কন্যাসন্তানকে লালন-পালনে মিলবে যে বিশেষ প্রতিদান

কন্যাসন্তান পরিবারের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ নিয়ামত। তার জন্ম, বেড়ে ওঠা, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা মা-বাবার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ইসলামে কন্যাসন্তানকে অবহেলা না করে ভালোবাসা, মর্যাদা ও যত্নের সঙ্গে বড় করে তোলার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শুধু দায়িত্ব পালনই নয়, কন্যাসন্তানের সঠিক লালন-পালন ও উত্তম আচরণের জন্য রয়েছে পরকালে প্রতিদানের সুসংবাদও।
ইসলামের আগমনের আগে আরব সমাজের কোনো কোনো অংশে কন্যাসন্তানের জন্মকে অপমানজনক মনে করা হতো। এমনকি কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো নির্মম প্রথাও প্রচলিত ছিল। পবিত্র কোরআনে এ ধরনের অমানবিক আচরণের নিন্দা করা হয়েছে। সূরা আত-তাকভিরের ৮ ও ৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাশিশুকে জিজ্ঞাসা করা হবে, কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল।
ইসলাম কন্যাসন্তানের প্রতি এ বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে তার জীবন, মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। পবিত্র কোরআনের সূরা আশ-শুরার ৪৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন। অর্থাৎ সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে—উভয়ই আল্লাহর দান।
কন্যাসন্তানের লালন-পালনে জান্নাতের সুসংবাদ
কন্যাসন্তানের যত্ন ও সুন্দরভাবে লালন-পালনের বিষয়ে হাদিসে বিশেষ উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কন্যাসন্তানের প্রতি সদাচরণ ও দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন।
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদিসে হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, এক নারী তাঁর দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে সাহায্য চাইতে আসেন। তাঁর কাছে একটি খেজুর ছাড়া দেওয়ার মতো কিছু ছিল না। তিনি সেটিই মেয়েদের মধ্যে ভাগ করে দেন। পরে এ ঘটনা নবীজি (সা.)-কে জানালে তিনি বলেন, যে ব্যক্তি কন্যাসন্তানদের লালন-পালনের দায়িত্ব পেয়ে তাদের প্রতি সদাচরণ করে, তারা তার জন্য জাহান্নাম থেকে রক্ষার কারণ হবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬২৯)
অন্য একটি বর্ণনায় মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি দুই কন্যাসন্তানকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করবে, কিয়ামতের দিন সে ও আমি এভাবে থাকব—এ কথা বলে তিনি তাঁর দুই আঙুল পাশাপাশি করেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৩১)
এসব হাদিসে কন্যাসন্তানের প্রতি দায়িত্বশীলতা, ধৈর্য, ভালোবাসা ও সদাচরণের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
শিক্ষা ও সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি
কন্যাসন্তানকে ভালোবাসার পাশাপাশি তার শিক্ষা, নৈতিকতা ও ব্যক্তিত্ব গঠনের দিকেও নজর দিতে হবে। ইসলাম জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব দিয়েছে এবং সন্তানদের সৎ ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার শিক্ষা দিয়েছে। তাই মেয়েদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা, তাদের মতামতকে অবজ্ঞা করা কিংবা শুধু মেয়ে হওয়ার কারণে কম সুযোগ দেওয়া ইসলামের ন্যায়বিচার ও সদাচরণের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কন্যাসন্তানের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, পুষ্টিকর খাবার, চিকিৎসা, মানসিক সমর্থন ও প্রয়োজনীয় যত্ন নিশ্চিত করা মা-বাবার দায়িত্বের অংশ। একই সঙ্গে তাকে আত্মমর্যাদাবোধ, সততা, সহমর্মিতা ও দায়িত্বশীলতার শিক্ষা দিতে হবে।
ছেলে-মেয়ের মধ্যে বৈষম্য নয়
সন্তানদের মধ্যে ন্যায়সংগত আচরণ করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। উপহার, সুযোগ-সুবিধা কিংবা পারিবারিক সিদ্ধান্তে কেবল লিঙ্গের কারণে একজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে অন্যজনকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের ধরন ভিন্ন হতে পারে, তবে তা যেন অবহেলা বা বৈষম্যে পরিণত না হয়।
কন্যাসন্তানের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে তার নিরাপত্তা, সম্মতি, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও সচেতন থাকা জরুরি। বিয়ে বা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং জোরজবরদস্তি থেকে দূরে থাকা দায়িত্বশীল অভিভাবকত্বের অংশ।
কন্যাসন্তান বোঝা নয়, আমানত
ইসলামের দৃষ্টিতে কন্যাসন্তান কোনো বোঝা নয়; বরং আল্লাহর দেওয়া আমানত। তার প্রতি মমতা, সম্মান ও দায়িত্বশীল আচরণ পরিবারে ভালোবাসার পরিবেশ তৈরি করে। পাশাপাশি সন্তানকে সৎ ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে মা-বাবা তাদের দায়িত্ব পালন করেন।
কন্যাসন্তানের লালন-পালনকে কেবল সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, আন্তরিকতা, ধৈর্য, ন্যায়বিচার ও ভালোবাসার সঙ্গে এ দায়িত্ব পালন ইবাদতের মর্যাদা পেতে পারে। আর হাদিসে বর্ণিত প্রতিদানের সুসংবাদ মা-বাবাকে কন্যাসন্তানের যত্ন ও অধিকার নিশ্চিত করতে উৎসাহিত করে।
ভোরের আকাশ/জেআ