খুলনা বিভাগের সরকারি হাসপাতাল গুলোতে নেই শিশুদের আইসিইউ ভেন্টিলেটর: হাম উপসর্গে শিশু রোগী ভর্তি বাড়ছে

খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় হাম উপসর্গ নিয়ে ভর্তি শিশু রোগীর সংখ্যা দুইশ' ছাড়িয়েছে। প্রতিদিনই এ সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করছে চিকিৎসকরা। এদিকে কুষ্টিয়ায় হাম আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হওয়া ৮ মাস বয়সি এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।এমন পরিস্থিতির মধ্যে হামের উপসর্গের সাথে স্বাসকষ্টসহ অন্যান্য শিশু রোগীদের চিকিৎসায় খুলনায় কোনো আইসিইউ ও ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা নেই। ফলে কোমলমতি শিশুদের চিকিৎসা নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠায় রয়েছে অভিভাবকরা।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য মতে, ২ এপ্রিল বিকাল পর্যন্ত বিভাগের ১০ জেলায় ১৮০ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ৩ এপ্রিল এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য না পাওয়া গেলেও বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছে এ সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়েছে। কিন্তু সব রিপোর্ট না পেয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বলা যাচ্ছেনা।
২ এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, হিসাবে খুলনায় ৪, বাগেরহাটে ৩. চুয়াডাঙ্গায় ৩, যশোরে ৪০, ঝিনাইদহে ১৭, কুষ্টিয়ায় সর্বোচ্চ ৭৬, মাগুরায় ৯, মেহেরপুরে কোনো রোগী নেই, নড়াইলে ৪ এবং সাতক্ষীরায় ৭ জন চিকিৎসাধীন রয়েছে।
এদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ৮ মাস বয়সি এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আফরান নামে শিশুটির মৃত্যু হয়। তাদের বাড়ি কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ভাদালিয় গ্রামে।
শুক্রবার সকালে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক এইচ এম আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, হামের উপসর্গ নিয়ে একটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ভর্তির দিন থেকেই শিশুর অবস্থা খারাপ ছিল। তার উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় রেফার্ড করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রোগীর স্বজনেরা যাননি। তবু তার যতটুকু সম্ভব চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। ভোরের দিকে শিশুটি মারা যায়।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান সৈয়েদা রুখশানা পারভীন বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। একজন আক্রান্ত শিশু হাঁচি-কাশির মাধ্যমে সহজেই অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে যে-সব শিশু নিয়মিত টিকা পায়নি বা অপুষ্টিতে ভুগছে, তাদের ঝুঁকি বেশি। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সহ অন্যান্য হাসপাতালে হামসহ সংক্রামক রোগে আক্রান্তদের ভর্তি করা হয় না। কিন্তু এই রোগের গুরুত্ব বিবেচনায় ও খুলনায় যে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালটি রয়েছে তার সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে আমাদের এখানে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় একটি আইসোলেশন সেন্টার তৈরি করে শিশুদের রাখা হয়েছে। এই মুহূর্তে সরকারের ব্যাপকভাবে একটি ভ্যাকসিনেশন ব্যবস্থা চালু করা দরকার। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পক্ষে এই মুহূর্তে ব্যাপক হারে হামের শিশু ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়া কঠিন কাজ কারণ এমনিতে এই হাসপাতালে ৪৮ বেডের বিপরীতে ২ শতাধিক শিশু বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
কোনো সরকারি হাসপাতালে শিশুদের আইসিইউ ও ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা নেই: খুলনায় হামের নতুন ভেরিয়েন্টে প্রতিদিন হু হু করে শিশুরা ভর্তি হলেও খুলনার কোনো সরকারি হাসপাতালে শিশুদের জন্য এনআইসিইউ এবং ভেন্টিলেশন সাপোর্ট নেই। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০ বেডের একটি স্ক্যানু থাকলেও সেখানে ধারণ ক্ষমতার তিনগুণ নবজাতক রয়েছে। এছাড়া হাসপাতালে আরও ৩০টি আইসিইউ শয্যা থাকলেও শিশুদের ভরসা উচ্চ মুল্যের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে। যেখানে নিম্ন আয়ের মানুষের পক্ষে কখনোই ব্যয় মেটানো সম্ভব না।
এছাড়া২৫০ শয্যা বিশিষ্ট খুলনা জেনারেল হাসপাতাল সব সময় রোগীদের সাথে প্রতারণা করে আসছে। হাসপাতালটি ২৫০ শয্যার অর্ধেক বেড খালি থাকলেও এখানে সারাদিনই রোগী খুলনা মেডিকেলে রেফার করা হয়। নামে জেলা সদর হাসপাতাল হলেও খুলনার যে-কোনো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তুলনায় এখানকার কার্যক্রম সীমিত। এছাড়া খুলনার উপর একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে শিশু বিভাগই চালু নেই। এছাড়া খুলনায় একটি সরকারি সংক্রমক ব্যাধি হাসপাতাল থাকলেও সারা বছরই রোগী শূন্য থাকে। কোনো রোগী ভর্তি হতে আসলেই তাকে রেফার করে রাখা হয়। অথচ হাসপাতালটিতে চিকিৎসক ও নার্স এর সংখ্যা অনুপাত অন্য যে কোন হাসপাতালের থেকে ভালো।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডাঃ মুজিবর রহমান বলেন, ছুটির দিন থাকায় আজ আমরা বিভাগের সব জেলার আপডেট তথ্য এখনও হাতে পাইনি। ফলে এখন পর্যন্ত আসলে কত শিশু ভর্তি হয়েছে হাম উপসর্গ নিয়ে তা নিশ্চিত ভাবে বলা সম্ভব না। তবে গতকাল ১৮০ ছিলো। এ সংখ্যা আজ ২শ'-এর বেশি হতে পারে। কাগজ হাতে পেলে সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারবো।
এছাড়া শিশুদের জন্য এনআইসিইউ সেবা চালুর বিষয়ে তিনি বলেন, খুলনায় এমনিতেই কোনো শিশুর জন্য আইসিইউ ব্যবস্থা আগে থেকেই নেই। আর হামের শিশুদের তো অন্য রোগীদের সাথে এমনিতেই রাখা যাবে না। ফলে হামে আক্রান্ত কোনো শিশুর যদি আইসিইউ প্রয়োজন হয়, তাহলে ঢাকায় স্থানান্তর করা হবে।
ভোরের আকাশ/এনউব