কোরআনে শহীদদের মর্যাদা ও সম্মান

মানুষ মরণশীল। দুনিয়াতে আগত প্রতিটি প্রাণীকেই একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘প্রতিটি প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৮৫)
এই চূড়ান্ত সত্য অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। মুসলিম হোক কিংবা অমুসলিম, সবাইকেই একদিন দুনিয়ার সব মায়া ত্যাগ করে বিদায় নিতে হবে। তবে সৌভাগ্যবান তারাই, যারা দুনিয়াতে থাকা অবস্থাতেই নিজেদের জীবন ও মৃত্যু আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করে দেয়। বরং ঈমানের প্রকৃত নিদর্শন হলো নিজের নামাজ, ইবাদত, জীবন ও মরণ— সবকিছু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত করা।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলো, আমার নামাজ, আমার সব ইবাদত, আমার জীবন ও আমার মরণ—সবকিছুই বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।’ (সুরা আনআম, আয়াত ১৬২)
মহান আল্লাহ মুমিনদের জীবন ও সম্পদ জান্নাতের বিনিময়ে কিনে নিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের থেকে তাদের জান ও মাল ক্রয় করে নিয়েছেন, এর বিনিময়ে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত।’ (সুরা তাওবা, আয়াত ১১১)
অতএব, যারা সর্বদা আল্লাহর পথে শাহাদাত লাভের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে এবং যাদের মৃত্যু শহীদি মর্যাদায় হয়, তাদের মৃত্যুর চেয়ে সৌভাগ্যের আর কিছু হতে পারে না। তারা ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার জীবন দিয়ে চিরস্থায়ী জান্নাতের অধিকারী হয়ে যায়।
শহীদকে হত্যা করে শেষ করে দেওয়া যায় না। কারণ শহীদদের প্রকৃত অর্থে মৃত্যু হয় না। মহান আল্লাহ নিজেই তাদের মৃত বলতে নিষেধ করেছেন। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, তাদের মৃত বলো না; বরং তারা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা উপলব্ধি করতে পারো না।’ (সুরা বাকারাহ, আয়াত ১৫৪)
এই আয়াতে আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গকারীদের বিশেষ মর্যাদা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। যদিও প্রত্যেক মৃত ব্যক্তিই কবরের জীবনে প্রবেশ করে এবং সে জীবনে সে তার আমলের ফল ভোগ করে, তবে আল্লাহর পথে শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের জীবন অন্যান্য মৃতের জীবন থেকে ভিন্ন ও বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ।
হাদিস শরিফে শহীদদের সেই জীবনের কিছু চিত্র পাওয়া যায়। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ওহুদ যুদ্ধের দিন যখন তোমাদের ভাইয়েরা শহীদ হয়, তখন আল্লাহ তাদের রুহগুলোকে সবুজ রঙের পাখির মধ্যে স্থাপন করেন। তারা জান্নাতের ঝরনাগুলোর ওপর দিয়ে উড়ে বেড়ায়, ফলমূল ভক্ষণ করে এবং আরশের ছায়ায় ঝোলানো সোনার ফানুসে অবস্থান করে। তারা বলে, আমাদের এই অবস্থার কথা যদি দুনিয়ার ভাইয়েরা জানত, তাহলে তারা জিহাদে অলস হতো না। তখন আল্লাহ বলেন, ‘আমি নিজেই তাদের কাছে তোমাদের এ সংবাদ পৌঁছে দেব।’
এরপর এই আয়াত অবতীর্ণ হয়— ‘যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদের মৃত মনে কোরো না; বরং তারা জীবিত এবং তাদের রবের নিকট থেকে নিয়মিত রিজিক পাচ্ছে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৬৯; আবু দাউদ, হাদিস ২৫২০)
পরকালে শহীদদের মর্যাদা হবে আকাশচুম্বী। নবী ও সিদ্দিকদের পরেই তাদের স্থান। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করে, তারা তাদের সঙ্গে থাকবে—নবী, সিদ্দিক, শহীদ ও সৎকর্মশীলদের সঙ্গে। আর তারা কত উত্তম সঙ্গী।’ (সুরা নিসা, আয়াত ৬৯)
হাদিস শরিফেও শহীদদের বিশেষ সম্মানের কথা বারবার এসেছে। মিকদাম ইবনে মাদিকারিব (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, শহীদের জন্য আল্লাহর কাছে ছয়টি পুরস্কার রয়েছে— প্রথম রক্তবিন্দু পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে ক্ষমা করা হয়, তাকে জান্নাতে তার বাসস্থান দেখানো হয়, কবরের আজাব থেকে মুক্তি দেওয়া হয়, কঠিন ভীতির দিন সে নিরাপদ থাকবে, তার মাথায় মর্যাদার মুকুট পরানো হবে, ৭২ জন জান্নাতি হুরের সঙ্গে তার বিবাহ হবে এবং তার ৭০ জন আত্মীয়ের জন্য তার সুপারিশ কবুল করা হবে। (তিরমিজি, হাদিস ১৬৬৩)
এসব তো কেবল কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত সীমিত তথ্য। শহীদদের প্রকৃত মর্যাদা ও প্রতিদান কত মহান হবে, তা একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘কে আছে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে, তিনি তার জন্য বহু গুণে তা বৃদ্ধি করে দেবেন।’ (সুরা বাকারাহ, আয়াত ২৪৫)
যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় নিজের জীবন উৎসর্গ করে, তার প্রতিদান কত মহান হবে, তা মানব বুদ্ধির পরিধিতে ধারণ করাও সম্ভব নয়। এ কারণেই বিশ্বনবী (সা.) নিজেও শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা করতেন। তিনি বলতেন, ‘সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, আমি চাই আল্লাহর পথে শহীদ হতে, আবার জীবিত হতে, আবার শহীদ হতে।’ (বুখারি, হাদিস ২৭৯৭)
নবীর প্রকৃত উম্মতরাও সত্য ও ন্যায়ের পথে জীবন উৎসর্গ করতে পিছপা হয় না। শতবার জীবন দেওয়া হলেও তারা শতবারই দ্বিন প্রতিষ্ঠার পথে জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকবে।
মহান আল্লাহ সব শহীদকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করুন। আমিন।
ভোরের আকাশ/তা.কা