কোরবানির চামড়া সংরক্ষণে ভিডিপি'র ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণে স্বেচ্ছাসেবী ভিডিপি সদস্যরা, জাতীয় সম্পদ রক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। পবিত্র ঈদুল আজহা দেশের চামড়া শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। প্রতি বছর দেশের মোট চামড়ার প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ এ সময় সংগ্রহ করা হয়। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত হিসেবে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এ খাত থেকে বছরে প্রায় ১.৫ থেকে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়।
কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রির অর্থের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এতিমখানা, মাদ্রাসা, লিল্লাহ বোর্ডিং ও অসহায় মানুষের অধিকার। কিন্তু সঠিক সংগ্রহ ও সংরক্ষণের অভাবে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ চামড়ার গুণগত মান নষ্ট হয়। এতে একদিকে জাতীয় সম্পদের অপচয় ঘটে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের অর্থনীতি। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী প্রথমবারের মতো একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
“আমাদের হাত কোটি হাতিয়ার, অঙ্গীকার মোদের দেশ গড়ার”—এই প্রত্যয়কে সামনে রেখে বাহিনীর স্বেচ্ছাসেবী ভিডিপি সদস্যরা মাঠপর্যায়ে চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।
প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রস্তুত স্বেচ্ছাসেবীরা
চামড়ার গুণগত মান রক্ষা ও সঠিক সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে খুলনা, রংপুর, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী রেঞ্জের ২৯ জেলায় মোট ৪ হাজার ১৫৩ জন ভিডিপি সদস্যকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। জেলা ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় পরিচালিত এই প্রশিক্ষণে চামড়া ছাড়ানোর সঠিক পদ্ধতি, পরিষ্কারকরণ, নির্ধারিত মাত্রায় লবণ প্রয়োগ, সংরক্ষণ, দ্রুত প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ বিষয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্যরা পরে মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করেন।
মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা
ঈদের দিন থেকেই স্বেচ্ছাসেবী ভিডিপি সদস্যরা কোরবানির স্থানে উপস্থিত থেকে সার্বিক কার্যক্রমে সহায়তা করেন। তারা সাধারণ মানুষকে সঠিকভাবে চামড়া ছাড়ানোর বিষয়ে পরামর্শ দেন, যাতে চামড়ায় আঁচড়, ছিদ্র বা ক্ষতি না হয়। চামড়া ছাড়ানোর পর তা সরাসরি রোদে না রেখে ছায়াযুক্ত স্থানে সংরক্ষণ, মাংস ও চর্বি পরিষ্কার এবং দ্রুত লবণ প্রয়োগের বিষয়েও তারা সচেতনতা তৈরি করেন।
সঠিক মাত্রায় লবণ প্রয়োগে গুরুত্ব
চামড়া সংরক্ষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি হলো সঠিক মাত্রায় লবণ প্রয়োগ। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ভিডিপি সদস্যরা একটি মাঝারি বা বড় গরুর চামড়ায় ৮ থেকে ১০ কেজি এবং ছাগল বা ভেড়ার চামড়ায় ২ থেকে ২.৫ কেজি লবণ ব্যবহারের পরামর্শ দেন। এছাড়া এতিমখানা ও স্থানীয় স্টোরেজ পয়েন্টে চামড়া সংরক্ষণেও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, যা পরবর্তীতে ট্যানারিতে পাঠানোর সময় চামড়ার গুণগত মান বজায় রাখতে সহায়তা করবে।
পরিবহন ব্যবস্থাপনাতেও সহায়তা
চামড়া সংগ্রহের পর দ্রুত নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে দেওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ঈদের সময় পরিবহন সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এ সময় ভিডিপি সদস্যরা স্থানীয়ভাবে পরিবহন সমন্বয়, নিরাপদে চামড়া বহন এবং দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে দিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। একইসঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও তারা কাজ করেন।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
চারটি রেঞ্জের ২৯ জেলায় প্রশিক্ষিত ৪ হাজার ১৫৩ জন ভিডিপি সদস্যের এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। অল্প সময়ের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে কোরবানির চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণে তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
দেশব্যাপী প্রায় ৬০ লাখ স্বেচ্ছাসেবী ভিডিপি সদস্যের এই বিশাল নেটওয়ার্ককে কাজে লাগানো গেলে শুধু চামড়া শিল্প নয়, জাতীয় অর্থনীতির বিভিন্ন খাতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও জাতীয় সম্পদ সংরক্ষণে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে আসছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পর্যায়ক্রমে সারাদেশে প্রশিক্ষিত ভিডিপি সদস্যদের সম্পৃক্ত করা গেলে দেশের চামড়া শিল্প আরও শক্তিশালী ভিত্তি পাবে।
ভোরের আকাশ/এম