অযৌক্তিক ভ্রমণে পূর্তের প্রকৌশলী-কর্মকর্তারা

কয়েক মাস পরই চাকরি থেকে অবসরে যাবেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ইএম) মো. আশ্রাফুল হক। কিন্তু এর মধ্যেই একটি প্রশিক্ষণে অংশ নিতে আমেরিকা যাচ্ছেন তিনি।
একইভাবে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. নাজমুল আলমও অংশ নিচ্ছেন এই প্রশিক্ষণে। শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা এইচভিএসি সিস্টেমের রক্ষণাবেক্ষণের মতো হাতে-কলমে শিক্ষা নেওয়ার এই প্রশিক্ষণে এই দুই কর্মকর্তার অংশগ্রহন কতটুকু যৌক্তিক, তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে তাদের নিজ নিজ দপ্তরে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরে প্রশিক্ষণের নামে এবারও দেখা যাচ্ছে ‘আমলা তোষণের নীতি’। আমেরিকায় প্রশিক্ষণে অংশ নিতে যাওয়া উল্লিখিত দুই কর্মকর্তার মধ্যে একজন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা আরেকজন প্রকৌশলী। এর মধ্যে একজন যিনি প্রকৌশলী তিনি প্রশিক্ষণের পর চাকরিতে খুব একটা সময় থাকছেন না। অথচ বিদেশে প্রশিক্ষণের নামে ‘প্রমোদ ভ্রমণের’ তালিকায় নাম ওঠাতে ভুল করেননি।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর থামছেই না। শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা এইচভিএসি সিস্টেম কীভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয় তা শেখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আটজন সরকারি কর্মকর্তা। গত ৩ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একটি সরকারি আদেশ (জিও) জারি করা হয়েছে।
বিদেশ সফর সম্পর্কে জানতে চেয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ইএম) আশ্রাফুল হকের মুঠোফানে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা-৭ থেকে জারি করা ওই প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, এইচভিএসি সিস্টেমের নিরাপত্তা সুবিধা, পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নিতে এই কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রে পাঁচদিন সফর করবেন।
যুক্তরাষ্ট্রে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে প্রকৌশলী থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তাও রয়েছেন। তালিকায় থাকা আরেক প্রভাবশালী কর্মকর্তা হলেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. ফিরোজ হাসান। তিনি মূলত সংস্থাপন বিভাগের দায়িত্বে আছেন। এই প্রকৌশলী বদলি, নিয়োগ, পদোন্নতি, বাসা বরাদ্দ এসব কাজের সঙ্গে যুক্ত। আটটি বিভাগীয় শহরে ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পের অধীনে প্রশিক্ষণের জন্য কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর করার কথা। কিন্তু ওই প্রকল্পের সঙ্গে এই প্রকৌশলীর কার্যত কোনো সম্পর্ক নেই। মূলত এই ধরনের কারিগরি প্রশিক্ষণে মাঠ পর্যায়ের যেসব প্রকৌশলী সরাসরি কাজের সঙ্গে যুক্ত তাদেরই অংশ নেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা কখনোই হয় না। এই সফরে অংশ নিতে যাওয়া অপর কর্মকর্তারা হলেন- প্রকল্প পরিচালক ডা. মো. তৌফিক হাসান ফিরোজ, গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ই/এম) মো. আশরাফুল ইসলাম, নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম) বরিশাল জোন মো. রাজু আহমেদ, নির্বাহী স্থপতি সিদ্দিকা নাসরিন সুলতানা এবং উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (ই/এম) রিসালত বারী।
এ বিষয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. নাজমুল আলম বলেন, ওদের টাকায় বিদেশ যাওয়া হচ্ছে। এতে বাংলাদেশ সরকারের কোনো আর্থিক সংশ্লিষ্টতা নেই।
প্রজ্ঞাপন মতে, এই সফরের যাবতীয় খরচ বহন করবে ‘ডানহাম-বুশ’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান। এটি শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা এইচভিএসি সিস্টেমের রক্ষণাবেক্ষণ কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
এ প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কোম্পানির টাকায় বিদেশ যাওয়া এক ধরনের আমলাতন্ত্রের সংস্কৃতি। তারা যে উদ্দেশ্যে যান সেখানে কোনো কাজই হয় না। এগুলো ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতি। সরকারের আর্থিক সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও এই ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ সরকারের জন্য একটি বড় ঝুঁকি। সরকারের সঙ্গে ওই সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ব্যবসা রয়েছে। এখানে স্বার্থের দ্বন্দ্ব রয়েছে। যা ক্রয় নীতি অনুযায়ী সাংঘর্ষিক।
ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, বর্তমানে পৃথিবীব্যাপী অনলাইনে যেকোনো পণ্য ক্রয় করা সম্ভব। এক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও যে সমস্ত কর্মকর্তা বিদেশ যাচ্ছেন, তারা ওই সময়ের জন্য বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। এই অপতৎপরতা বন্ধ করতে হবে।
ভোরের আকাশ/আ.র