পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য উৎপাদনে জৈব ও রাসায়নিক সারের সমন্বিত ব্যবহারের পরামর্শ

খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো পিছিয়ে বাংলাদেশ। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারণে মাটির উর্বরতা কমছে।
এ পরিস্থিতিতে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, পুষ্টিমানসম্পন্ন ফসল উৎপাদন ও টেকসই কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে জৈব ও রাসায়নিক সারের সমন্বিত ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে জৈব সার উৎপাদন ও ব্যবহারে ভর্তুকি দেওয়া, উদ্যোক্তাদের নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সহজ করা এবং সারের মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সোমবার (২ নভেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘সুস্থ মাটি, ফসল ও পরিবেশের জন্য জৈব সার উৎপাদনকে উৎসাহিত করা এবং ভর্তুকি প্রদান’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকেরা।
একশনএইড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ (বারি) ২০টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা এবং পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়।
এতে সভাপতিত্ব করেন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস, এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির শিক্ষক অধ্যাপক আবদুল করিম। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বারির জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এম. নাজিম উদ্দিন এবং গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও ইনস্টিটিউট অব ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের পরিচালক মো. মিজানুর রহমান।
বৈঠকে কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবিরা সুলতানা বলেন, একজন মাকে সুস্থ রাখতে পারলে যেমন সুস্থ সন্তানের জন্ম নিশ্চিত করা সম্ভব, তেমনি মাটির স্বাস্থ্য ভালো রাখতে পারলে পুষ্টিমানসম্পন্ন ফসল উৎপাদন করা যাবে। জৈব সারের মান নিশ্চিত করে তা বাজারজাত করা জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কৃষকদের কাছে সরকারি সেবা পৌঁছে দিতে কৃষি কার্ডের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে সাবিরা সুলতানা বলেন, এ ক্ষেত্রে প্রকৃত কৃষক নির্বাচন এবং তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
জৈব সার উৎপাদনকারী উদ্যোক্তাদের নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সহজ করতে জেলা পর্যায়ে নিবন্ধনের ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেন বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পরিচালক মো. আনোয়ার ফারুক। তিনি বলেন, কৃষিব্যবস্থাকে টেকসই করতে প্রাকৃতিক পদ্ধতির বিকল্প নেই। মাটির স্বাস্থ্য ও কাঙ্ক্ষিত পিএইচ মাত্রা বজায় রাখতে জৈব বালাইনাশক ও জৈব সারের সুষম ব্যবহার জরুরি। তবে কৃষকদের কাছে সময়মতো বিজ্ঞানসম্মত তথ্য পৌঁছে দেওয়া এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান এম. আব্দুস সালাম জৈব সার উৎপাদনকারী উদ্যোক্তাদের নিবন্ধনপ্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করেন। এ প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতামতও চান তিনি।
একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য নিশ্চিত করতে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। এ জন্য সারের মান নিয়ন্ত্রণ, বাজারজাতকরণে অনিয়ম দূর করা এবং উদ্যোক্তাদের প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন বারির সাবেক মহাপরিচালক এম. শহিদুল ইসলাম, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ডিন অধ্যাপক এম. জহির উদ্দিন, বারির উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক শাহাবুদ্দিন আহমেদ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক মো. আসাদুল্লাহ এবং ন্যাশনাল অ্যাগ্রিকালচারাল ট্রেনিং একাডেমির (নাটা) মহাপরিচালক এম. সাইফুল আলম খান।
দিনব্যাপী এ বৈঠকে জৈব সার উৎপাদনকারী উদ্যোক্তাদের জন্য ভর্তুকির নীতিমালা প্রণয়ন, নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সহজ করা, মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে সারের প্রয়োগমাত্রা নির্ধারণ এবং কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি জৈব সারের মান নিয়ন্ত্রণ ও সুষ্ঠু বাজারজাতকরণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন বক্তারা।
ভোরের আকাশ/ এনউব