বদনজর ঠেকাতে কপালে টিপ, শরিয়ত কী বলে?

আমাদের দেশে নবজাতক বা ছোট শিশুদের রূপ-সৌন্দর্য দেখে কারও যেন নজর না লাগে, সে উদ্দেশ্যে কপালে বা থুতনিতে কালোরঙের টিপ (বা কাজলের ফোঁটা) দেওয়ার একটি প্রাচীন প্রথা প্রচলিত আছে। অনেক মা-বাবা বা অভিভাবক বিশ্বাস করেন, এই কালা টিপ দিলে শিশু কুদৃষ্টি বা বদনজর থেকে রক্ষা পাবে।
তবে ইসলামী আকীদা ও শরিয়তের দৃষ্টিতে বদনজর থেকে বাঁচানোর নিয়তে কপালে কালা টিপ দেওয়ার বিধান কী—তা নিচে কুরআন, হাদিস ও ফিকহের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
মূল বিধান: শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি নাজায়েজ ও কুসংস্কার
ইসলামী শরিয়ত ও ফিকহবিদদের মতে, বদনজর বা কুদৃষ্টি থেকে বাঁচাবে—এই বিশ্বাস বা নিয়তে শিশুর কপালে কালা টিপ দেওয়া সম্পূর্ণ নাজায়েজ, অবৈধ এবং কুসংস্কার।
এর প্রধান কারণ হলো:
ভুল বিশ্বাস (আকীদার বিভ্রান্তি): ইসলামে ক্ষতি দূর করা বা কল্যাণ আনয়ন করার মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। কপালে সামান্য কালোরঙের টিপ বা কাজল কোনো বিপদ বা মানুষের কুদৃষ্টি দূর করার ক্ষমতা রাখে না। টিপকে ক্ষতিকর দৃষ্টি থেকে বাঁচানোর মাধ্যম বা উপায় হিসেবে বিশ্বাস করা তাওহীদের মূল চেতনার পরিপন্থী।
- রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: “যে ব্যক্তি কোনো (প্রতীকি বা অপার্থিব) বস্তু ঝুলায় বা ধারণ করে, তাকে সেই বস্তুর ওপরই সোপর্দ করে দেওয়া হয় (অর্থাৎ সে আল্লাহর সাহায্য থেকে বঞ্চিত হয়)।” (জামে আত-তিরমিজি, হাদিস নং- ২০৭২)
সৌন্দর্যবর্ধনের নিয়তে টিপ দিলে কী বিধান?
যদি কুদৃষ্টি বা বদনজর থেকে বাঁচানোর মতো কোনো ভুল বিশ্বাস অন্তরে না থাকে, বরং কেবলমাত্র শিশুকে দেখতে সুন্দর লাগবে বা সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে—এই সাধারণ নিয়তে কাজলের টিপ বা ফোঁটা দেওয়া হয়, তবে তা গুনাহ বা হারাম হবে না (যদিও অপ্রয়োজনীয় এমন প্রথা এড়িয়ে চলাই উত্তম)।
তবে আমাদের সমাজে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বদনজর থেকে বাঁচানোর নিয়তেই এটি করা হয় বলে আলিমগণ এ থেকে কঠোরভাবে বেঁচে থাকার পরামর্শ দেন।
তবে কি বদনজর সত্য?
হ্যাঁ, ইসলামে মানুষের কুদৃষ্টি বা ‘বদনজর’ -কে সত্য বলে স্বীকার করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “বদনজর সত্য।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং- ৫৭৪০)। কিন্তু বদনজর থেকে বাঁচার জন্য কপালে কালা টিপ দেওয়া, হাতে-কোমরে কালো সুতা বাঁধা, কিংবা তাবিজ ঝোলানো ইসলামী পদ্ধতি নয়।
মাসনুন ও সহীহ উপায়ে শিশুকে বদনজর থেকে বাঁচানোর উপায়:
হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ ﷺ শিশুদের কুদৃষ্টি থেকে সুরক্ষার জন্য বেশ কিছু চমৎকার ও সুন্নাত সম্মত দোয়া শেখাচ্ছেন। কালা টিপের বদলে অভিভাবকদের এই মাসনুন দোয়াগুলো আমল করা উচিত:
১. রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর শেখানো দোয়া পড়া
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী ﷺ তাঁর দুই প্রিয় দৌহিত্র হযরত হাসান ও হুসাইন (রা.)-কে কুদৃষ্টি থেকে বাঁচাতে এই দোয়া পড়ে ঝাড়ফুঁক করতেন ও দম দিতেন:
«أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لامَّةٍ»
উচ্চারণ: “আউজু বিকালি মাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন কুল্লি শায়তানিওঁ ওয়া হাম্মাহ, ওয়া মিন কুল্লি আইনিন লাম্মাহ।”
অর্থ: “আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালামের মাধ্যমে প্রত্যেক শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী এবং প্রত্যেক ক্ষতিকর কুদৃষ্টি থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং- ৩৩৭২)
২. মুআউওয়াযাতাইন (সূরা ফালাক ও সূরা নাস) পড়ে ফু দেওয়া
প্রতিদিন সকালে ও রাতে এবং ঘর থেকে বের হওয়ার সময় সূরা আল-ফালাক এবং সূরা আন-নাস পড়ে হাততালুতে ফুঁ দিয়ে শিশুর পুরো শরীরে হাত বুলিয়ে দেওয়া সুন্নাত।
৩. শিশুর প্রশংসা করার সময় ‘বারাকাল্লাহ’ বলা
নিজের বা অন্যের কোনো শিশুকে দেখে সুবহানাল্লাহ বা কত সুন্দর বলার পাশাপাশি “বারাকাল্লাহু ফীক” (আল্লাহ তোমাকে বরকত দিন) অথবা “মা-শা-আল্লাহ” বলা উচিত। এতে করে ওই শিশুর ওপর বক্তার নিজেরও বদনজর পড়ে না।
কুসংস্কার ও অসত্য প্রথার ওপর ভরসা না করে একজন সুন্নাতপ্রেমী মুসলিম হিসেবে আমাদের উচিত রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বাতলে দেওয়া দোয়ার মাধ্যমে সন্তানদের হেফাজত করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সমাজ থেকে সব ধরণের কুসংস্কার দূর করে সহীহ সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন গড়ার তৌফিক দান করুন। আমীন।
ভোরের আকাশ/জেআ