সংগীতের আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র মাইকেল জ্যাকসন

পপ সঙ্গীতের ইতিহাসে তিনি এমন এক নক্ষত্র, যার আলো কখনো নিভে যাওয়ার নয়। তিনি ‘কিং অব পপ’—মাইকেল জ্যাকসন। আজ ২৫ জুন। ২০০৯ সালের আজকের এই দিনে কোটি ভক্তকে কাঁদিয়ে না-ফেরার দেশে চলে গিয়েছিলেন সঙ্গীতের এই কিংবদন্তি। আজ তাঁর প্রয়াণ দিবস। দেখতে দেখতে তাঁর প্রস্থানকালের ১৭টি বছর পার হয়ে গেলেও, বিশ্বের কোটি কোটি ভক্তের হৃদয়ে আজও তিনি সমানভাবে অমলিন ও জীবন্ত।
সঙ্গীতকে শুধু কানের আরাম থেকে চোখের ভিজ্যুয়াল ট্রিটে রূপান্তর করার পেছনে মাইকেল জ্যাকসনের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর নাচের স্টাইল, রাজকীয় পোশাক, আর অনন্য কণ্ঠস্বর আজও নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করে চলেছে। পপ সম্রাটের প্রয়াণ দিবসে তাঁর অনন্য কীর্তি ও জীবনের কিছু অবিস্মরণীয় অধ্যায় নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সঙ্গীত জগতে এক নতুন বিপ্লব
১৯৫৮ সালের ২৯ আগস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানায় জন্ম নেওয়া এই বিস্ময় বালক মাত্র পাঁচ বছর বয়সে ভাইদের সাথে ‘জ্যাকসন ফাইভ’ ব্যান্ডের মাধ্যমে সঙ্গীত সফর শুরু করেন। তবে তাঁর আসল জাদুকরী রূপ দেখা যায় একক ক্যারিয়ার শুরু করার পর। তাঁর একেকটি গান মানেই ছিল চার্টবস্টারের শীর্ষে থাকা অবধারিত ঝড়।
২. ‘থ্রিলার’ : ইতিহাসের সেরা রেকর্ড
১৯৮২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মাইকেল জ্যাকসনের ষষ্ঠ একক অ্যালবাম ‘থ্রিলার’ বিশ্ব সঙ্গীতের ইতিহাস চিরতরে বদলে দেয়।
রেকর্ড: এটি আজ পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া অ্যালবাম। এই অ্যালবামের ‘বিলি জিন’, ‘বিট ইট’ এবং ‘থ্রিলার’ গানগুলো পপ মিউজিকের সংজ্ঞা নতুন করে লিখেছিল। কেবল এই একটি অ্যালবাম দিয়ে তিনি বিশ্বব্যাপী পপ ধারার একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে ওঠেন।
৩. ‘মুনওয়াক’ এবং নাচের নতুন ব্যাকরণ
মাইকেল জ্যাকসন কেবল একজন দুর্দান্ত গায়কই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী ড্যান্সার। ১৯৮৩ সালে ‘মোটাউন ২৫’ অনুষ্ঠানে পারফর্ম করার সময় তিনি প্রথমবার দেখান তাঁর সিগনেচার ড্যান্স স্টেপ—‘মুনওয়াক’।
পিছনের দিকে হেঁটেও যে অভিকর্ষকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এমন মায়াজাল তৈরি করা যায়, তা বিশ্ববাসী অবাক হয়ে দেখেছিল। এরপর তাঁর ‘অ্যান্টি-গ্র্যাভিটি লিন’ (স্মুথ ক্রিমিনাল গানে ৪৫ ডিগ্রি কোণে ঝুঁকে যাওয়া) নাচের দুনিয়ায় এক অভূতপূর্ব বিস্ময় হিসেবে গণ্য হয়।
৪. মানবিক মাইকেল ও ‘উই আর দ্য ওয়ার্ল্ড’
অনেকেই হয়তো জানেন না, মাইকেল জ্যাকসন তাঁর আয়ের একটি বিশাল অংশ বিশ্বজুড়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কল্যাণে ও দাতব্য সংস্থায় দান করতেন। ১৯৮৫ সালে আফ্রিকার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের সহায়তার জন্য তিনি অন্য তারকাদের সাথে নিয়ে তৈরি করেন ঐতিহাসিক গান ‘উই আর দ্য ওয়ার্ল্ড’। এছাড়া তাঁর ‘হিল দ্য ওয়ার্ল্ড’ এবং ‘আর্থ সং’ গানগুলোর মাধ্যমে তিনি বিশ্বশান্তি ও পরিবেশ রক্ষার এক অনন্য বার্তা দিয়ে গেছেন।
৫. বিতর্ক এবং জীবনের ট্র্যাজেডি
খ্যাতির চূড়ায় থাকা এই তারকার জীবন অবশ্য সবসময় মসৃণ ছিল না। ত্বকের রঙ পরিবর্তন (ভিটিলিগো রোগ), প্লাস্টিক সার্জারি নিয়ে সমালোচনা এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আইনি জটিলতা ও আর্থিক টানাপোড়েন তাঁর ব্যক্তিগত জীবনকে বিষাদময় করে তুলেছিল। ২০০৯ সালের ২৫ জুন মাত্র ৫০ বছর বয়সে ক্যালিফোর্নিয়ার নিজ বাসভবনে আকস্মিকভাবে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে (অতিরিক্ত প্রোপোফল নেওয়ার কারণে) তিনি মারা যান। তাঁর এই রহস্যময় মৃত্যু পুরো বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।
কিংবদন্তির শেষ নেই:
মাইকেল জ্যাকসন শুধু একজন মানুষ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান, একটি যুগ। ফ্যাশন স্টেটমেন্টে এক হাতের সাদা গ্লাভস, লাল লেদার জ্যাকেট আর কালো টুপি—আজও মাইকেল জ্যাকসন মানেই এক অদ্ভুত উন্মাদনা। শারীরিকভাবে তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি, তাঁর গান এবং তাঁর নাচ কোটি কোটি ভক্তের হৃদস্পন্দনে প্রতিধ্বনিত হবে অনন্তকাল।
ভোরের আকাশ/জেআ