ইসলামে ছেলে-মেয়ের বন্ধুত্বের বিধান কী?

বর্তমান সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেলে-মেয়ের পারস্পরিক যোগাযোগ খুবই স্বাভাবিক বিষয়। পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা কিংবা বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে নারী-পুরুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হয়। তবে এ ধরনের যোগাযোগ ও বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে ইসলামে রয়েছে কিছু নির্দিষ্ট নীতিমালা ও সীমারেখা।
ইসলামে নারী-পুরুষের স্বাভাবিক প্রয়োজনীয় যোগাযোগকে একেবারে নিষিদ্ধ করা হয়নি। তবে সম্পর্কের ধরন, উদ্দেশ্য, কথাবার্তা ও আচরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যারা পরস্পরের মাহরাম নন, তাদের মধ্যে এমন ঘনিষ্ঠতা ইসলাম সমর্থন করে না, যা ধীরে ধীরে অনৈতিক বা অবৈধ সম্পর্কে রূপ নিতে পারে।
দৃষ্টি ও আচরণে সংযম
পবিত্র কোরআনের সূরা আন-নূরে মুমিন পুরুষ ও নারীদের দৃষ্টি সংযত রাখা এবং নিজেদের পবিত্রতা রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নারীদের ক্ষেত্রেও শালীনতা ও সৌন্দর্য প্রদর্শনের বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে।
অর্থাৎ নারী-পুরুষের পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে শালীনতা, সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় কথা বলা বা কোনো কাজে সহযোগিতা করার বিষয়টি আর ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা তৈরি করা এক বিষয় নয়।
একান্তে দেখা করা কেন নিষেধ?
ইসলামী বিধানে গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষের নির্জনে একান্তে অবস্থান বা দেখা করাকে নিষেধ করা হয়েছে। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) নারী-পুরুষের নির্জন সাক্ষাৎ থেকে সতর্ক করেছেন।
এর উদ্দেশ্য হলো এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা, যেখানে আবেগ, আকর্ষণ বা প্রলোভনের কারণে সম্পর্ক অনাকাঙ্ক্ষিত দিকে যেতে পারে।
তাহলে কি ছেলে-মেয়ে কথা বলতে পারবে না?
এখানে বিষয়টি শুধু ‘কথা বলা’ বা ‘বন্ধুত্ব’ শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইসলামী দৃষ্টিতে সম্পর্কের উদ্দেশ্য ও ধরন গুরুত্বপূর্ণ। পড়াশোনা, চিকিৎসা, কর্মক্ষেত্র, ব্যবসা, প্রয়োজনীয় পরামর্শ কিংবা সামাজিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের যোগাযোগের প্রয়োজন হতে পারে।
তবে সেই যোগাযোগ যেন অপ্রয়োজনীয় ঘনিষ্ঠতা, অশালীন কথাবার্তা, গোপন সম্পর্ক, আবেগনির্ভর আসক্তি বা নির্জনে দেখা করার পর্যায়ে না যায়—এটাই মূল সতর্কতার জায়গা।
বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে সীমারেখা কী?
ইসলামী মূল্যবোধ অনুযায়ী গায়রে মাহরাম ছেলে-মেয়ের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—
- প্রয়োজনীয় যোগাযোগে শালীনতা বজায় রাখা।
- অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত বা অন্তরঙ্গ আলাপ এড়িয়ে চলা।
- নির্জনে একসঙ্গে সময় না কাটানো।
- সম্পর্ককে গোপন রাখা বা পরিবারের কাছ থেকে লুকানোর প্রবণতা এড়িয়ে চলা।
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও আবেগনির্ভর সম্পর্ক থেকে দূরে থাকা।
- পারস্পরিক সম্মান ও ইসলামী শালীনতা বজায় রাখা।
- সম্পর্ক যদি বিয়ের উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে সেটিকে বৈধ ও পারিবারিক প্রক্রিয়ার দিকে নেওয়া।
- বন্ধুত্ব আর প্রয়োজনীয় যোগাযোগ এক নয়
ইসলামের আলোচনায় একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—প্রয়োজনীয় সামাজিক যোগাযোগ আর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বকে এক করে দেখা ঠিক নয়। একজন ছেলে ও একজন মেয়ে সহপাঠী, সহকর্মী বা কোনো প্রতিষ্ঠানের সদস্য হিসেবে প্রয়োজনীয় কথা বলতে পারেন। কিন্তু সেই যোগাযোগ যদি ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা, গোপনীয়তা ও আবেগনির্ভর সম্পর্কে পরিণত হয়, তখন ইসলামী সীমারেখার বিষয়টি সামনে আসে।
তাই ইসলামের দৃষ্টিতে নারী-পুরুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো শালীনতা, সংযম, প্রয়োজনীয়তার সীমা ও নৈতিকতা বজায় রাখা। একই সঙ্গে কাউকে অপমান, সন্দেহ বা অযথা হয়রানি করাও ইসলাম সমর্থন করে না।
বিয়ের উদ্দেশ্যে সম্পর্ক হলে
কোনো ছেলে ও মেয়ের মধ্যে পারস্পরিক পছন্দ তৈরি হলে ইসলাম সেটিকে অনির্দিষ্ট সময়ের গোপন বন্ধুত্ব হিসেবে চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে বৈধ বিবাহের পথে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দেয়। কোরআনে অবিবাহিতদের বিবাহ দেওয়ার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে এবং যারা এখনো বিবাহের সামর্থ্য অর্জন করতে পারেনি, তাদের সংযম অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সবশেষে বলা যায়, ইসলামে ছেলে-মেয়ের পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন শুধু ‘বন্ধুত্ব করা যাবে কি না’—এটি নয়। বরং সম্পর্কটি কী উদ্দেশ্যে, কীভাবে এবং কোন সীমার মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় যোগাযোগ শালীনতার সঙ্গে হতে পারে; কিন্তু গায়রে মাহরামের সঙ্গে এমন ঘনিষ্ঠতা, যা ইসলামী নৈতিকতা ও নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম করে, তা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ রয়েছে।
নোট: ইসলামী বিধানের বিভিন্ন বিষয়ে মাজহাব ও আলেমদের ব্যাখ্যায় কিছু পার্থক্য থাকতে পারে। তাই নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিগত পরিস্থিতির ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত আলেম বা ইসলামি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উত্তম।
ভোরের আকাশ/জেআ