প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বস্ত্র-পাট মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত
অর্থনীতির গতি সঞ্চারে পুনঃচালু শিল্প-কারখানা

দেশের স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার এবং ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব দূর করতে এক মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্ধ হয়ে পড়ে থাকা শিল্প-কারখানাগুলো পুনরায় চালু করা। বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ নানা সীমাবদ্ধতার মুখে শিল্পখাতের এই পুনর্জাগরণকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রধান কৌশল হিসেবে দেখছে বর্তমান সরকার।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের বন্ধ কারখানাগুলোর বিষয়ে মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সরকার একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান জটিলতা দূর করা জরুরি। বন্ধ থাকা সরকারি কল-কারখানায় বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, অতীতে পরিকল্পিতভাবে দেশের শিল্প খাত দুর্বল করা হয়েছিল, যার ফলে অর্থনীতি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ে। বর্তমান সরকার সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উৎপাদন বাড়াতে কাজ করছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত চালু করা গেলে বেকার হয়ে পড়া শ্রমিকদের পুনরায় কাজে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। একইসঙ্গে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্র অনুযায়ী, সারা দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি খাতের শত শত কারখানা বছরের পর বছর বন্ধ হয়ে আছে।
এর মধ্যে অনেকগুলো কারখানার যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং বিশাল এলাকা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। বিএনপি সরকারের এই উদ্যোগের মাধ্যমে এসব কারখানাকে পুনরায় উৎপাদনমুখী করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কেবল সরকারি অর্থায়নে নয়, বরং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) এবং সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমেও এসব কারখানা সচল করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালু হলে লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এটি সরাসরি দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখবে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। সরকারের এই ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্জেন্স’ বা শিল্প পুনর্জাগরণ কৌশলটি মূলত আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছে। বিশেষ করে পাট, বস্ত্র এবং চামড়া শিল্পের মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, যা একসময় দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল।
ঋণ সহায়তা ও নীতিগত সংস্কার: কারখানাগুলো চালু করার ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে মূলধনের অভাব এবং ব্যাংক ঋণের জটিলতা। এই সংকট নিরসনে সরকার ব্যাংকগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে। রুগ্ন ও বন্ধ কারখানার মালিকদের জন্য স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ এবং প্রয়োজনে ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের সুবিধা দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। এছাড়া যেসব কারখানা অব্যবস্থাপনার কারণে বন্ধ হয়েছে, সেগুলোর মালিকানা পরিবর্তন বা দক্ষ ব্যবস্থাপনার অধীনে আনার জন্য আইনি কাঠামো সংস্কারের কাজও চলছে।
তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, কেবল কারখানা খুললেই হবে না, উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দুর্নীতিরোধ এই পরিকল্পনার সাফল্যের জন্য অপরিহার্য।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের এই শিল্প পুনরুদ্ধারের কৌশলটি সফল হলে তা দেশের অর্থনীতির চেহারা বদলে দিতে পারে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে এই উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়িত হবে এবং দেশের শিল্প খাতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ পরিবেশ পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক থাকায় ‘বন্ধ কারখানা চালু’ এখন শুধু অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নয়, বরং একটি কৌশলগত জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে- এমনটাই বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ বিশিষ্টজনরা। বন্ধ কল-কারখানা সচল করে কর্মসংস্থান বাড়াতে কম সুদে ঋণ সুবিধা দিতে একটি বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের চিন্তা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই তহবিল সরকারের অর্থায়নে হবে, নাকি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়নে- তা নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এ বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি কাজ করছে।
সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রথম ১৮ মাসে এককোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য পূরণে এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। শুধু তহবিল সহায়তা নয়, বন্ধ কারখানাগুলো কীভাবে দ্রুত উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা যায়, সেই লক্ষ্যে আরও নানা ধরনের নীতি সহায়তার বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর সিদ্ধান্তকে তারা ইতিবাচকভাবে দেখছেন এবং একে স্বাগত জানান। তার মতে, এসব কারখানা চালু থাকলে অর্থনীতিতে আরও গতি সঞ্চার হবে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং জিডিপিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তিনি আরও বলেন, বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করলে দ্বিমুখী সুবিধা পাওয়া সম্ভব। প্রথমত, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই উৎপাদনে ফেরা যায়। দ্বিতীয়ত, তুলনামূলক কম ব্যয়ে এসব কারখানা সচল করা সম্ভব। এর বিপরীতে নতুন কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে জায়গা নির্বাচন, উচ্চ ব্যয় এবং উৎপাদনে যেতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়।
মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, সরকার যদি কার্যকরভাবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে অর্থনীতিতে স্থবির হয়ে থাকা অর্থ পুনরায় গতিশীল হবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, গভর্নরের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালুর বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্রিয় ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে নীতিগত সহায়তা, প্রণোদনা প্রদান এবং ব্যাংকিং খাতে সমন্বয় জোরদারের নির্দেশনা দেন গভর্নর।
ভোরের আকাশ/নি