কোরআন-হাদিসে সুদমুক্ত ঋণের গুরুত্ব

ইসলামি সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি অন্যতম সুন্দর এবং মানবিক দিক হলো ‘করজে হাসানা’ বা সুদমুক্ত ঋণ। বর্তমান যুগে যেখানে সুদভিত্তিক অর্থায়নের করাল গ্রাসে সাধারণ মানুষ পিষ্ট, সেখানে কোনো প্রকার অতিরিক্ত মুনাফা বা স্বার্থ ছাড়া কেবল আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য কাউকে ঋণ দেওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। পবিত্র কোরআন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অসংখ্য হাদিসে সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার গুরুত্ব ও এর অসামান্য ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে।
বিপদের সময় কোনো মুসলিম ভাইকে সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার ধর্মীয় গুরুত্ব ও সামাজিক ফজিলতগুলো নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
১. স্বয়ং আল্লাহ তাআলাকে ঋণ দেওয়ার শামিল
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা অভাবী মানুষকে সুদমুক্ত ঋণ দেওয়াকে স্বয়ং আল্লাহকে ঋণ দেওয়ার সাথে তুলনা করেছেন এবং এর বিনিময়ে বহুগুণ সওয়াব দেওয়ার ওয়াদা করেছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন: “কে সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহকে করজে হাসানা (উত্তম ঋণ) দেবে? অতঃপর আল্লাহ তার জন্য তা বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেবেন এবং তার জন্য রয়েছে সম্মানিত পুরস্কার।” (সূরা আল-হাদিদ, আয়াত: ১১)
২. সদকা বা দানের চেয়েও বেশি সওয়াব
সাধারণ দৃষ্টিতে মনে হতে পারে দান করলে টাকা আর ফেরত পাওয়া যায় না, তাই দানে সওয়াব বেশি। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে দান করার চেয়ে ঋণ দেওয়ার সওয়াব অনেক বেশি।
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “মেরাজের রাতে আমি জান্নাতের দরজায় লেখা দেখেছি—সদকার সওয়াব ১০ গুণ, আর করজে হাসানার (সুদমুক্ত ঋণ) সওয়াব ১৮ গুণ।” (সুনানে ইবনে মাজাহ)
এর কারণ হিসেবে ওলামায়ে কেরাম বলেন, দান অনেক সময় যাঁর প্রয়োজন নেই তিনিও চেয়ে নিতে পারেন, কিন্তু মানুষ চরম ঠেকায় না পড়লে সাধারণত কারো কাছে ঋণ চায় না। তাই ঋণগ্রহীতার প্রয়োজনটা সবসময়ই প্রকৃত ও তীব্র হয়।
৩. প্রতিদিন সদকা করার সওয়াব লাভ
কোনো ভাইকে ঋণ দেওয়ার পর থেকে সেই ঋণ পরিশোধের নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত প্রতিদিন ওই সমপরিমাণ টাকা দান করার সওয়াব আমলনামায় যুক্ত হয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি কোনো অভাবী মানুষকে ঋণ দেবে, তার জন্য প্রতিদিন (ঋণ পরিশোধের মেয়াদ পর্যন্ত) সমপরিমাণ টাকা সদকা করার সওয়াব লেখা হবে। আর মেয়াদের পর যদি সে ঋণগ্রহীতাকে আরও অবকাশ দেয়, তবে প্রতিদিন তার দ্বিগুণ পরিমাণ টাকা সদকা করার সওয়াব লেখা হবে।” (মুসনাদে আহমাদ)
৪. কেয়ামতের কঠিন বিপদে আল্লাহর সাহায্য
দুনিয়ার বুকে যারা অন্য মানুষের কষ্ট বা অভাব দূর করবে, কেয়ামতের ভয়াবহ দিনে আল্লাহ তাআলা তাদের কষ্ট দূর করে দেবেন।
মহানবী (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়াবি বিপদ দূর করবে, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার বিপদসমূহ দূর করবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো অভাবী লোকের অভাব সহজ (ঋণ দিয়ে বা মাফ করে) করে দেবে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখেরাতে তার সবকিছু সহজ করে দেবেন।” (সহীহ মুসলিম)
ঋণগ্রহীতা পরিশোধ করতে না পারলে ইসলামি নির্দেশনা:
ঋণ দেওয়ার পর কোনো ব্যক্তি যদি সত্যিই অভাবের কারণে বা দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার ফলে সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে না পারেন, তবে ইসলাম ঋণদাতাকে দুটি সুন্দর পথ দেখিয়েছে:
- সময় বাড়িয়ে দেওয়া: ঋণগ্রহীতা বিপদে থাকলে তাঁকে তাগাদা না দিয়ে আরও কিছু সময় দেওয়া উচিত। এর ফলে প্রতিদিন দ্বিগুণ সদকার সওয়াব পাওয়া যায়।
- ঋণ মাফ করে দেওয়া (সর্বোত্তম ফজিলত): যদি সম্ভব হয়, তবে অসহায় ব্যক্তির ঋণ আংশিক বা পুরোপুরি মাফ করে দেওয়া। এর ফজিলত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো অভাবী মানুষকে অবকাশ দেবে কিংবা তার ঋণ মাফ করে দেবে, আল্লাহ তাআলা কেয়ামতের দিন তাকে তাঁর আরশের ছায়াতলে আশ্রয় দেবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না।” (সহীহ মুসলিম)
সুদমুক্ত ঋণ কেবল একটি আর্থিক লেনদেন নয়, এটি একটি মহান ইবাদত এবং সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় করার অন্যতম হাতিয়ার। সুদের অভিশাপ থেকে সমাজকে মুক্ত করতে এবং পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ বজায় রাখতে সামর্থ্যবান মুসলিমদের উচিত ‘করজে হাসানা’ বা সুদমুক্ত ঋণের চর্চা আরও বাড়িয়ে দেওয়া।
ভোরের আকাশ/জেআ