এক চরিত্রে ভয়, আরেক চরিত্রে হাসি—নানা পাটেকারের গল্প

নানা পাটেকারকে একটি বাক্যে বেঁধে ফেলা কঠিন। প্রচলিত অর্থে তাঁর চেহারা নায়কোচিত ছিল না। কণ্ঠেও ছিল আলাদা বৈশিষ্ট্য। অভিনয়ের ধরনেও অনুসরণ করতেন না কোনো চেনা ছক। অথচ পর্দায় দাঁড়ালেই তাঁকে আলাদা করে চিনে নেওয়া যেত। তীব্র উপস্থিতি, সংলাপ বলার নিজস্ব ধরন ও চোখের ভাষায় তিনি তৈরি করেছিলেন অভিনয়ের নিজস্ব এক জগৎ।
৭৫ বছর বয়সে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে গোয়ার নিজের বাসভবনে মারা গেছেন এই বর্ষীয়ান অভিনেতা। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভোরে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট সিপিআর দিয়েও তাঁকে বাঁচাতে পারেননি। পরে সকাল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
নানা পাটেকারের মৃত্যুর সঙ্গে তাই শুধু একজন অভিনেতার বিদায় জড়িয়ে নেই; শেষ হলো হিন্দি ও মারাঠি সিনেমায় প্রায় পাঁচ দশকের এক বৈচিত্র্যময় ক্যারিয়ার। ‘গমন’ দিয়ে ১৯৭৮ সালে অভিনয় শুরু করা নানা ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা।
১৯৮৯ সালের ‘পারিন্দা’ তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিদু বিনোদ চোপড়ার সেই ছবিতে আন্না শেঠ চরিত্রে নানা ছিলেন ভয়ংকর। তবে সেই ভয় তৈরি হয়েছিল চিৎকার বা অতিরিক্ত অভিনয়ে নয়; বরং শান্ত মুখ, স্থির দৃষ্টি ও আচমকা রাগে বিস্ফোরিত হয়ে ওঠার ক্ষমতায়। কখন যে শান্ত মানুষটি হিংস্র হয়ে উঠবেন, তা বোঝার উপায় ছিল না। এই অনিশ্চয়তাই চরিত্রটিকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছিল।
‘ক্রান্তিবীর’-এ দেখা গেল অন্য এক নানা পাটেকারকে। দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর তীব্র সংলাপ এবং আবেগঘন অভিনয় দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলে। এই ছবিতে অভিনয়ের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেতার সম্মান পান।
এরপর ‘অগ্নিসাক্ষী’। মণীষা কৈরালার বিপরীতে সেখানে তিনি বিশ্বনাথ—নির্যাতনকারী, সন্দেহপ্রবণ ও ভয়ংকর এক স্বামী। চরিত্রটি শুধু একজন খলনায়কের ছিল না; বরং দখলদার মানসিকতা, অধিকারবোধ ও মানসিক নির্যাতনের এক অস্বস্তিকর প্রতিচ্ছবি। নানা সেটিকে এমনভাবে পর্দায় তুলে ধরেছিলেন যে দর্শকের অস্বস্তি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক ছিল। এই অভিনয়ের জন্যও তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা সহ-অভিনেতার স্বীকৃতি পান।
তবে নানা পাটেকারকে শুধু রাগী বা ভয়ংকর চরিত্রের অভিনেতা বললে বড় ভুল হবে। ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’-এ তিনি জোসেফ ব্রাগাঞ্জা—শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী এক বাবা। মেয়ের স্বপ্নের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক অসহায় মানুষের চরিত্রে তাঁর অভিনয় ছিল অনেক বেশি শান্ত ও সংযত। সেখানে সংলাপের চেয়ে চোখের ভাষা, নীরবতা ও ভেতরে জমে থাকা কষ্টই হয়ে উঠেছিল প্রধান।
‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ ছবিতে অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালক হিসেবেও নিজের ছাপ রাখেন নানা। ‘আব তাক ছাপ্পান’-এ সাধু আগাশে হয়ে তিনি ছিলেন এক ঠাণ্ডা মাথার এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট। মুখে খুব বেশি আবেগ নেই, অথচ সেই নির্লিপ্ততার মধ্যেই ছিল এক ধরনের ভয়। ‘অপহরণ’-এও রাজনৈতিক ক্ষমতা ও নৈতিক দ্বন্দ্বের জটিল চরিত্রে নিজের অভিনয়ক্ষমতার আরেক দিক দেখিয়েছেন তিনি।
এরপর আসে ‘ওয়েলকাম’। এখানেই যেন নানা পাটেকারের ক্যারিয়ারে খুলে যায় আরেকটি দরজা। ‘পারিন্দা’র ভয়ংকর আন্না শেঠ কীভাবে ‘ওয়েলকাম’-এর উদয় শেঠ হয়ে দর্শককে হাসাতে পারেন, সেটিই ছিল বড় বিস্ময়।
অক্ষয় কুমার ও অনিল কাপুরের সঙ্গে তাঁর কমেডি ছিল একেবারেই অন্য মাত্রার। উদয়ের রাগ, অভিমান, আত্মসম্মান ও হতাশা—সবকিছুর মধ্যেই তিনি খুঁজে নিয়েছিলেন হাসির উপাদান। নিজের ভয়ংকর পর্দা-ইমেজকে বাদ না দিয়ে সেটিকেই হাসির অস্ত্র বানিয়েছিলেন নানা। ‘ওয়েলকাম’-এর উদয় শেঠ চরিত্রটি তাই তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম জনপ্রিয় চরিত্র হয়ে ওঠে।
এটাই ছিল নানা পাটেকারের বড় শক্তি—একই অভিনেতার মধ্যে ভয়, রাগ, অসহায়ত্ব, কৌতুক ও আবেগকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে ধারণ করার ক্ষমতা। মারাঠি সিনেমাতেও তিনি সমানভাবে নিজের জায়গা তৈরি করেন। ‘নটসম্রাট’-এ বয়সী এক থিয়েটার অভিনেতার চরিত্রে তাঁর অভিনয় আবারও দেখিয়ে দেয়, আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে পর্দায় তুলে ধরার দক্ষতা কতটা গভীর ছিল। তাঁর ঝুলিতে ছিল তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও পদ্মশ্রীসহ একাধিক সম্মান।
তবে পর্দার বাইরের নানা পাটেকারের জীবনও ছিল নানা আলোচনায় ঘেরা। ২০১৮ সালে অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্ত ২০০৮ সালে ‘হর্ন ওকে প্লিজ’ ছবির শুটিংয়ের সময় নানা পাটেকারের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ সামনে আনেন। তাঁর অভিযোগ ভারতের #MeToo আন্দোলনের সময় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। নানা পাটেকার অভিযোগ অস্বীকার করেন। ২০১৯ সালে মুম্বাই পুলিশ প্রমাণের অভাবে মামলাটি এগিয়ে নেওয়ার মতো যথেষ্ট তথ্য নেই জানিয়ে ক্লোজার রিপোর্ট জমা দেয়। তনুশ্রী দত্ত সেই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন।
এই অধ্যায় নানা পাটেকারের জনপরিচয়ের একটি বিতর্কিত অংশ হয়ে আছে। তাঁর অভিনয়ের কৃতিত্বের কথা বলতে গিয়ে অভিযোগটির উল্লেখ এড়িয়ে যাওয়া যায় না। একই সঙ্গে অভিযোগকে আদালতে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবেও উপস্থাপন করা যায় না।
নানা পাটেকারের জীবনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো। বলিউডের ঝলমলে জীবনযাপনের প্রতি তাঁর আগ্রহ তুলনামূলক কম ছিল। বরং কৃষকদের দুর্দশা ও আত্মহত্যার মতো সংকটের সময়ে তাঁদের সহায়তায় কাজ করার জন্যও তিনি পরিচিত ছিলেন।
নায়ক হওয়ার প্রচলিত চেহারা তাঁর ছিল না। কিন্তু কণ্ঠ ছিল স্বতন্ত্র, শরীরী ভাষায় ছিল টানটান ভাব। সাধারণ একটি সংলাপকেও তিনি এমনভাবে বলতে পারতেন, যেন তার ভেতরে লুকিয়ে আছে কোনো বিপদ। এ কারণেই ছোট কিংবা বড়—যে চরিত্রেই অভিনয় করেছেন, পর্দায় আলাদা করে চোখে পড়েছেন।
নানা পাটেকারের গল্প তাই সহজ নয়। একদিকে ‘পারিন্দা’র আন্না শেঠ, ‘ক্রান্তিবীর’-এর তীব্র চরিত্র ও ‘ওয়েলকাম’-এর উদয় শেঠ; অন্যদিকে ব্যক্তিজীবনের বিতর্ক ও অভিযোগ। একদিকে কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো মানুষ, অন্যদিকে যৌন হয়রানির অভিযোগ ঘিরে তৈরি হওয়া অস্বস্তিকর অধ্যায়। তাঁর উত্তরাধিকার তাই শুধু সেরা অভিনয় দিয়ে তৈরি নয়; জীবনের জটিল অধ্যায়গুলোও সেখানে জায়গা করে নিয়েছে।
নানা পাটেকারের অভিনয় ও তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো ভারতীয় সিনেমার দর্শকের মনে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে। তাঁর বিদায় একই সঙ্গে একটি দীর্ঘ অভিনয়জীবনের সমাপ্তি ও একজন জটিল শিল্পীর উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় হয়ে থাকল।
ভোরের আকাশ/জেআ