হাত-পা ও শরীরের লোম ওয়াক্সিং করা কি বৈধ?

সৌন্দর্যচর্চা ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অংশ হিসেবে বর্তমানে নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যেই ওয়াক্সিংয়ের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। শরীরের অবাঞ্ছিত লোম দূর করতে অনেকেই এই পদ্ধতি বেছে নিচ্ছেন। তবে ধর্মীয় বিধিবিধান মেনে চলতে চান এমন অনেকের মনেই প্রশ্ন—ইসলামে ওয়াক্সিং করা কি হালাল, নাকি হারাম?
ইসলামি শরিয়তে শরীরের সব ধরনের লোম দূর করার বিষয়ে একই বিধান দেওয়া হয়নি। কিছু লোম পরিষ্কার করাকে সুন্নত ও স্বাভাবিক পরিচ্ছন্নতার অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার কিছু লোম অপসারণের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অন্যদিকে, কয়েকটি ক্ষেত্রে আলেমদের মধ্যে মতভেদও দেখা যায়।
শরীরের হাত-পায়ের লোম দূর করা কি জায়েজ?
ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, হাত-পায়ের লোম দূর করার বিষয়ে কোরআন ও হাদিসে সরাসরি কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। এ কারণে অনেক আলেমের মতে, সৌন্দর্যচর্চা বা পরিচ্ছন্নতার প্রয়োজনে ওয়াক্সিংয়ের মাধ্যমে হাত-পায়ের লোম দূর করা জায়েজ।
ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের দারুল ইফতার এক ফতোয়ায় বলা হয়েছে, হাত-পায়ের অতিরিক্ত লোম পরিষ্কার করতে ওয়াক্সিং ব্যবহার করা অনুমোদিত। তবে এতে শরিয়তের কোনো বিধান লঙ্ঘন করা যাবে না। যেমন—ওয়াক্সের কারণে ত্বকে পানি পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি হলে অজু ও গোসলের আগে তা দূর করতে হবে। একই সঙ্গে পর্দা ও শালীনতার বিধানও মেনে চলতে হবে।
বগল ও গোপনাঙ্গের লোম দূর করা
ইসলামে বগলের লোম উপড়ে ফেলা এবং গোপনাঙ্গের লোম পরিষ্কার করাকে ফিতরাত বা স্বাভাবিক পরিচ্ছন্নতার অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সহিহ মুসলিমের ২৬১ নম্বর হাদিসে এসব কাজের কথা এসেছে।
এসব লোম পরিষ্কারের ক্ষেত্রে ওয়াক্সিং, শেভিং কিংবা হেয়ার রিমুভাল ক্রিম ব্যবহার করা যায় বলে আলেমদের একাধিক ফতোয়ায় উল্লেখ রয়েছে। দারুল ইফতা বার্মিংহামের এক ফতোয়া অনুযায়ী, শরীরের অবাঞ্ছিত লোম দূর করার নিরাপদ পদ্ধতি হিসেবে ওয়াক্সিং ব্যবহার করা যেতে পারে।
ভ্রু ওয়াক্সিংয়ের বিধান কী?
ভ্রুর ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। হাদিসে সৌন্দর্যের উদ্দেশ্যে ভ্রু উপড়ে ফেলা বা আকৃতি পরিবর্তন করার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে এ বিষয়ে বর্ণনা রয়েছে।
ইসলামি শরিয়তের অনেক আলেমের মতে, ওয়াক্সিং, থ্রেডিং বা অন্য কোনো পদ্ধতিতে সৌন্দর্যের উদ্দেশ্যে ভ্রুর স্বাভাবিক আকৃতি পরিবর্তন করা জায়েজ নয়। তবে ভ্রুর মাঝখানের অতিরিক্ত লোম কিংবা অস্বাভাবিকভাবে গজানো লোমের বিষয়ে আলেমদের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে।
বিউটি পার্লারে ওয়াক্সিং করানো যাবে?
ওয়াক্সিংয়ের পদ্ধতি বৈধ হলেও তা করানোর ক্ষেত্রে পর্দা ও শালীনতার বিধান মানতে হবে। বিশেষ করে শরীরের যেসব অংশ অন্যের সামনে প্রকাশ করা নিষিদ্ধ, সেসব অংশ অপরের সামনে উন্মুক্ত করা যাবে না।
নারীদের ক্ষেত্রে অন্য নারী বা পুরুষের সামনে সতর প্রকাশের বিধান রয়েছে। তাই বিউটি পার্লারে ওয়াক্সিং করানোর সময় নারী কর্মীর মাধ্যমে এবং শরিয়তসম্মত সীমার মধ্যে থেকে সেবা নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। চিকিৎসা বা বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া সতর উন্মুক্ত করার অনুমতি নেই।
ওয়াক্সিংয়ের আগে যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখা জরুরি
ওয়াক্সিংয়ের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধানের পাশাপাশি শারীরিক নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ত্বকের ক্ষতি হয় এমন কোনো পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত নয়। অজু ও গোসলের সময় ত্বকে পানি পৌঁছাতে বাধা দেয়—এমন কোনো উপাদান থাকলে তা পরিষ্কার করতে হবে। পাশাপাশি ওয়াক্সিংয়ের সময় পর্দা, শালীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখতে হবে।
তাহলে ওয়াক্সিং কি হালাল?
সার্বিকভাবে বলা যায়, ইসলামে ওয়াক্সিং নিজে হারাম নয়। শরিয়তে যেসব লোম দূর করার অনুমতি রয়েছে, সেগুলো নিরাপদ পদ্ধতিতে ওয়াক্সিংয়ের মাধ্যমে পরিষ্কার করা যেতে পারে। তবে ভ্রুর মতো নিষিদ্ধ লোম অপসারণ, সতর প্রকাশ কিংবা শরীরের ক্ষতি হয়—এমন পরিস্থিতিতে ওয়াক্সিং করা বৈধ হবে না।
এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য থাকায় ব্যক্তিগত পরিস্থিতি ও অনুসৃত মাজহাব অনুযায়ী নির্ভরযোগ্য আলেম বা মুফতির পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
তথ্যসূত্র: দারুল উলুম দেওবন্দের দারুল ইফতা, দারুল ইফতা বার্মিংহাম, সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি এবং ইসলামকিউএ।
ভোরের আকাশ/জেআ