কোরআন-হাদিসে মা-বাবার অধিকারের গুরুত্ব

পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় উসিলা হলেন পিতা-মাতা বা মা-বাবা। সন্তানের জন্য তাঁদের ত্যাগ, ভালোবাসা এবং শ্রমের কোনো তুলনা হয় না। নিঃস্বার্থভাবে সন্তানকে লালন-পালন করে বড় করে তোলার পেছনে মা-বাবার যে অবদান, তা কোনো কিছুর বিনিময়েই শোধ করা সম্ভব নয়। এ কারণেই ইসলামসহ প্রতিটি ধর্মে এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে মা-বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে পবিত্র কোরআন এবং হাদিস শরিফে আল্লাহর ইবাদতের পর পরই মা-বাবার প্রতি সদয় আচরণ করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইহকালে শান্তি এবং আখেরাতে জান্নাত লাভ করতে হলে মা-বাবার প্রতি সন্তানের প্রধান কর্তব্যগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. সদাচরণ এবং সম্মান প্রদর্শন করা
মা-বাবার সাথে সবসময় নরম ও মার্জিত ভাষায় কথা বলা সন্তানের প্রধান দায়িত্ব। তাঁদের কোনো কথা বা আচরণে বিরক্ত হয়ে উফ শব্দটুকুও করা যাবে না।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: “তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। তাঁদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাঁদের ‘উফ’ বলো না এবং তাঁদের ধমক দিও না; বরং তাঁদের সাথে সম্মানসূচক নম্র কথা বলো।” (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৩)
২. বার্ধক্যে ভরণপোষণ ও সেবাযত্ন করা
শৈশবে মা-বাবা যেভাবে সন্তানকে আগলে রাখেন, বার্ধক্যে তাঁদেরও ঠিক তেমনি যত্নের প্রয়োজন হয়। এই সময়ে তাঁদের চিকিৎসাসেবা, পুষ্টিকর খাবার, আরামদায়ক বাসস্থান এবং পোশাকের দায়িত্ব নেওয়া সন্তানের ওপর ফরজ বা আবশ্যিক কর্তব্য।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তির উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “তুমি এবং তোমার সম্পদ—সবই তোমার পিতার।” (সুনানে ইবনে মাজাহ)। অর্থাৎ মা-বাবার প্রয়োজনে সন্তানের নিজের সম্পদ অকাতরে বিলিয়ে দেওয়া উচিত।
৩. তাঁদের আদেশ ও পরামর্শ মেনে চলা
যদি মা-বাবা এমন কোনো নির্দেশ না দেন যা ইসলামের মৌলিক বিধানের পরিপন্থী (যেমন- শিরক বা পাপ কাজ), তবে তাঁদের প্রতিটি আদেশ ও নিষেধ মেনে চলা সন্তানের জন্য বাধ্যতামূলক। যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁদের পরামর্শ নেওয়া এবং তাঁদের মতামতকে শ্রদ্ধা জানানো উচিত।
৪. মা-বাবার সন্তুষ্টির মাধ্যমে জান্নাত অন্বেষণ
সন্তানের প্রতি মা-বাবার দোয়া যেমন দ্রুত কবুল হয়, ঠিক তেমনি তাঁদের অসন্তুষ্টি মানুষের ধ্বংসের কারণ হতে পারে।
মহানবী (সা.) বলেছেন: “পিতার সন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহর সন্তুষ্টি নিহিত, আর পিতার অসন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহর অসন্তুষ্টি নিহিত।” (জামে তিরমিজি)
অন্য একটি বিখ্যাত হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক, সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক, সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক! সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! কে সে? তিনি বললেন—যে ব্যক্তি তার মা-বাবা উভয়কে অথবা যেকোনো একজনকে বার্ধক্যে পেল, অথচ তাঁদের সেবা করে জান্নাত লাভ করতে পারল না।” (সহীহ মুসলিম)
৫. মা-বাবার জন্য দোয়া করা (জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর)
মা-বাবার জন্য নিয়মিত আল্লাহর দরবারে ক্ষমা ও রহমতের দোয়া করা সন্তানের অন্যতম বড় দায়িত্ব। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সন্তানদের এই দোয়াটি শিখিয়েছেন:
রব্বির হামহুমা কামা রব্বায়ানি সগিরা
অর্থ: “হে আমার প্রতিপালক! তাঁদের উভয়ের প্রতি রহম করো, যেভাবে তাঁরা আমাকে শৈশবে দয়া ও স্নেহে লালন-পালন করেছিলেন।” (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৪)
মা-বাবার মৃত্যুর পর সন্তানের করণীয়:
মা-বাবার মৃত্যুর পরও তাঁদের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। মৃত্যুর পর তাঁদের আত্মার শান্তির জন্য নিচের কাজগুলো করা অত্যন্ত জরুরি:
- ক্ষমা প্রার্থনা ও ইস্তিগফার: মা-বাবার গুনাহ মাফের জন্য নিয়মিত আল্লাহর কাছে চোখের পানি ফেলে দোয়া করা। সন্তান দোয়া করলে কবরের আজাব মাফ হয় এবং জান্নাতে তাঁদের মর্যদা বৃদ্ধি পায়।
- সদকায়ে জারিয়া: মা-বাবার নামে দান-সদকা করা, এতিমখানায় সাহায্য করা, মসজিদ নির্মাণ বা নলকূপ স্থাপন করে দেওয়া, যেন এর সওয়াব তাঁরা কবরে বসে অনবরত পেতে থাকেন।
- ঋণ পরিশোধ ও অসিয়ত পূরণ: মা-বাবার কোনো দেনা বা ঋণ থাকলে তা সবার আগে পরিশোধ করা এবং তাঁদের কোনো বৈধ অসিয়ত বা শেষ ইচ্ছা থাকলে তা পূরণ করা।
- আত্মীয় ও বন্ধুদের সাথে সুসম্পর্ক: মা-বাবার ভাই-বোন (মামা, খালা, চাচা, ফুফু) এবং তাঁদের জীবিত বন্ধুদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা ও তাঁদের সম্মান করা। হাদিসে একে মা-বাবার প্রতি অন্যতম সেরা সদ্ব্যবহার বলা হয়েছে।
মা-বাবা হলেন ঘরের বরকত ও জান্নাতের দরজা। আজকের ব্যস্ত যান্ত্রিক জীবনে আমরা যেন ক্যারিয়ার বা নিজেদের পরিবারের পেছনে ছুটতে গিয়ে মা-বাবাকে অবহেলা না করি। আমরা আজ মা-বাবার সাথে যেমন আচরণ করব, ভবিষ্যতে আমাদের সন্তানরাও আমাদের সাথে ঠিক তেমন আচরণই করবে—প্রকৃতির এই নিয়ম মনে রাখা জরুরি। তাই আসুন, মা-বাবা জীবিত থাকতেই তাঁদের মুখে হাসি ফোটাই এবং তাঁদের দোয়া নিয়ে দুনিয়া ও আখেরাতের জীবনকে সফল করি।
ভোরের আকাশ/জেআ