ইসলামি শরিয়তে অসিয়তের নিয়ম ও করণীয়

মানবজীবন ক্ষণস্থায়ী। জন্মের পর প্রতিটি প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে। মৃত্যুর পর মানুষের পার্থিব সব অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও, কিছু দায়িত্ব বা ইচ্ছা অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে। এই অসম্পূর্ণ শরিয়তসম্মত দায়িত্ব বা সৎ ইচ্ছাগুলো মৃত্যুর পর বাস্তবায়নের জন্য জীবিত ব্যক্তিদের আইনি বা মৌখিকভাবে নির্দেশ দিয়ে যাওয়াই হলো ‘অসিয়ত’ ।
ইসলামী শরিয়তে অসিয়তের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি কেবল একটি সামাজিক প্রথাই নয়, বরং এর সাথে পরকালীন জবাবদিহিতা এবং রেখে যাওয়া পরিবারের শান্তি ও শৃঙ্খলার বিষয়টি সরাসরি জড়িত। নিচে অসিয়তের গুরুত্ব, প্রকারভেদ এবং একটি সহজ নমুনা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. ইসলামী শরিয়তে অসিয়তের গুরুত্ব
ইসলামে মৃত্যুর পূর্বে নিজের সম্পত্তি, ঋণ এবং দ্বীনি দায়িত্বের ব্যাপারে স্পষ্ট অসিয়ত বা নির্দেশনা লিখে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পবিত্র কোরআনের নির্দেশনা: আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন:
“তোমাদের কারও যখন মৃত্যু উপস্থিত হয়, যদি সে কোনো ধন-সম্পদ রেখে যায়, তবে তার পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনদের জন্য ন্যায়সঙ্গতভাবে অসিয়ত করা ফরজ (বা জরুরি) করা হলো। এটি মুত্তাকিদের একটি দায়িত্ব।” (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮০)
হাদিসের কঠোর তাগিদ: রাসুলুল্লাহ ﷺ অসিয়ত লিখে রাখাকে একজন মুমিনের দূরদর্শিতা ও কর্তব্যের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “কোনো মুসলিম ব্যক্তির যদি এমন কিছু থাকে যা অসিয়ত করার মতো, তবে তার জন্য অসিয়তটি লিখিত আকারে নিজের কাছে না রেখে টানা দুটি রাত অতিবাহিত করাও উচিত নয়।” (সহীহ বুখারী, হাদিস নং- ২৭৩৮)
গুরুত্বপূর্ণ আইনি সীমাবদ্ধতা (এক-তৃতীয়াংশের নিয়ম): ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি তার সম্পদের সম্পূর্ণ অংশ অসিয়ত করতে পারবেন না। তিনি সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ (1/3) সম্পদ কোনো সৎ কাজ বা এমন ব্যক্তির জন্য অসিয়ত করতে পারবেন, যিনি তার শরিয়তসম্মত বাধ্যতামূলক উত্তরাধিকারী (যেমন: ছেলে, মেয়ে, স্ত্রী, পিতা-মাতা) নন। কারণ বাধ্যতামূলক উত্তরাধিকারীদের অংশ আল্লাহ নিজেই নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
২. অসিয়তের প্রকারভেদ বা ধরন
বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে একজন মুমিনের অসিয়ত প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্ত হতে পারে:
ক. দ্বীনি ও আধ্যাত্মিক অসিয়ত
এটি মূলত পরিবারের সদস্যদের প্রতি ঈমান, আমল ও ইসলামসম্মত জীবনযাপনের তাগিদ। এর মধ্যে রয়েছে:
মৃত্যুর পর যেন ইসলামসম্মত উপায়ে কাফন-দাফন করা হয়।
জানাজায় কোনো বিদআত বা কুসংস্কারের আশ্রয় যেন না নেওয়া হয়।
পরিবারের সবাই যেন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে এবং হালাল উপায়ে জীবন চালায়।
খ. আর্থিক ও বৈষয়িক অসিয়ত
এটি সম্পদ, ঋণ এবং মানুষের পাওনা পরিশোধের সাথে সম্পর্কিত। যেমন:
ঋণ পরিশোধের তাগিদ: কারও কাছ থেকে ধার নেওয়া টাকা বা ব্যাংকের ঋণ থাকলে তা যেন উত্তরাধিকার বণ্টনের আগেই পরিশোধ করা হয়।
অধরা ইবাদতের ক্ষতিপূরণ (ফিদিয়া): জীবনদ্দশায় কোনো ফরজ নামাজ বা রোজা কাজা হয়ে থাকলে এবং তা আদায়ের সামর্থ্য না থাকলে, সেগুলোর ফিদিয়া বা কাফফারা দেওয়ার অসিয়ত।
দান-সদকাহ (ওয়াকফ): নিজের সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ বা তার কম অংশ কোনো এতিমখানা, মসজিদ, মাদ্রাসা বা কোনো দরিদ্র অনাত্মীয়কে দেওয়ার ইচ্ছা।
৩. মৃত্যুপরবর্তী অসিয়তনামার একটি সাধারণ নমুনা
নিচে একটি আদর্শ ও সাধারণ অসিয়তনামার খসড়া দেওয়া হলো, যা যে কেউ নিজের মতো করে তৈরি করে বিশ্বস্ত সাক্ষী ও পরিবারের কাছে জমা রাখতে পারেন:
বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম
আমার অন্তিম অসিয়তনামা
আমি ....................................................., পিতা: ....................................................., সম্পূর্ণ সুস্থ মস্তিস্কে, সজ্ঞানে এবং অন্যের প্ররোচনা ছাড়া মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আমার মৃত্যুপরবর্তী সময়ের জন্য এই অসিয়তনামা লিখে যাচ্ছি।
১. ঈমান ও আমলের অসিয়ত: আমি আমার স্ত্রী, সন্তান ও পরিবার-পরিজনকে অসিয়ত করছি যে, তোমরা সর্বদা একমাত্র মহান আল্লাহর ইবাদত করবে, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ অনুসরণ করবে এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো আদায় করবে। কখনো শিরক, কুসংস্কার ও হারামের কাছে যাবে না।
২. কাফন, দাফন ও জানাজা: আমার মৃত্যুর পর সম্পূর্ণ সুন্নাত তরিকায় যেন আমার গোসল ও কাফন-দাফন সম্পন্ন করা হয়। আমার জানাজা ও দাফনের ক্ষেত্রে শরিয়ত পরিপন্থী কোনো প্রথা বা বিদআতের আশ্রয় নেওয়া যাবে না। দাফনের পর আমার মাগফিরাতের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করবে।
৩. ঋণ ও পাওনা পরিশোধ (অগ্রাধিকার ভিত্তিতে): আমার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পদ বণ্টনের আগেই যদি আমার কোনো ঋণ (পাবলিক বা প্রাইভেট) থাকে, তবে তা আমার রেখে যাওয়া মূল সম্পদ থেকে সবার আগে পরিশোধ করতে হবে। কারও কোনো পাওনা বা হক থাকলে তা সসম্মানে ফিরিয়ে দেবে।
৪. দান ও সদকা (অনূর্ধ্ব এক-তৃতীয়াংশ): আমার মোট সম্পত্তির মধ্য থেকে ......................... অংশ/টাকা/জমি (যা মোট সম্পদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি নয়) আল্লাহর ওয়াস্তে অমুক এতিমখানা/মসজিদ/মাদ্রাসায় দান করার অসিয়ত করছি।
৫. সম্পত্তি বণ্টন: উপরোক্ত ঋণ ও অসিয়ত পূরণের পর আমার অবশিষ্ট স্থাবর-অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর ফারায়েজ (উত্তরাধিকার আইন) অনুযায়ী নিখুঁতভাবে বণ্টন করে নেবে। এ নিয়ে কেউ কোনো প্রকার ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হবে না।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে ঈমানের সাথে মৃত্যু নসিব করুন। আমীন।
অসিয়তকারীর স্বাক্ষর: .................................................... তারিখ: .............................
সাক্ষীগণের স্বাক্ষর: ১. .................................................... ২. ....................................................
একটি স্পষ্ট এবং লিখিত অসিয়তনামা মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যদের বড় ধরণের ভুল বোঝাবুঝি, পারিবারিক কলহ এবং পাপের হাত থেকে রক্ষা করে। তাই জীবনের শেষ মুহূর্তের অপেক্ষা না করে, সুস্থ ও সচল থাকা অবস্থাতেই অসিয়ত ঠিক করে রাখা প্রত্যেক সচেতন মুমিনের দায়িত্ব।