হ্যালোইন উদযাপন সম্পর্কে ইসলাম কী বলে?

প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হয় হ্যালোইন। এ উৎসবকে ঘিরে অনেকে ভূত, ডাইনি ও বিভিন্ন কাল্পনিক চরিত্রের পোশাক পরেন। বাড়িঘর সাজানো, ভৌতিক সাজে পার্টি আয়োজন এবং শিশুদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মিষ্টি ও চকলেট সংগ্রহের মতো নানা কার্যক্রমও দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিনোদনজগতের প্রভাবে বাংলাদেশেও উৎসবটি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে মুসলমানদের জন্য হ্যালোইন উদযাপন কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
হ্যালোইন কী এবং এর ইতিহাস
হ্যালোইনের বর্তমান রূপ গড়ে উঠেছে প্রাচীন ইউরোপীয় লোকাচার, কেল্টিক জনগোষ্ঠীর ‘সামহেইন’ উৎসব এবং খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্যের প্রভাবে। সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন সংস্কৃতির সংমিশ্রণে উৎসবটি নানা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে অনেকেই একে বিনোদনমূলক বা সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবে দেখেন। তবে উৎসবটির ঐতিহাসিক পটভূমির সঙ্গে প্রাচীন বিশ্বাস ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের যোগসূত্র রয়েছে।
হ্যালোইন উদযাপন নিয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামে মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্য ধর্মের স্বতন্ত্র ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান অনুসরণ এবং সেসব উৎসবের অংশ হওয়া নিয়ে বহু আলেমের নিষেধমূলক মত রয়েছে। এ কারণে অনেক আলেম হ্যালোইন উদযাপন, এর বিশেষ রীতিনীতি অনুসরণ এবং উৎসবকেন্দ্রিক পার্টিতে অংশ নেওয়াকে নাজায়েজ মনে করেন।
তবে কোনো কাজের বিধান নির্ধারণের ক্ষেত্রে তার উদ্দেশ্য, প্রকৃতি ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন। হ্যালোইনের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিটি কাজকে একইভাবে শিরক হিসেবে চিহ্নিত করা যথাযথ নয়। বরং কোনো কাজে শিরক, কুফরি বিশ্বাস বা ইসলামে নিষিদ্ধ উপাদান রয়েছে কি না, সেটিও বিবেচ্য।
বিশেষ পোশাক পরা ও পার্টিতে অংশ নেওয়া
হ্যালোইনে অনেকে ভূত, ডাইনি, শয়তান কিংবা বিভিন্ন ভৌতিক চরিত্রের পোশাক পরেন। উৎসবের অংশ হিসেবে এসব পোশাক পরা এবং বিশেষ আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হওয়াকে বহু আলেম অন্য ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক রীতির অনুকরণ হিসেবে দেখেন। তাই তাঁরা মুসলমানদের এ ধরনের আয়োজন থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন।
বিশেষ করে কোনো পোশাক বা কর্মকাণ্ডে ধর্মবিরোধী বিশ্বাস, অশ্লীলতা কিংবা অন্য কোনো নিষিদ্ধ বিষয় থাকলে তা পরিহার করা জরুরি। তবে সাধারণ পোশাক, কল্পকাহিনির চরিত্রের সাজ কিংবা মুখোশের বিধান নির্ধারণে নির্দিষ্ট পরিস্থিতি ও উদ্দেশ্য বিবেচনা করা প্রয়োজন।
‘ট্রিক অর ট্রিট’ ও মিষ্টি বিতরণ কি নিষিদ্ধ?
হ্যালোইনের পরিচিত রীতিগুলোর একটি হলো ‘ট্রিক অর ট্রিট’। এ সময় শিশুরা বিভিন্ন পোশাক পরে প্রতিবেশীদের বাড়িতে গিয়ে মিষ্টি বা চকলেট সংগ্রহ করে। যেসব আলেম হ্যালোইন উদযাপনকে নিষিদ্ধ মনে করেন, তাঁরা সাধারণত এ উৎসবের অংশ হিসেবে এমন কার্যক্রমেও অংশ না নেওয়ার পরামর্শ দেন।
তবে সাধারণভাবে কাউকে খাবার দেওয়া, শিশুকে মিষ্টি উপহার দেওয়া বা দান করা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। এ ক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয় হলো, কাজটি হ্যালোইন উদযাপনের অংশ হিসেবে করা হচ্ছে, নাকি উৎসবের সঙ্গে সম্পর্কহীন সাধারণ সৌজন্য বা মানবিক সহযোগিতা হিসেবে করা হচ্ছে। তাই বিষয় দুটিকে এক করে দেখা উচিত নয়।
শিশুদের কী শেখানো উচিত?
স্কুল বা সামাজিক পরিসরে হ্যালোইন উপলক্ষে কোনো আয়োজন হলে মুসলিম অভিভাবকেরা সন্তানের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে পারেন। ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধ বোঝানোর পাশাপাশি অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সম্মান ও সদাচরণের শিক্ষাও দেওয়া জরুরি। প্রয়োজন হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে বিকল্প কার্যক্রমের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
ইসলামে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। ধর্মীয় পরিচয় ও মূল্যবোধ বজায় রেখে বৈধ বিনোদন এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
করণীয় কী?
হ্যালোইন উদযাপন নিয়ে বহু আলেমের নিষেধমূলক মত রয়েছে। তাঁদের মতে, মুসলমানদের এ উৎসবের স্বতন্ত্র রীতিনীতি ও আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। তবে নির্দিষ্ট কোনো কাজের বিধান জানতে হলে তার প্রকৃতি, উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ধর্মীয় বিধান নিয়ে সংশয় থাকলে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সম্মান বজায় রেখে নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধ অনুসরণ করাই গুরুত্বপূর্ণ।
ভোরের আকাশ/জেআ