উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তিন খাতে মনোযোগ এনবিআরের

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। উচ্চাভিলাষী এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তিনটি খাতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে সংস্থাটি।
খাতগুলো হলো— তামাক ও সিগারেট শিল্প, সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘদিন ধরে আদালতে ঝুলে থাকা রাজস্ব মামলার নিষ্পত্তি।
এনবিআরের কর্মকর্তাদের ধারণা, এসব খাতে কার্যকর নজরদারি ও নীতিগত পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে অতিরিক্ত ৫০ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তামাক খাতে রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রস্তাবিত বাজেটে বিভিন্ন স্তরের সিগারেটের দাম ও করহার সমন্বয় করা হয়েছে। একই সঙ্গে অবৈধ সিগারেট উৎপাদন ও বিপণন বন্ধে ‘ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস’ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তারা মনে করছেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই নজরদারি ব্যবস্থা কার্যকর হলে রাজস্ব ফাঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে সিগারেট খাত থেকে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হতে পারে। আগামী অর্থবছরে তা বেড়ে ৫৫ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ শুধু এ খাত থেকেই অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে, আগামী অর্থবছরের জন্য সরকার প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন করেছে। রাজস্ব কর্মকর্তারা বলছেন, অবকাঠামো নির্মাণ, যন্ত্রপাতি আমদানি, নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ, ঠিকাদারি কার্যক্রম ও বিভিন্ন সেবাখাতে এই অর্থ ব্যয়ের ফলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের লেনদেন সৃষ্টি হবে। সেখান থেকে ভ্যাট, শুল্ক, আয়কর ও উৎসে কর আদায় বাড়বে।
তাদের মতে, এডিপির বরাদ্দের অন্তত ২ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা বাস্তবায়ন হলে এ খাত থেকে প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব। চলতি অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়ন কম থাকায় এ খাত থেকে রাজস্ব আদায় ৬ থেকে ৭ হাজার কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
এনবিআরের তৃতীয় প্রধান ভরসা হচ্ছে আদালতে আটকে থাকা রাজস্ব মামলা। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা ভ্যাট মামলাগুলো নিষ্পত্তির জন্য এবারের বাজেটে চক্রবৃদ্ধি সুদের বড় অংশ মওকুফের সুযোগ রাখা হয়েছে। সংস্থাটির আশা, এ উদ্যোগের ফলে করদাতারা বকেয়া পরিশোধে আগ্রহী হবেন এবং আগামী অর্থবছরে অতিরিক্ত ১০ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে।
বর্তমানে ভ্যাট ফাঁকির মামলায় মূল করের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে সুদ যুক্ত হতে থাকায় অনেক ক্ষেত্রে সুদের পরিমাণ মূল করের কয়েক গুণ হয়ে গেছে। ফলে বিপুল অঙ্কের দায় পরিশোধে অনীহা তৈরি হয়েছে এবং হাজার হাজার মামলা বছরের পর বছর ঝুলে রয়েছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস মিলিয়ে মোট বকেয়া রাজস্বের পরিমাণ প্রায় ৮৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ভ্যাট খাতে বকেয়া প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা, আয়কর খাতে ৩০ হাজার কোটি এবং কাস্টমস খাতে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। শুধু ভ্যাট খাতেই বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৩৬ হাজার।
রাজস্ব বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন অর্থবছরে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে করহার বাড়ানোর চেয়ে প্রশাসনিক দক্ষতা ও নজরদারি বাড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ। তাদের মতে, সিগারেট খাতে ফাঁকি রোধ, উন্নয়ন ব্যয়ের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন এবং বিচারাধীন মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা গেলে এনবিআরের রাজস্ব আহরণে উল্লেখযোগ্য গতি আসতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের কার্যকারিতা ও মাঠপর্যায়ের তদারকির ওপর।
এনবিআরের সদস্য (মূসক নীতি) মো আজিজুর রহমান বলেন, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কয়েকটি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), সিগারেট খাত এবং মামলা-সংক্রান্ত বকেয়া রাজস্ব আদায়।
তিনি জানান, এসব খাত থেকে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিভিন্ন রাজস্ব-সহায়ক নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে আগামী অর্থবছরে উল্লিখিত খাতগুলো থেকে অতিরিক্ত ৫০ থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ভোরের আকাশ/এনএস