জন্মদাতা ছাড়া কাউকে বাবা বলা যাবে?

ইসলাম একটি সুশৃঙ্খল ও স্বভাবজাত জীবনব্যবস্থা। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে কার কী মর্যাদা, কার সাথে রক্তের বন্ধন এবং কার সূত্রে একজন মানুষের মূল বংশপরিচয় নির্ধারিত হবে—এ বিষয়ে ইসলাম অত্যন্ত কঠোর ও সুস্পষ্ট সীমারেখা টেনে দিয়েছে।
আমাদের সমাজে অনেক সময় দেখা যায়, অতি ভক্তি, ভালোবাসা, লালন-পালন কিংবা সম্মান প্রদর্শন করতে গিয়ে জন্মদাতা পিতা ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি—যেমন পালক পিতা, শ্বশুর, পীর সাহেব বা কোনো মুরুব্বিকে ‘বাবা’ বা ‘পিতা’ বলে সম্বোধন করা হয়। এ বিষয়ে ইসলামী শরিয়াহর প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি, পবিত্র কোরআনের নির্দেশ এবং হাদিসের কঠোর সতর্কবার্তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. মূল বিধান: বংশপরিচয় পরিবর্তনের নিয়তে বলা সম্পূর্ণ হারাম
ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী, নিজের আসল বংশপরিচয় লুকিয়ে বা জন্মদাতা পিতাকে অস্বীকার করে অন্য কোনো ব্যক্তিকে নিজের ‘পিতা’ বা ‘বাবা’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম (নিষিদ্ধ) এবং কবিরা গুনাহ। এটি ইসলামের অন্যতম একটি মৌলিক বিধান।
জাহেলিয়াত বা ইসলামপূর্ব যুগে আরবে পালক পুত্র গ্রহণের প্রথা ছিল এবং পালক সন্তানকে আসল সন্তানের মতোই তার পালক পিতার বংশনামে ডাকা হতো। কিন্তু ইসলাম এসে এই প্রথাকে সম্পূর্ণ বাতিল করে দেয়।
২. পবিত্র কোরআনের স্পষ্ট নির্দেশনা
মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে পালক সন্তানদের ক্ষেত্রে এবং প্রকৃত বংশপরিচয় অক্ষুণ্ন রাখার ব্যাপারে সরাসরি নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করেছেন:
“তোমরা তাদেরকে (পালক সন্তানদের) তাদের প্রকৃত পিতাদের পরিচয়ে ডাকো। আল্লাহর কাছে এটাই সবচেয়ে ন্যায়সঙ্গত। আর যদি তোমরা তাদের পিতাদের (পরিচয়) না জানো, তবে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই ও বন্ধু।” (সূরা আল-আহজাব, আয়াত: ৫)
এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর সাহাবায়ে কেরামগণ নবীজি ﷺ-এর প্রিয় আজাদ করা গোলাম ও পালক পুত্র হযরত যায়েদ (রা.)-কে ‘যায়েদ ইবনে মুহাম্মদ’ (মুহাম্মদের পুত্র যায়েদ) বলা বন্ধ করে দিয়ে তাঁর আসল পিতার নামানুসারে ‘যায়েদ ইবনে হারিসাহ’ (হারিসার পুত্র যায়েদ) বলে ডাকতে শুরু করেন।
৩. হাদিসের কঠোর হুঁশিয়ারি
রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজের জন্মদাতা পিতা ছাড়া অন্য কাউকে নিজের পিতা বলে দাবি করা বা পরিচয় দেওয়ার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন।
জান্নাত হারাম হওয়ার ঘোষণা: হযরত সাদ (রা.) ও আবু বাকরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তাঁরা উভয়ে বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
“ যে ব্যক্তি জেনেশুনে নিজের জন্মদাতা পিতা ছাড়া অন্য কাউকে পিতা বলে দাবি করল (বা পরিচয় দিল), তার জন্য জান্নাত হারাম।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং- ৬৭৬৬; সহীহ মুসলিম)
- কুফরির সমতুল্য অপরাধ: অন্য এক হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “তোমরা নিজেদের পিতাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না (তাদের পরিচয় অস্বীকার করো না)। কেননা, নিজের পিতাকে ছেড়ে অন্যকে পিতা দাবি করা এক ধরণের কুফরি (বা অকৃতজ্ঞতা)।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং- ৬৭৬৮)
৪. তবে ভক্তি বা সম্মানার্থে ‘বাবা’ সম্বোধন করার হুকুম কী?
এখানে একটি বিষয় খুব ভালো করে বোঝা দরকার—তা হলো ‘পরিচয় দেওয়া’ বনাম ‘শ্রদ্ধাবোধ থেকে ডাকা’।
- বংশীয় পরিচয় (হারাম): যদি কোনো ব্যক্তি তার কাগজে-কলমে, মুখে বা বংশতালিকায় অন্য কাউকে নিজের পিতা দাবি করে (যেমন: বাবার নামের জায়গায় আসল পিতার নাম বাদ দিয়ে শ্বশুর বা অন্য কারও নাম লেখা), তবে তা উপরে উল্লেখিত হাদিস অনুযায়ী স্পষ্ট হারাম।
- সম্মান বা স্নেহার্থে সম্বোধন (জায়েজ): যদি বংশপরিচয় পরিবর্তনের কোনো উদ্দেশ্য না থাকে, বরং একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষকে মুরুব্বি হিসেবে সম্মান জানিয়ে, শ্বশুরকে শ্রদ্ধা করে কিংবা কোনো সন্তানহীন মুরুব্বি স্নেহের বশে কাউকে ‘বাবা’ বা ‘আব্বা’ বলে ডাকেন—তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে তা নাজায়েজ বা গুনাহ নয়। তবে ওলামায়ে কেরামদের মতে, যেকোনো ধরণের বিভ্রান্তি বা ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে এবং হাদিসের কঠোরতার প্রতি সম্মান রেখে মুরুব্বিদের ক্ষেত্রে ‘চাচা’, ‘মামা’, ‘খালু’ বা ‘শ্বশুর আব্বা’র মতো সুনির্দিষ্ট সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহার করাই সবচেয়ে নিরাপদ ও উত্তম।
মানুষের বংশধারা ও রক্তের বন্ধন আল্লাহর এক মহান নিয়ামত। কোনো লালন-পালনকারী বা হিতাকাঙ্ক্ষী কখনোই জন্মদাতার বিকল্প হতে পারে না। তাই সামাজিক ও আইনি সব ক্ষেত্রে নিজের প্রকৃত পিতার পরিচয় অক্ষুণ্ন রাখা এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশিত পারিবারিক কাঠামো বজায় রাখাই একজন প্রকৃত মুমিনের ঈমানী দায়িত্ব।
ভোরের আকাশ/জেআ