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক না কেন, সরকার চেষ্টা করছে যাতে দেশে কোনো ‘অসহনীয়’ বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা লোডশেডিং না হয়।
তবে এই আশ্বাসের সঙ্গে তিনি একটি শর্তও জুড়ে দিয়েছেন—আর তা হলো জনসচেতনতা। তিনি বলেন, 'বিদ্যুতের অপচয় বন্ধে দেশের প্রতিটি নাগরিককে সচেতন হতে হবে। বর্তমান সময়ে এক ইউনিট বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা মানে দেশের জন্য বড় অবদান রাখা।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার পাশাপাশি এই মুহূর্তে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতার কোনো বিকল্প নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকটি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখন দেখার বিষয়, ওয়াশিংটন থেকে কত দ্রুত এবং কী ধরনের সাড়া আসে।
ততদিন পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ব্যক্তিগত ও শিল্প পর্যায়ে জ্বালানি সাশ্রয়ই হতে পারে এই সংকট উত্তরণের প্রধান হাতিয়ার।
ভোরের আকাশ/আ.র