আল্লাহর জিকিরে দূর হয় মানসিক অস্থিরতা

আধুনিক এই তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ ও যান্ত্রিক জীবনে হতাশা, মানসিক চাপ , বিষণ্ণতা এবং অস্থিরতা আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। মানসিক শান্তি ও আত্মিক শক্তি খোঁজার জন্য মানুষ কত কিছুই না করে—মেডিটেশন, থেরাপি থেকে শুরু করে নানা রকম কাউন্সেলিং। অথচ একজন মুসলিমের জন্য মানসিক শক্তি অর্জন এবং মনকে শান্ত রাখার সবচেয়ে সহজ, কার্যকর ও ঐশ্বরিক মাধ্যম হলো ‘জিকির’ বা আল্লাহর স্মরণ।
জিকির কেবল পরকালের সওয়াব অর্জনের উপায় নয়, এটি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এক মহৌষধ। পবিত্র কোরআন, সুন্নাহ এবং আধুনিক মনস্তত্ত্বের আলোকে জিকির কীভাবে মানুষের মানসিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়, তা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. অন্তরের স্থায়ী প্রশান্তি ও স্বস্তি
মানুষের মন যখন দুনিয়াবি কোনো ক্ষতি, ভয় বা অনিশ্চয়তায় দুলতে থাকে, তখন জিকির মনের ভেতর এক ধরণের স্থায়ী নোঙ্গর তৈরি করে।
কোরআনের চিরন্তন বাণী: আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন:
“জেনে রেখো, আল্লাহর জিকিরেই কেবল অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।” (সূরা আর-রাদ, আয়াত: ২৮)
যখন কোনো বান্দা মুখে ও অন্তরে ‘আল্লাহ’ নাম উচ্চারণ করে, তখন তার মস্তিষ্ক ও হৃদয়ে এক ধরণের অলৌকিক প্রশান্তি অনুভূত হয়, যা সমস্ত নেতিবাচক চিন্তা ধুয়েমুছে সাফ করে দেয়।
২. হতাশা ও অবসাদ থেকে মুক্তি
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষ যখন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করে অথবা অতীত নিয়ে অনুশোচনায় ভোগে, তখনই মানসিক অবসাদ তৈরি হয়। জিকির মানুষকে ‘বর্তমান’ সময়ে বাঁচতে এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা (তাওয়াক্কুল) রাখতে শেখায়। ‘লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ (আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি বা ক্ষমতা নেই)—এই জিকিরটি নিয়মিত করলে মানুষের ভেতরের একাকীত্ব ও অসহায়ত্ব দূর হয়ে যায় এবং মনে এক অদম্য সাহসের সঞ্চার হয়।
৩. ক্ষোভ ও মানসিক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ
রাগ, ক্ষোভ বা প্রতিশোধস্পৃহা মানুষের মানসিক শক্তিকে চুষে নেয় এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। শয়তান মানুষের রক্তে মজ্জায় মিশে রাগ ও উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়।
হাদিসের শিক্ষা: রাসুলুল্লাহ ﷺ রাগের মাথায় ‘আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম’ পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহর এই স্মরণ মুহূর্তের মধ্যে মস্তিষ্কের উত্তেজনাকে শান্ত করে এবং মানুষকে যেকোনো পরিস্থিতিতে ধৈর্যশীল ও সহনশীল হতে সাহায্য করে।
৪. আত্মবিশ্বাস ও ইতিবাচক মানসিকতা বৃদ্ধি
দৈনন্দিন জীবনে নানা ব্যর্থতা মানুষের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। কিন্তু একজন মুমিন যখন জিকির করে, তখন সে মনে মনে বিশ্বাস করে যে মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সত্ত্বা আল্লাহ তার সাথে আছেন। ‘হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি'মাল অকিল’ (আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনি কতই না চমৎকার কর্মবিধায়ক)—এই জিকিরটি মানুষের ভেতরের অবদমিত ভয় দূর করে আত্মবিশ্বাসকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
৫. ইস্তিগফারের জাদুকরী শক্তি
মানসিক অস্থিরতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো নিজের অজান্তে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন পাপের কারণে মনের ভেতর তৈরি হওয়া এক অদৃশ্য অপরাধবোধ ।
রিযিক ও শক্তি বৃদ্ধি: বেশি বেশি ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বা ক্ষমা প্রার্থনার জিকির করলে মনের সেই অদৃশ্য কালো দাগ ও অপরাধবোধ কেটে যায়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ইস্তিগফার করলে আল্লাহ আকাশ থেকে রহমতের বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং মানুষের ধন-সম্পদ ও ‘শারীরিক ও মানসিক শক্তি’ বাড়িয়ে দেন।
দৈনিক অভ্যাসে জিকির রাখার সহজ উপায়:
জিকিরের জন্য সবসময় জায়নামাজে বসে থাকার প্রয়োজন নেই। হাত-পা ও মুখ সচল রেখেও জিকির করা সম্ভব:
- অফিস বা কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার সময়, গাড়িতে বসে বা হাঁটার সময় মনে মনে ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘আল্লাহু আকবার’ তাসবিহগুলো পড়া।
- প্রতি ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর রাসুলুল্লাহ ﷺ নির্দেশিত সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন জিকির ও দোয়াগুলো পড়ার অভ্যাস করা।
জিকির হলো আত্মার খোরাক। শরীর সচল রাখতে যেমন খাবারের প্রয়োজন, মন ও মগজকে শক্তিশালী রাখতে তেমনই জিকিরের প্রয়োজন। যে মুখ ও অন্তর আল্লাহর জিকিরে ব্যস্ত থাকে, তাকে দুনিয়ার কোনো দুঃখ, কষ্ট বা সংকট সহজে ভেঙে ফেলতে পারে না। জিকিরের মাধ্যমেই অর্জিত হয় জীবনের চরম সংকট মোকাবেলার আসল মানসিক শক্তি।
ভোরের আকাশ/জেআ