সরকারের উদ্যোগে বদলাচ্ছে ধানমন্ডি লেক

নগরবাসীর জন্য ধানমন্ডি লেক ও আশপাশের ফুটপাতকে আরও নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও দখলমুক্ত করতে সরকারিভাবে জোরদারে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি), ধানমন্ডি সোসাইটি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে শুরু হয়েছে ধারাবাহিক অভিযান ও তদারকি কার্যক্রম। ইতোমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, ইজারাদারদের জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, নিয়মিত নজরদারি এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার কাজ শুরু হয়েছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ধানমন্ডি লেকপাড় ও বিভিন্ন সড়কের ফুটপাতের কিছু অংশে চা, ডাব, ভাতের হোটেলসহ বিভিন্ন অস্থায়ী দোকান গড়ে ওঠায় পথচারীদের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছিল। বিশেষ করে রোড-২, ৩, ৪, ৬, ৬/এ, ৮, ১০, ১৪ ও ২৭ নম্বর সড়ক এবং রবীন্দ্র সরোবর এলাকায় ফুটপাতের বিভিন্ন অংশ সংকুচিত হয়ে পড়েছিল। এতে অনেক পথচারীকে সড়কে নেমে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কিছু এলাকায় ফুটপাতের ওপর অনিয়ন্ত্রিত দোকান বসেছে। কোথাও কোথাও সন্ধ্যার পর অনাকাঙ্ক্ষিত আড্ডা ও মাদকসেবনের অভিযোগও রয়েছে। ফলে নিরাপদ হাঁটার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছিল।
রোকন মাহমুদ নামে এক পথচারী বলেন, “ফুটপাতে দোকান থাকায় অনেক সময় রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হয়। তবে এখন প্রশাসনের অভিযান শুরু হয়েছে। নিয়মিত অভিযান চললে পরিস্থিতি আরও ভালো হবে।” আরেকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “ফুটপাত তো মানুষের চলাচলের জন্য। প্রশাসন যেভাবে অভিযান শুরু করেছে, তা অব্যাহত থাকলে ধানমন্ডি আবার আগের মতো সুন্দর পরিবেশ ফিরে পাবে।”
জানা যায়, কয়েকটি এলাকায় কিছু ব্যক্তি দোকান নিয়ন্ত্রণ ও অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এক দোকানি জানান, তারা প্রতিদিন নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিলেও কারা সেই টাকা নেয়, তা তারা নিশ্চিত নন।
ডিএসসিসির উচ্ছেদ অভিযান
গত মঙ্গলবার ধানমন্ডি লেক এলাকায় বিশেষ উচ্ছেদ অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে লেক ও লেক-সংলগ্ন বিভিন্ন সেক্টরে ইজারার শর্তের বাইরে গড়ে ওঠা অবৈধ অস্থায়ী স্থাপনা, টং দোকান ও হকার উচ্ছেদ করা হয়। পাশাপাশি ফুটপাত ও উন্মুক্ত স্থান দখল করে ব্যবসা পরিচালনার দায়ে চারটি মামলায় তিন হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। ডিএসসিসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জনসাধারণের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা এবং লেকের নান্দনিক পরিবেশ বজায় রাখতে এ ধরনের অভিযান নিয়মিত পরিচালিত হবে।
সমন্বিত উদ্যোগে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ধানমন্ডি সোসাইটির সভাপতি ডা. মোসাদ্দেক হাবিব (মিতু) বলেন, “ফুটপাত দখলমুক্ত করা, মাদক নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও ধানমন্ডি মডেল থানা ব্যবস্থা নিলে আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। অতীতে নিরাপত্তাকর্মীদের মাধ্যমে উদ্যোগ নেওয়ার সময় সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছিল। তাই এখন সমন্বিত উদ্যোগই সবচেয়ে কার্যকর।”
তিনি জানান, সম্প্রতি দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গণশুনানিতে ধানমন্ডির বিভিন্ন সমস্যার বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে প্রশাসক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে একশনে নেমেছি। ইজারাদারদের নিজ নিজ অংশে দায়িত্বশীলভাবে থাকতে হবে। ফুটপাত ও লেক এলাকায় শৃঙ্খলা আনতে ধানমন্ডি সোসাইটিকে নিয়ে একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেখানে সব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এখন থেকে প্রতি মাসে ইজারাদারদের সঙ্গে সভা করা হবে এবং তাদের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।”
ডিএসসিসি সূত্র জানিয়েছে, নগরীর উন্মুক্ত স্থান, ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত রাখতে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে লেক এলাকার সৌন্দর্য রক্ষা, পথচারীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসন, ধানমন্ডি সোসাইটি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।
স্থানীয়দের মতে, শুধু উচ্ছেদ অভিযান নয়, নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহির ব্যবস্থাই ধানমন্ডি লেকে স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে। তারা আশা করছেন, চলমান এ উদ্যোগ ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হলে ধানমন্ডি লেক আবারও নগরবাসীর জন্য নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও স্বস্তিদায়ক একটি উন্মুক্ত পরিবেশ হিসেবে ফিরে আসবে।
সরকারি উদ্যোগ, সিটি করপোরেশনের অভিযান এবং স্থানীয় অংশগ্রহণ-এই তিনের সমন্বয়ে ধানমন্ডি লেকে শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার কার্যক্রম এখন দৃশ্যমানভাবে এগোচ্ছে।
ভোরের আকাশ/এনএস