ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার কমেছে ৪০ শতাংশ, দাবি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের চার মাস আগের পরিকল্পনা ও সমন্বিত পদক্ষেপের ফলে আগের বছরগুলোর তুলনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার কমেছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। তিনি বলেন, চিকিৎসকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ ও বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার কারণে এ বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। আগে আক্রান্ত প্রতি হাজারে পাঁচজনের মৃত্যু হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে তিনজনে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বাংলা একাডেমিতে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক এক সেমিনার শেষে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক এবং ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি বলেন, এবার সরকার আগেভাগেই ডেঙ্গু মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রায় দুই মাস আগেই সতর্ক করা হয়েছিল, সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অক্টোবরজুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যা নভেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, ২০২৩ সালের ভয়াবহ পরিস্থিতির তুলনায় এবার ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ও প্রকোপ কম হলেও সরকার পরিস্থিতিকে হালকাভাবে নিচ্ছে না। প্রতিটি মৃত্যুই বেদনাদায়ক। সংক্রমণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে সরকার কাজ করছে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম তুলে ধরে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় রেড ক্রিসেন্ট, স্কাউটসসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রায় এক হাজার তরুণ স্বেচ্ছাসেবীকে সঙ্গে নিয়ে পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন। এ ছাড়া প্রতি শনিবার দেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। স্কুল-কলেজ এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমেও দেশব্যাপী এ কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, এবার বিশেষ করে ঢাকা ও খুলনা বিভাগে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বেশি। সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, তাঁদের দল ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা দিনরাত মশা ও লার্ভা ধ্বংসে কাজ করছেন।
নগরবাসীর দায়িত্বশীলতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্যবিদ ড. মুহিত বলেন, শুধু আইন প্রয়োগ বা পুলিশি ব্যবস্থার মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। ঢাকা এখন বহুতল ভবন ও ফ্ল্যাটের শহর। অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তাজনিত কারণে ভ্রাম্যমাণ আদালত বা ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়া পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা এসব ভবনে প্রবেশ করতে পারেন না।
তিনি বলেন, ভবনের নিচে পার্কিংয়ের পেছনে কিংবা ফেলে রাখা ইলেকট্রনিক পণ্যের কার্টনে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার হতে পারে।
নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “নিজের ঘর, ছাদ, বারান্দার টব ও ভবনের নিচতলা নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন। আপনার এই সচেতনতাই আপনার বাবা-মা ও সন্তানকে ডেঙ্গু থেকে সুরক্ষিত রাখবে।”
ডেঙ্গুর সম্ভাব্য টিকা নিয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বিশ্বের কয়েকটি ডেঙ্গু টিকা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে প্রায় ৩০টি দেশে মূলত বেসরকারি পর্যায়ে ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েছে। সম্প্রতি ভারতেও একটি টিকা বেসরকারিভাবে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে বাংলাদেশে ব্যাপক পরিসরে টিকা ব্যবহারের অনুমোদনের বিষয়ে সরকার সতর্ক অবস্থানে রয়েছে জানিয়ে ড. মুহিত বলেন, কোটি কোটি মানুষের স্বাস্থ্যের নিরাপত্তার বিষয়টি এখানে জড়িত। তাই বিজ্ঞানীদের মতামত, ক্লিনিক্যাল তথ্য এবং বাংলাদেশের জনসংখ্যার ক্ষেত্রে টিকার কার্যকারিতা ও সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ না করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না।
তিনি আরও বলেন, টিকা তাৎক্ষণিকভাবে চলতি মৌসুমের ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব বন্ধ করার উপায় নয়; বরং এটি ভবিষ্যতের সুরক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। পাশাপাশি এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে জাপানের উদ্ভাবিত আধুনিক প্রযুক্তি দেশে ব্যবহারের সম্ভাব্যতা যাচাই ও পরীক্ষামূলক প্রয়োগ নিয়ে সরকার কাজ করছে।
ডেঙ্গু আক্রান্তদের জীবন রক্ষায় নেওয়া উদ্যোগ সম্পর্কে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশের ৬৪ জেলার মেডিকেল কলেজ ও জেলা সদর হাসপাতালের প্রায় দুই হাজার চিকিৎসককে ডেঙ্গু চিকিৎসাবিষয়ক রিফ্রেশার্স প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
তাঁর মতে, এ প্রশিক্ষণের ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায়। ফলে আগের বছরগুলোর তুলনায় ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।
ভোরের আকাশ/জেআ