দক্ষ প্রশাসন গড়াই সরকারের চ্যালেঞ্জ

জনকল্যাণমূখী রাষ্ট্র গঠনে ন্যায়নিষ্ঠ, নির্মোহ ও দক্ষ প্রশাসন গড়াই বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের চ্যালেঞ্জ- বলছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আমলারা। তাদের মতে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার যথাযথ স্থানে উপযুক্ত লোক বসাতে প্রশাসনিকভাবে অনেকটাই ব্যর্থ ছিল, ফলে সেই খেসারত তাদের ১৮ মাসের মেয়াদের পুরোটা সময়টাই দিতে হয়েছে। সেই দিকটা বিবেচনা করে সময় নিয়ে হলেও দক্ষ ও অভিজ্ঞ, নিরপেক্ষ এবং সৎ ব্যক্তিকে সঠিক জায়গায় বসাতে হবে। সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক জায়গায় বসাতে ব্যর্থ হলে সরকারের এগিয়ে যাওয়া কঠিন হবে মনে করছেন এই বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞরা ভাবছেন, সংস্কার ও পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা নিয়ে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সরকার যাত্রা শুরু করেছিল, তা পূরণ হয়নি। প্রশাসনও সেই আগের তিমিরেই ঘুরপাক খাচ্ছে। কেউ কেউ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনকে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে দুর্বল প্রশাসন হিসেবেও অভিহিত করেন।
১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে গঠেত হয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। সরকারের মন্ত্রিসভায় ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। শুরুতেই সংস্থা প্রধান এবং সচিবদের যদি সাজাতে না পারে তাইলে সরকার ভালো চালানো কঠিন। সচিব হলো পলিসি লেভেলে, কিন্তু আসল বাস্তবায়নকারী হইলো সংস্থা প্রধান।
এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা দলাদলি চাই না। দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন করলে কেউ আর দলাদলিতে আসবে না। আশা করি, বর্তমান সরকার এ বিষয়টি অনুধাবন করবে।
এ বিষয়ে সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেন, আমি উদ্বিগ্ন আমলাতন্ত্র নিয়ে। কারণ আমলাতন্ত্রটাকে যদি আপনি ভালোভাবে সাজাতে না পারেন, যদি সৎ লোক, দক্ষ লোক খুঁজে বের করতে না পারেন-যেমন শেখ হাসিনার আমলে দলদাস এবং দুর্নীতিবাজ এই দুইটা ছিল ওনার অগ্রাধিকার। এখন ভালোদের খুঁজে বের করা দরকার। সরকার কেমন চলবে এটা নির্ভর করবে প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভার ওপর, কিন্তু ইন্ডিভিজুয়াল মন্ত্রণালয়গুলো কেমন চলবে এটা ৯০ শতাংশ হলো সচিবের ওপর। কারণ মন্ত্রীকে তো কেউ চিঠি লেখে না। সচিব কোনটা দুই ঘণ্টায় নিষ্পত্তি করবেন, কোনটা দুই দিনে করবেন এটা সচিবের বিষয়।
তিনি বলেন, এখন সচিব যদি টাকা-পয়সার দালালি বা দলাদলি করেন তবে সমস্যা। আমি বেশি উদ্বিগ্ন সচিব এবং সংস্থা প্রধানদের নিয়ে। সংস্থা প্রধান এবং সচিব-এই দুইটা যদি সাজাতে না পারে তাইলে আপনার সরকার ভালো চালানো কঠিন। সচিব হলো পলিসি লেভেলে, কিন্তু আসল বাস্তবায়নকারী হইলো সংস্থা প্রধান। সব জায়গা ঠিকভাবে সাজাতে না পারলে শুধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বললে বাস্তবে কোনো লাভ হবে না বলে উল্লেখ করলেন সাবেক এই সচিব।
এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেন, এখন তো জনপ্রশাসনটা একটা বিশৃঙ্খল অবস্থায় আছে, এই জনপ্রশাসনকে শৃঙ্খলায় আনার জন্য তো দক্ষ লোক দরকার।
তিনি বলেন, অপেক্ষাকৃত নিরপেক্ষ লোক, একদম নিরপেক্ষ লোক তো পাবেন না- তাদের খুঁজে বের করতে হবে। দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা, নিরপেক্ষতা এবং সততা- এগুলো দেখে যদি জনপ্রশাসনটাকে যদি না সাজানো যায়, যদি রাজনৈতিক বিবেচনায় সাজায়, তাহলে কিন্তু আপনার এই যে ভবিষ্যৎ, আপনার সবকিছু সামাল দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে যাবে। প্রশাসনও আরও বিশৃঙ্খল হয়ে পড়বে। প্রশাসনের সহায়তা ছাড়াও তো অঙ্গীকারগুলো পূরণ করা সম্ভব হবে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসন স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্বল প্রশাসন মন্তব্য করে প্রশাসন বিষয়ক বহু গ্রন্থের রচয়িতা ফিরোজ মিয়া বলেন, এ সরকারের প্রশাসনের শীর্ষ পদগুলোতে যারা ছিলেন তারা কেউই যোগ্যতা ও দক্ষতা দেখাতে পারেননি। কাজেই সৎ, দক্ষ ও নিরপেক্ষ লোক দেখে জনপ্রশাসনটাকে যদি না সাজানো যায়, যদি রাজনৈতিক বিবেচনায় সাজায়, তাহলে কিন্তু আপনার এই যে ভবিষ্যৎ, আপনার সবকিছু সামাল দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে যাবে। প্রশাসনও আরও বিশৃঙ্খল হয়ে পড়বে। প্রশাসনের সহায়তা ছাড়াও তো অঙ্গীকারগুলো পূরণ করা সম্ভব হবে না বলছেন তিনি।
তবে, বিএনপি নির্বাচনে জয় পাওয়ার পরপরই মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশীদ পদত্যাগ করেন। এরপর গত ১৪ ফেব্রুয়ারি তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। নতুন সরকারের শপথ নেওয়ার একদিন আগে ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার মুখ্যসচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়ার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদও বাতিল করা হয়। তিনিও পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন।
এরপর সোমবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া নয় সিনিয়র সচিব ও সচিবের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা হয়। এরা সবাই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পেয়েছিলেন। প্রায় সবার মেয়াদই চলতি বছরের শেষের দিকে শেষ হওয়ার কথা। একইদিন গত সরকারের সময়ে সচিব হওয়া তিনজন কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ধর্মসচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়।
এরই মধ্যে মঙ্গলবার এক বছর মেয়াদে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী। খালি হওয়া পদগুলোতে আরও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
মঙ্গলবার পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদও বাতিল করা হয়। তিনিও পদত্যাগ করেছিলেন। বুধবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলীও পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।
ভোরের আকাশ/এসএইচ