কেয়ামতের দিন সম্পর্কে হাদিসে যা বলা হয়েছে

কেয়ামত বা মহাপ্রলয় ইসলামী আকীদার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। যে দিন এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ধসে পড়বে এবং সমস্ত সৃষ্টির হিসাব-নিকাশের জন্য হাশরের ময়দানে একত্রিত করা হবে, সেই দিনের ভয়াবহতা ও তীব্রতা মানুষের কল্পনাতীত। পবিত্র কোরআনের পাশাপাশি অসংখ্য সহীহ হাদিসে শেষ নবীর রাসুলুল্লাহ ﷺ কেয়ামতের দিনের সেই শিউরে ওঠা দৃশ্য ও কঠিন পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন, যা একজন মুমিনকে গুনাহের পথ থেকে ফিরিয়ে সৎপথে চলতে অনুপ্রাণিত করে।
হাদিসের আলোকে কেয়ামতের দিনের কিছু হৃদয়বিদারক ও ভয়াল দৃশ্য নিচে তুলে ধরা হলো:
১. মাথার ঠিক ওপরে থাকবে সূর্য
কেয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে মানুষকে সম্পূর্ণ উলঙ্গ, খতনাবিহীন ও খালি পায়ে ওঠানো হবে। সেদিন সূর্যকে মানুষের মাথার মাত্র এক মাইল বা বিঘত ওপরে নিয়ে আসা হবে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: “কেয়ামতের দিন সূর্যকে মাখলুকের এত নিকটে আনা হবে যে, তা মাত্র এক মাইল বা এক বিঘত দূরত্বে থাকবে। সূর্যের তাপে মানুষ তাদের আমল অনুযায়ী ঘামের মধ্যে হাবুডুবু খাবে। কারো ঘাম হবে টাখনু পর্যন্ত, কারো হাঁটু পর্যন্ত, কারো কোমর পর্যন্ত, আবার কাউকে ঘাম লাগামের মতো পেঁচিয়ে ধরবে (অর্থাৎ কান বা মুখ পর্যন্ত ডুবে যাবে)।” (সহীহ মুসলিম)
২. প্রাণের ভয়ে সবাই বলবে ‘নফসি, নফস্যি’ (আমার কী হবে!)
কেয়ামতের মাঠের আতঙ্ক এত তীব্র হবে যে, মানুষ আপনজনদের ভুলে যাবে। মা তার সন্তানকে, সন্তান তার পিতাকে চিনবে না। এমনকি মহান নবী-রাসূলগণ পর্যন্ত আল্লাহর ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে কেবল নিজেদের নাজাতের আকুতি জানাবেন।
হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন— ‘হে আল্লাহর রাসুল! সেদিন নারী-পুরুষ সবাই কি একত্রিত উলঙ্গ অবস্থায় থাকবে? তারা কি একে অপরের দিকে তাকাবে না?’ রাসুলুল্লাহ ﷺ জবাবে বলেন: “হে আয়েশা! সেদিনের পরিস্থিতি এতই ভয়াবহ ও কঠিন হবে যে, কেউ কারো দিকে তাকানোর মতো অবসর বা খেয়ালই পাবে না।” (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
৩. পাপের ভারে চেহারা কালো ও অন্ধ হওয়া
যাদের আমলনামা পাপ দিয়ে পূর্ণ থাকবে, সেদিন তাদের চেহারা আতঙ্কে কালো ও মলিন হয়ে যাবে। হাদিসে এসেছে, অন্যায়ভাবে জমিন দখলকারী ব্যক্তি সেই জমি ঘাড়ে বহন করে হাশরের মাঠে আসবে, আর সরকারি মাল বা আমানতের খিয়ানতকারী সেই বস্তু কাঁধে নিয়ে উপস্থিত হবে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “তোমরা খেয়ানত (প্রতারণা/আত্মসাৎ) করা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ কেয়ামতের দিন কেউ যদি একটি ছাগল খেয়ানত করে থাকে, তবে সে তা ঘাড় থেকে ছাগলের ডাক বের হওয়া অবস্থায় বহন করে নিয়ে আসবে...” (সহীহ বুখারী)
৪. আল্লাহর আরশের ছায়া ব্যতীত অন্য কোনো ছায়া থাকবে না
যেদিন সূর্যের তাপে মাটির তামা হয়ে যাবে এবং চারপাশে তীব্র হাহাকার থাকবে, সেদিন কেবল মহান আল্লাহর আরশের নিচে কিছু সৌভাগ্যবান ব্যক্তি আশ্রয় পাবেন।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “যেদিন আল্লাহর (আরশের) ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না, সেদিন সাত শ্রেণীর মানুষকে আল্লাহ তাআলা তাঁর আরশের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন: ১. ন্যায়পরায়ণ শাসক, ২. যে যুবক আল্লাহর ইবাদতের মধ্যে বড় হয়েছে, ৩. যার অন্তর মসজিদের সাথে ঝুলন্ত থাকে...।” (সহীহ বুখারী)
৫. পাঁচটি প্রশ্নের জবাব না দিয়ে এক পা-ও নড়া যাবে না
কেয়ামতের ময়দানে বিচার কাজ শুরু হওয়ার পর প্রতিটি মানুষকে তার জীবন ও ধনসম্পদের হিসাব দিতে হবে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: “কেয়ামতের দিন কোনো বান্দা তার পা দুটি এক চুলও নাড়াতে পারবে না, যতক্ষণ না তাকে পাঁচটি বিষয়ে প্রশ্ন করা হবে—১. সে তার জীবন কীভাবে পার করেছে, ২. তার যৌবনকাল কোন কাজে ক্ষয় করেছে, ৩. তার ধনসম্পদ কোন পথে উপার্জন করেছে, ৪. কোন পথে তা ব্যয় করেছে, এবং ৫. যতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছিল সে অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছে।” (জামে আত-তিরমিজি)
কেয়ামতের দিনের ভয়াবহতা কোনো কাল্পনিক গল্প নয়, বরং এটি এক অলঙ্ঘনীয় সত্য। দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহে পড়ে আমরা যেন পরকালের এই কঠিন দিবসকে ভুলে না যাই। খাঁটি তাওবা, সৎ আমল এবং মানবসেবার মাধ্যমেই কেবল সেই কঠিন দিনে আল্লাহর রহমত ও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর শাফায়াত লাভ করা সম্ভব।