শিরোনাম
বিদেশি সহায়তা নয়, বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠনের উদ্যোগবাংলাদেশে হামের প্রকোপ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও পোলিও প্রাদুর্ভাবের ‘সতর্কতা’শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও কমেছে শিক্ষার্থীবিদেশি ঋণ কমেছে ৪২.৩৪%, ছয় উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিশ্রুতি নেইকক্সবাজারে আগুন: ডিএনএ পরীক্ষায় নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত, এখনো নিখোঁজ ১অনলাইন টিকিটের কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ কঠিন: রেলমন্ত্রীনিপ্পন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের নৈশভোজে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রীবিদেশি সহায়তা নয়, বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠনের উদ্যোগবাংলাদেশে হামের প্রকোপ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও পোলিও প্রাদুর্ভাবের ‘সতর্কতা’শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও কমেছে শিক্ষার্থীবিদেশি ঋণ কমেছে ৪২.৩৪%, ছয় উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিশ্রুতি নেইকক্সবাজারে আগুন: ডিএনএ পরীক্ষায় নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত, এখনো নিখোঁজ ১অনলাইন টিকিটের কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ কঠিন: রেলমন্ত্রীনিপ্পন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের নৈশভোজে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রী

জীবনযাত্রায় নতুন চাপ

মাজাহারুল ইসলাম

প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০৫ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

জ্বালানি তেলের পর এবার বাড়ল তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম। এখন ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে লাগবে ১ হাজর ৯৪০ টাকা। গতকাল রোববার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। নতুন এই দাম কার্যকর হয়েছে গতকাল রোববার থেকেই। এর আগে শনিবার রাতে সব জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়ানো হয়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর গতকাল পরিবহন ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে বাস ও লঞ্চ মালিক সমিতি। এছাড়া বিদ্যুতের দামও বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। ফলে ভোক্তার ঘাড়ে পড়বে বাড়তি খরচের বোঝা। এ নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন অনেকে। আবার বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী জ্বালানি তেলের দাম  বাড়ানোর সমালোচনা করেছে।

সূত্রে মতে, গত ১৮ দিনে দুই দফায় ভোক্তা পর্যায়ে এলপি গ্যাসের (এলপিজি) দাম বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ ১৮ দিনে ১২ কেজিতে বাড়লো ৫৯৯ টাকা। এখন ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে লাগবে ১ হাজার ৯৪০ টাকা। এর আগে গত ২ এপ্রিল ৩৮৭ টাকা বাড়িয়ে ১৭২৭ টাকা করেছিল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি); যা আগে ছিল ১,৩৪০ টাকা।

মূল্য বৃদ্ধির আদেশে বলা হয়েছে, জাহাজ ভাড়া ও ট্রেডার প্রিমিয়াম প্রতি টনে ১২০ ডলার বিবেচনায় ১৭২৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ইরান যুদ্ধের কারণে জাহাজ ভাড়া ও প্রিমিয়াম খরচ বেড়ে গেছে। এলপিজি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে জাহাজ ভাড়া ও ট্রেডার প্রিমিয়াম প্রতি টনে ২৫০ ডলার বিবেচনায় নতুন দর ঘোষণা করা হলো। অন্যদিকে যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাস লিটার প্রতি ৭৯.৭৭ টাকা থেকে ৮৯.৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এদিকে দাম বেড়েছে অটোগ্যাসেরও। এখন প্রতি লিটার অটোগ্যাসের দাম ৮৯ টাকা ৫০ পয়সা, যা মাসের শুরুতে ছিল ৭৯ টাকা ৭৭ পয়সা। বিইআরসি বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালি এলাকায় জাহাজ চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। এতে এলপিজি আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া অন্য পথ দিয়ে গ্যাস আনতে সময় বেশি লাগছে এবং খরচও বাড়ছে। যুদ্ধের কারণে বিমা ও নিরাপত্তা খরচও বেড়েছে। এসব কারণে এলপিজির দাম বাড়াতে হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, রান্নার গ্যাস কোনো বিলাসী পণ্য নয়, এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের অংশ। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয় যখন আকাশচুম্বী, তখন এলপিজির এই দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি জনগণের মধ্যে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি করছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের উচিত সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে এলপিজির দাম রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা-এমনটাই বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানকে আরও সংকুচিত করে তুলবে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা-সরকার জনস্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে গ্যাসের দাম পুনর্নিধারণ বা ভর্তুকির ব্যবস্থা করবে। বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে ভোক্তা পর্যায়ে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। ঘোষিত নতুন দরে ডিজেল লিটারে ১৫ টাকা, জ্বালানি তেল কেরোসিন ১৮ টাকা, অকটেন ২০ টাকা এবং পেট্রল ১৯ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহাম্মদ আরিফ সাদেক স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রতি লিটার জ্বালানি তেলের নতুন দাম- অকটেন প্রতি লিটার ১৪০ টাকা, পেট্রল প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা, কেরোসিন প্রতি লিটার ১৩০ টাকা এবং ডিজেল প্রতি লিটার ১১৫ টাকা।

প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যে : সব ধরনের জ্বালানি তেল ও  তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বৃদ্ধির প্রসঙ্গে নাসির উদ্দিন নামে রাজধানীর লালবাগের এক বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয় দৈনিক ভোরের আকাশের এই প্রতিবেদকের। এসময় নাসির উদ্দিন বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যার প্রভাব পড়বে সরাসরি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ওপর। এতে খাদ্যপণ্যসহ সব ধরনের দ্রব্যের দাম বেড়ে যাবে। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের খেটে খাওয়া মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাদের আয় না বাড়লেও ব্যয় বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। ফলে স্বাভাবিক জীবনযাপন ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়বে।

জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির কারণে শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে প্রতিফলিত হবে এবং মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। একইসঙ্গে কৃষি খাতেও এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। সেচ, পরিবহণ ও কৃষি উপকরণের খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। এ অবস্থায় এলপিজি গ্যসের জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে দেশের সাধারণ জনগণ চরম ভোগান্তিতে পড়বে বলে মনে করছেন তিনি।

রাজধানীর সূত্রাপুর এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী আসমা বেগম বলেন, বাজারে চাল, ডাল, তেল-সবকিছুর দামই তো বেশি। এখন যদি রান্নার গ্যাসের দামও এভাবে বাড়তে থাকে, তবে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের টিকে থাকাই দায় হয়ে পড়বে। মাসে একটা সিলিন্ডারে আমাদের চলে না, অথচ আয় বাড়ছে না।

বাড়তে পারে বিদ্যুতের দাম : ইরান যুদ্ধের প্রভাবে উদ্ভূত জ্বালানি সংকটে ভর্তুকির বোঝা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে- এমন কারণ দেখিয়ে সরকার পাইকারি ও খুচরা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে সূত্রে জানা গেছে। এপ্রিলের শুরুতে বিদ্যুৎ বিভাগের পেশ করা একটি প্রস্তাব এখন মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে, যেখানে পাইকারি বিদ্যুতের দাম বর্তমানের প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ৪ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একাধিক কর্মকর্তা জানান, এপ্রিলের শুরুতে বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় পাঠানো হয়। তবে মন্ত্রিসভা কিছু বিষয়ে আরও স্পষ্টীকরণের জন্য সেটি ফেরত পাঠায় এবং কর্মকর্তারা বর্তমানে তা নিয়ে কাজ করছেন। পহেলা বৈশাখের আগে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয় বিদ্যুতের ট্যারিফ সংক্রান্ত প্রস্তাবটি চূড়ান্ত করার জন্য।

প্রস্তাবিত রূপরেখা অনুযায়ী, পাইকারি দাম প্রতি ইউনিটে ৫০ পয়সা বাড়ালে ভর্তুকি কমবে পাঁচ হাজার কোটি টাকা; এক টাকা বাড়ালে কমবে ১০ হাজার কোটি টাকা এবং ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়ালে ভর্তুকি কমবে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যারা ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, সেই গ্রাহকদের জন্য খুচরা দাম অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এর চেয়ে বেশি ব্যবহারকারী গ্রাহকদের জন্য ইউনিটপ্রতি ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, এটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত ও সুপারিশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আইএমএফ অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে প্রান্তিক গ্রাহকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে ভর্তুকির বোঝা কমানোর ওপর চাপ দিয়ে আসছে।

প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হলে, গণশুনানি শেষে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য তা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে পেশ করা হবে। প্রস্তাবে শ্রীলঙ্কা ও সিঙ্গাপুরের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর বর্তমান পরিস্থিতির উদাহরণও টানা হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন খাতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে।

পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির আশঙ্কা : জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরপরই বাস-ট্রাক মালিক সমিতির নেতারা সব ধরনের পরিবহন ভাড়া সমন্বয় করতে সরকারকে অনুরোধ করেছেন। বাংলাদেশে ২০২২ সালের ৫ আগস্ট ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ৮০ টাকা থেকে ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ১১৪ টাকা নির্ধারণ করে সরকার, যা আগের দামের তুলনায় প্রায় ৪২.৫ শতাংশ বেশি ছিল। পরে সেটি সমন্বয় করতে করতে সর্বশেষ শনিবার পর্যন্ত লিটার প্রতি ১০০ টাকা ছিল। ওই সময় সার্বিক বিবেচনায় তৎকালীন পরিবহন নেতারা দূরপাল্লার বাসে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া বাড়িয়ে ২ টাকা ৮০ টাকা পয়সা করার প্রস্তাব দেন। তবে সরকার সেটি আমলে না নিয়ে দূরপাল্লার ভাড়া ১ টাকা ৮০ পয়সা থেকে ২২ শতাংশ বাড়িয়ে ২ টাকা ২০ পয়সা করে।

সর্বশেষ ২০২৫ সালের ১৬ জুন তেলের দামের সঙ্গে ভাড়া সমন্বয় করে সেটি কমিয়ে কিলোমিটার প্রতি ২ টাকা ১২ পয়সা করা হয়। বাস ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু জ্বালানি তেলের দামই একমাত্র বিষয় নয়। গাড়ির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও অনেক খরচ রয়েছে, যা সময়ের সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একটি গাড়ির নিজস্ব মূল্য, তার লাইফটাইম এক্সপেন্স, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, চাকা, ইঞ্জিন ওয়েল এবং বিভিন্ন স্পেয়ার পার্টস  সবমিলিয়ে প্রতি মাসেই বড় অঙ্কের কিন্তু শনিবার রাতে ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ বাড়ার পর পরিবহন নেতারা রোববারের মধ্যেই ভাড়া বাড়াতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। তারা সরকারকে শুধু ডিজেলের দাম বিবেচনায় না নিয়ে সার্বিক বিষয় চিন্তা করে দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটার প্রতি ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪ টাকা ৫ পয়সা করার প্রস্তাব দিচ্ছেন।

ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বাস মালিক বলেন, বাস ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু জ্বালানি তেলের দামই একমাত্র বিষয় নয়। গাড়ির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও অনেক খরচ রয়েছে, যা সময়ের সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একটি গাড়ির নিজস্ব মূল্য, তার লাইফটাইম এক্সপেন্স, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, চাকা, ইঞ্জিন ওয়েল এবং বিভিন্ন স্পেয়ার পার্টস-সব মিলিয়ে প্রতি মাসেই বড় অঙ্কের ব্যয় বহন করতে হয় মালিকদের। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, দেশে শুধুমাত্র তেলের দাম বাড়লেই ভাড়া বাড়ানোর বিষয়টি সামনে আসে, অন্য খরচগুলোর বৃদ্ধির সঙ্গে ভাড়ার সমন্বয় সাধারণত করা হয় না।

উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ২০২২ সালে যে চাকার জোড়া ৫০ হাজার টাকায় কেনা যেত, ২০২৬ সালে সেটির দাম বেড়ে ৭৪ থেকে ৮০ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। একইভাবে বিভিন্ন স্পেয়ার পার্টসের দামও দ্বিগুণ বা তার বেশি হয়েছে। যেমন ১০ টাকার কোনো যন্ত্রাংশ এখন ২০-২৩ টাকায় কিনতে হচ্ছে। আবার যেসব যন্ত্রাংশ আগে ১২০০ টাকায় পাওয়া যেত, সেগুলোর দাম বেড়ে ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকায় পৌঁছেছে। ফলে সার্বিকভাবে গাড়ি পরিচালনার খরচ অনেক বেড়ে গেছে। আশা করছিলাম যে সরকার তেলের দাম যদি বৃদ্ধি করে, তবে সেই সঙ্গে গেজেটে উল্লেখ করে দেবে যে তেলের কারণে এত পয়সা করে প্রতি কিলোমিটার ইনক্লুড হবে। কিন্তু সেটি হয়নি। এভাবে তো মালিকরা লস দিয়ে বাস চালাবে না

গাড়ির মূল্যের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন এসেছে জানিয়ে এই বাস মালিক বলেন, ২০২২ সালে একটি বাসের চেসিসের দাম ছিল প্রায় ২৪ লাখ টাকা এবং বডি তৈরি করতে খরচ হতো প্রায় ১১ লাখ টাকা। বর্তমানে সেই একই চেসিসের দাম বেড়ে প্রায় ৩৬ লাখ টাকা এবং বডি তৈরির খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ লাখ টাকায়। অর্থাৎ শুধু এই দুই খাতেই মোট খরচ বেড়েছে প্রায় ২০-২১ লাখ টাকা। এর সঙ্গে ব্যাংক ঋণের সুদের হারও ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৩ শতাংশে পৌঁছেছে, ফলে কিস্তির চাপ আরও বেড়েছে মালিকদের ওপর।

কত টাকা ভাড়া বাড়ানো যায়-এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ২০২২ সালে জ্বালানির দাম বাড়ার পর সরকার ভাড়া সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছিল। তখন প্রথমে প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ২০ পয়সা নির্ধারণ করা হলেও পরে তা সমন্বয় করে ২ টাকা ১২ পয়সায় স্থির করা হয়। সেই সময় মালিক সমিতির পক্ষ থেকে ২ টাকা ৮০ পয়সা প্রস্তাব করা হলেও তা গৃহীত হয়নি। এরপর দীর্ঘ সময় ভাড়ার আর কোনো সমন্বয় হয়নি, যদিও খরচ ধারাবাহিকভাবে বেড়েই গেছে। এবার অন্তত কিলোমিটার প্রতি সাড়ে ৩ টাকা না হলে আর গাড়ি চালানো যাবে না।

তবে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছেন, আমরা দায়িত্বে আসার পর ও ডলারের দাম বাড়ার পর ৩ টাকা ৭৫ পয়সার প্রস্তাব কমিটির কাছে দিয়ে রেখেছি। সেটি তেলের জন্য দেওয়া হয়নি, স্পেয়ার্স পার্সে ডলার মূল্য সমন্বয়ের জন্য দেওয়া হয়েছে। সেটিসহ তেলের দাম বাড়ার জন্য আমরা ৪ টাকা ৫ পয়সা এবার প্রস্তাব করবো। আমরা মিনিস্ট্রিতে আজকে যোগাযোগ করে ফরমাল মিটিং হোক, ইনফরমাল মিটিং হোক করবো। কারণ আমাদের আজকে এখনো পর্যন্ত বাস ভাড়া বাড়ানোর কোনো নির্দেশনা দেইনি।

সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম বলেন, আশা করছিলাম যে সরকার তেলের দাম যদি বৃদ্ধি করে, তবে সেই সঙ্গে গেজেটে উল্লেখ করে দেবে যে তেলের কারণে এত পয়সা করে প্রতি কিলোমিটার ইনক্লুড হবে। কিন্তু সেটি হয়নি। মালিকরা বেশি দামে তেল কিনছে কিন্তু ভাড়া নিচ্ছে আগের রেটে। এভাবে তো মালিকরা লস দিয়ে বাস চালাবে না। আমরা অলরেডি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি যে, এটা নিরসন করে দিতে। জীবন মানেই তো আর শুধু ট্রান্সপোর্ট না, আমাদের আরও অনেক খাত রয়েছে।

বিআরটিএ যেহেতু তাদের কমিটি আছে, মালিকদের দাবি যদি যৌক্তিক হয় তাহলে তারা অবশ্যই সেই যৌক্তিকতা বিবেচনায় নিয়ে কাজ করবে। কিন্তু একইসঙ্গে যাত্রীদের সেবার দিকটাও তাদের মাথায় রাখতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সরকার প্রতি বছর বাজেটের আগে একটা ক্যালকুলেশন করে, কস্টিং বডি দেখে বর্তমানে পরিস্থিতি অনুযায়ী জানিয়ে দিতে পারে যে এই বছরের জন্য এই ভাড়া নির্ধারণ করা হলো। এই হিসাবটা যদি ঠিকভাবে করা হয়, তাহলে সেটাই পুরো বছর চলতে পারে। এর মাঝে যদি কোনো বড় পরিবর্তন হয়, যেমন ডলারের দাম হঠাৎ বাড়ে বা কমে, তখন সেগুলোর প্রভাব নিয়ে আলাদা করে আলোচনা করা যেতে পারে। না হলে সাধারণভাবে ওই নির্ধারিত ভাড়াই কার্যকর থাকতে পারে। আমরা এই প্রস্তাবটাই দিয়েছিলাম স্থায়ী সমাধানের জন্য, কিন্তু সেটা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে না।

বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান বলেন, তারা প্রস্তাব করেছে ঠিক আছে। প্রস্তাব করা মানেই এটা চূড়ান্ত না। বিআরটিএর ভাড়া নির্ধারণের কমিটি আছে। আমি বলবো, এই কমিটিতে প্রস্তাবের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা উচিত। প্রতিটি খাত ধরে ধরে বিশ্লেষণ করতে হবে।

তিনি বলেন, একইসঙ্গে মনে রাখতে হবে, তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় যাত্রীদেরও অনেকগুলো খাতে চাপের মধ্যে পড়তে হবে। জীবন মানেই তো আর শুধু ট্রান্সপোর্ট না, আমাদের আরও অনেক খাত রয়েছে।

বিআরটিএ যেহেতু তাদের কমিটি আছে, মালিকদের দাবি যদি যৌক্তিক হয় তাহলে তারা অবশ্যই সেই যৌক্তিকতা বিবেচনায় নিয়ে কাজ করবে। কিন্তু একইসঙ্গে যাত্রীদের সেবার দিকটাও তাদের মাথায় রাখতে হবে। আমি বললাম, প্রস্তাবটা চুলচেরা বিশ্লেষণ করা উচিত। আলোচনা করে সেখানে যাত্রীদের ওপর অতিরিক্ত ভাড়া কতটা চাপ সৃষ্টি করবে, সেই বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে। আর যেসব খাতের সঙ্গে তেলের দাম বাড়ার কোনো সম্পর্ক নেই, সেসব ক্ষেত্রে তো আসলে বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।

এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) চেয়ারম্যানের নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবসমূহ : পরিবহন খরচ বৃদ্ধি : ডিজেলের দাম বাড়লে বাস, ট্রাক ও পণ্যবাহী যানবাহনের ভাড়া বেড়ে যায়।

নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি : পণ্য পরিবহন খরচ বাড়ার কারণে চাল, ডাল, তেল, সবজিসহ সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়ে যায়।

কৃষি উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি : সেচ পাম্প এবং কৃষি যন্ত্রপাতি (ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার) জ্বালানি তেলে চলে, তাই তেলের দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। শিল্প

উৎপাদন ব্যয় : কলকারখানায় উৎপাদন খরচ বাড়ায় সামগ্রিক পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়।

মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের ওপর চাপ: আয় না বাড়লেও ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ে, যা অনেকটা ‘মড়ার ওপর খাঁরার ঘা’ হিসেবে কাজ করে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে সরকার বাধ্য হয়েছে। তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে এবং অনেক দেশই দাম সমন্বয় করেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও দাম বাড়িয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বাংলাদেশ যে দামে তেল আমদানি করে মজুত করেছে, বর্তমান মূল্য সেই দামের চেয়েও কমে সমন্বয় করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, জ্বালানি তেল আমদানি করতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। এ কারণে অর্থনৈতিক চাপ বিবেচনায় রেখে সরকারকে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। আমরা চেষ্টা করেছি, যেন দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখা যায়। দাম বাড়ানোর পরও সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে বলেও জানান মন্ত্রী।

তবে, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, সারাদেশে আবারও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ঘোষিত নতুন এই মূল্যের কারণে চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে রান্নার গ্যাসের এই বাড়তি খরচ সাধারণ ও নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য যেন ‘মড়ার ওপর খাঁরার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভোরের আকাশ/এসএইচ

জ্বালানি তেল

শেয়ার করুন: