জীবনে ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসার গুরুত্ব

মানবজীবনে ‘যদি’ শব্দটির প্রভাব অনেক গভীর। “যদি আমি সেদিন ওই কাজটি না করতাম”, “যদি আমি অন্য সিদ্ধান্ত নিতাম”, “যদি একটু বেশি চেষ্টা করতাম”—এমন হাজারো ‘যদি’ আর ‘হায়’ আমাদের বর্তমানকে বিষাক্ত করে তোলে। পেছনের ফেলে আসা দিনগুলোর ভুলভ্রান্তি, ক্ষতি বা ব্যর্থতা নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা ও আফসোস করা মানুষের মানসিক শান্তি কেড়ে নেয় এবং অবচেতনভাবেই তাকে হতাশার দিকে ঠেলে দেয়।
ইসলাম আমাদের শেখায়, যা ঘটে গেছে তা পরিবর্তনের কোনো সাধ্য মানুষের নেই। অতীত নিয়ে পড়ে থেকে আফসোস করা কেবল শয়তানের কুপ্ররোচনাকে প্রশ্রয় দেওয়া। একজন মুমিনের প্রকৃত গুণ হলো—সে অতীত থেকে শিক্ষা নেবে, বর্তমানকে কাজে লাগাবে এবং ভবিষ্যতের জন্য সম্পূর্ণভাবে মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রাখবে।
পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে কীভাবে অতীতকে ভুলে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা রাখবেন, তা নিচে আলোচনা করা হলো:
১. ‘যদি’ বা আফসোস শয়তানের কাজের রাস্তা খোলে
অতীতের কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নিয়ে বারবার আক্ষেপ করা আল্লাহর ফয়সালার প্রতি এক ধরণের অসন্তুষ্টির বহিঃপ্রকাশ। রাসুলুল্লাহ ﷺ এই ধরণের আফসোস করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“তোমার জন্য যা উপকারী, তা অর্জনে সচেষ্ট হও এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করো, অলসতা করো না। আর যদি তোমার কোনো ক্ষতি বা বিপদ হয়, তবে এমনটি বলো না যে—‘যদি আমি এমন করতাম, তবে এমন এমন হতো’। বরং বলো—‘আল্লাহ তাআলা এটি নির্ধারণ করে রেখেছিলেন এবং তিনি যা চেয়েছেন তা-ই করেছেন’। কারণ ‘যদি’ (লাও) শব্দটির ব্যবহার শয়তানের কাজের রাস্তা খুলে দেয়।” (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং- ২৬৬৪)
২. তাকদির বা ভাগ্যের ওপর বিশ্বাস
ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিশ্বাস হলো তাকদিরের ওপর বিশ্বাস রাখা। যা আমাদের জীবনে ঘটেছে, তা আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনারই অংশ। হয়তো সাময়িকভাবে কোনো ক্ষতি আমাদের কাছে বড় মনে হয়, কিন্তু তার পেছনে আল্লাহর কোনো না কোনো কল্যাণ লুকিয়ে থাকে, যা আমরা তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারি না।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
“পৃথিবীতে অথবা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের ওপর যে বিপর্যয়ই আসুক না কেন, তা সংঘটিত করার পূর্বেই একটি কিতাবে (লওহে মাহফুযে) লিপিবদ্ধ রয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহর পক্ষে এটি খুবই সহজ। এটা এজন্য যে, তোমরা যা হারিয়েছ বা যা তোমাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে, তার জন্য যেন তোমরা আফসোস না করো...” (সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ২২-২৩)
৩. তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর ভরসার জাদুকরী শক্তি
যখন একজন বান্দা তার সমস্ত বিষয় আল্লাহর ওপর সঁপে দেয়, তখন তার অন্তরে এক অলৌকিক প্রশান্তি নেমে আসে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর ওপর ভরসাকারীদের ভালোবাসেন এবং তাদের জন্য তিনিই যথেষ্ট হয়ে যান।
মহান আল্লাহ বলেন:
“আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।” (সূরা আত-তালাক, আয়াত: ৩)
তিনি অন্য আয়াতে মুমিনদের সান্ত্বনা দিয়ে বলেছেন:
“তোমরা হতাশ হয়ো না এবং দুঃখ করো না; তোমরাই বিজয়ী হবে যদি তোমরা মুমিন হও।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৯)
অতীতকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ৩টি বাস্তবমুখী উপায়:
- তওবা ও ইস্তিগফার: অতীত যদি কোনো পাপ বা ভুলের কারণে কষ্ট দেয়, তবে আজই আল্লাহর দরবারে খাঁটি মনে তওবা করে নিন। আল্লাহ গাফুরুর রাহিম, তিনি অতীতের সমস্ত গুনাহ মাফ করে বান্দার জীবন সতেজ করে দেন।
- বর্তমানকে মূল্যায়ন করা: যা হারিয়ে গেছে তা তো গেছেই, কিন্তু আজ আপনার হাতে যে ‘বর্তমান’ সময়টুকু আছে, তা আল্লাহর অনেক বড় নেয়ামত। এটিকে ইবাদত, নেক আমল এবং দুনিয়াবী ভালো কাজের মাধ্যমে সফল করে তুলুন।
- ইতিবাচক প্রার্থনা: ভবিষ্যতের যেকোনো কল্যাণ ও সফলতার জন্য আল্লাহর কাছে এভাবে দোয়া করুন—“হে আল্লাহ! আমার অতীতের ভুলগুলো ক্ষমা করুন এবং আমার ভবিষ্যৎকে বর্তমানের চেয়েও সুন্দর ও বরকতময় করে দিন।”
অতীত হলো একটি মৃত খাতার মতো, যার পাতা উল্টে লাভ নেই। আপনার জীবনের প্রতিটি কদম আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে। তাই পেছনের সমস্ত ব্যর্থতার গ্লানি ও আফসোসকে ঝেড়ে ফেলে বুক ভরে শ্বাস নিন। আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও ভরসা রেখে নতুন উদ্যমে পথ চলা শুরু করুন। মনে রাখবেন, আল্লাহ আপনার জন্য যা নির্ধারণ করে রেখেছেন, তা-ই আপনার জন্য সর্বোত্তম।
ভোরের আকাশ/জেআ