অজুহাত সংসদ নির্বাচন
রাজধানীতে তীব্র পরিবহন সংকট ও দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে ভোগান্তি

আসন্ন সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজধানীর বাজারগুলোতে দ্রব্যমূল্য হু হু করে বেড়ে গেছে। বিক্রেতারা বলছেন, সময়মতো কিংবা চাহিদামতো তারা মালামাল আনতে পারছেন না। আর ক্রেতারা বলছেন, একশ্রেনীর অসাধু ব্যবসায়ী নির্বাচনের সুযোগ নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে খাদ্যসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়িয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, মজুদ করে কৃত্তিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। এদিকে, পরিবহন খাতে সৃষ্টি হয়েছে এক অরাজকতা। বিভিন্ন রুটের বাসগুলো হঠাৎ করেই ‘গেটলক’, ‘ডাইরেক্ট’ কিংবা ‘সিটি সার্ভিস’ এর নামে পরিচালিত হচ্ছে। এতে করে রাজধানী হয়ে পড়েছে পরিবহনশূন্য। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়ক এবং বাজার ঘুরে এইসব নেতিবাচক দৃশ্য চোখে পড়ে।
সরকারের নজর এখন পুরোপুরি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দিকে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে ব্যস্ত সময় পার করছে। সচিবালয় থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনও নির্বাচনি কাজে নিয়োজিত। দেশের সাধারণ মানুষের দৃষ্টিও একই দিকে। এদিকে, নির্বাচন শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ পরই শুরু হবে রমজান। একই সময়ে সরকার পরিবর্তনের প্রক্রিয়াও চলবে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন দেশের অসাধু ব্যবসায়ীরা।
অতীতে বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, নির্বাচন ও রমজানকে কেন্দ্র করে নিত্যপণ্যের চাহিদা বেড়ে যায়। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহে সামান্য ব্যাঘাত ঘটলেই বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে প্রস্তুত থাকে অসাধু ব্যবসায়ীরা। এ বছরও তারা আমদানিকৃত নিত্যপণ্য মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির পরিকল্পনা করছে।
প্রতিবছর রমজানকে কেন্দ্র করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থা, পুলিশ, আনসার, র্যাব ও বিজিবিসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের সমন্বয়ে ১৫-২০টি টিম বাজার মনিটরিংয়ে নামলেও এ বছর তেমন কোনও উদ্যোগ চোখে পড়েনি। নির্বাচনি কাজে ব্যস্ত থাকায় জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারাও বাজার পরিস্থিতিতে নজর দিতে পারছেন না। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্বাচনের কারণে সরকারের মনোযোগ এখন প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে, ফলে বাজার ব্যবস্থাপনা চলে গেছে অতিরিক্ত মুনাফাখোরদের দখলে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, শীতের মৌসুম হওয়ায় শাকসবজি, আলু ও পেঁয়াজের দাম এখনও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রয়েছে। তবে অন্য সব পণ্যের ক্ষেত্রে চিত্র ভিন্ন। ভোজ্যতেল, ছোলা, চিনি, খেজুর, ফল, মসলা ও বিভিন্ন ধরনের ডালের বাজার ইতোমধ্যে অস্থির হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরেই কোনও যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই চাল ও আটা বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের মসলার দাম পৌঁছেছে সীমাহীন পর্যায়ে। তবে, নির্বাচনের ডামাডোলে চাপা পড়ে গেছে নিত্যপণ্যের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি।
এ সুযোগে পণ্যের অবৈধ মজুত গড়ে তুলছে অসাধু চক্র। তবে এবার তারা অবলম্বন করছেন ভিন্নপথ। আগের মতো নির্দিষ্ট গুদামে নয়, বরং দেশের বিভিন্ন নদীতে লাইটার জাহাজে পণ্য মজুত গড়ে তুলেছেন ব্যবসায়ীরা। নারায়ণগঞ্জ, যশোর ও নোয়াপাড়া এলাকার নদীতে ভাসমান লাইটার জাহাজে পণ্য রাখা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে অভিযান পরিচালনা করা হলেও শতভাগ সুফল মিলছে না। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছে। বাজার পরিস্থিতি বর্তমানে বেসামাল। মুনাফাখোর সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি সরকার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনি ব্যস্ততার মধ্যেও সরকারকে বাজার ব্যবস্থাপনায় নজর দিতে হবে। তা না হলে নিত্যপণ্যের বাজার সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গিয়ে গণরোষ সৃষ্টি হতে পারে। এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচন পরিচালনা যেমন সরকারের দায়িত্ব, তেমনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও বাজার নিয়ন্ত্রণও সরকারের দায়িত্ব। রমজানে নিত্যপণ্যের বাজার মনিটরিং সরকারের রুটিন কাজ হওয়া উচিত। কঠোর নজরদারি থাকলে কেউ অনৈতিক সুবিধা নিতে পারবে না।’
বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক হাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের সঙ্গে একযোগে কাজ করছে এফবিসিসিআই। অনিয়ম, কৃত্রিম সংকট বা অনৈতিক মুনাফার চেষ্টা প্রতিহত করা হবে।’
রাজধানীর বড় পাইকারি বাজার মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ গোলাম মাওলা বলেন, ‘বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহে কোনও ঘাটতি নাই। দাম বৃদ্ধিরও কোনও সুযোগ নাই। কেউ যদি অনৈতিক মুনাফা করতে চায় সেটি দেখার দায়িত্ব সরকারের। বাজারে সরকারের কঠোর মনিটরিং থাকা দরকার।’
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘প্রয়োজনীয় সব নিত্যপণ্যের যথেষ্ট মজুত আছে। পণ্য সংকটের কোনও সম্ভাবনা নেই। বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহ, মজুত ও মূল্য পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দামামা বাজছে দেশজুড়ে। ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটকে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকা এখন এক অন্যরকম স্তব্ধতার পথে। সরকারি ছুটির ঘোষণা আর ঘরমুখো মানুষের স্রোতে ঢাকা যেন এক ‘ছুটির ফাঁদে’ আটকা পড়েছে। আর এই ফাঁদে পড়ে সাধারণ যাত্রীদের নাভিশ্বাস উঠছে রাজপথে। গতকাল সকাল থেকেই রাজধানীর শ্যামলী, শিশুমেলা, কলেজগেট, আসাদগেট, আড়ং ও ধানমন্ডি, বনশ্রী, রেলস্টেশনে ঘরমুখো মানুষের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু পরিবহন সংকটের কারণে চরম দূর্ভোগের মধ্যে পড়ে সাধারণ যাত্রীরা। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে চলাচলকারী গণপরিবহনের উপস্থিতি ছিল সীমিত। অধিকাংশ সড়কে স্টপেজে যাত্রী দাঁড়িয়ে থাকার চিত্র ছিল চোখে পড়ার মতো। দীর্ঘ সময় পরপর দুই একটি গণপরিবহন আসলেও সেগুলোতে থাকছে না তিল ধরার ঠাঁই। অনেককে গাড়ির গেটে ঝুলতেও দেখা গেছে। এছাড়াও দূর থেকে গণপরিবহন আসার চিত্র দেখলেই যাত্রীদের গাড়ির দিকে ছুটে যাওয়া ও গাড়িতে ওঠার চেষ্টা করতেও দেখা গেছে।
কলেজগেট এলাকায় গাড়ির অপেক্ষায় থাকা শামীম বলেন, বাড়িতে যাওয়ার জন্য বের হয়েছি। সায়েদাবাদ গিয়ে গাড়িতে উঠবো। কিন্তু সায়েদাবাদে যাওয়ার গাড়ি পাচ্ছি না। যে গাড়ি আসছে সেগুলোতেও ওঠার পরিস্থিতি নেই।
রাজধানীর বনশ্রীর বাসিন্দা এরশাদ আলী, দীর্ঘসময় ধরে বাসের অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু কোনো গাড়ির দেখা নেই। ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলেন, ‘ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু কোনো বাসের দেখা নেই। শুনলাম অনেক বাস মালিক নাকি নির্বাচনের প্রচারণার জন্য গাড়ি ভাড়া দিয়ে দিয়েছেন। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের এখন উপায় কী?’ এরশাদ আলীর মতো শত শত মানুষ বাস স্টপেজে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ অপেক্ষা করেও গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না। মূলত অনেক বাস নির্বাচনি প্রচারণায় নিয়োজিত হওয়ায় এবং অন্য গণপরিবহনগুলোও বিধিনিষেধের কারণে সড়কে কম থাকায় সাধারণ যাত্রীরা এই চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
উবারচালক আক্তার বলেন, রাস্তায় আজ গাড়ি নেই। সকাল থেকে মানুষ ভোগান্তিতে আছে। সবাই ক্ষ্যাপে ভাড়া মারছে। কারণ ক্ষ্যাপে ভাড়া বেশি। আমিই সকাল থেকে ৩ ঘণ্টায় ১ হাজার ৬০০ টাকার ভাড়া মেরেছি। টার্গেট পূরণ হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে আজ চাঁদ রাত।
ফেসবুকে মাহবুব হাসান সজীব নামের একজন লিখেছেন, ‘রাস্তায় নামলেই মনে হয় এটা রাস্তা না, লাইভ রিয়েলিটি শো। বাস, ট্রাক, সিএনজি, মোটরসাইকেল সবাই দাঁড়িয়ে আছে গভীর ভাবনায়। রিকশা অবশ্য ভাবনায় না, সে আবেগে উল্টো পথে এগোচ্ছে। মানুষ হাঁটছে একটাই ভরসায় আজকের কপালে কী লেখা আছে!’
তিনি লেখেন, আগারগাঁও থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে এলাম। সড়কে পাবলিক পরিবহন অনেক কম। বিশেষ করে বাস কম। রিকশা, সিএনজি ও মোটরসাইকেলের দাপট ছিল অনেক। সড়কে মানুষও কম।
এদিকে গাড়ি সংকটের কারণ জানতে চাইলে মৌমিতা পরিবহনের চালকের সহকারী বলেন, নির্বাচনের কারণে অনেকেই বাড়িতে চলে গেছে। আবার অনেকে যাচ্ছেন। তাই দূরপাল্লার গাড়ির সংকট থাকার কারণে অনেক লোকাল গাড়ি ঢাকার বাইরে যাত্রী পরিবহন করছে। আবার অফিস বন্ধ হয়ে যাওয়া আর মানুষ ঢাকার বাইরে চলে যাওয়ার কারণে অনেক মালিকই তাদের সব গাড়ি রাস্তায় বের করেনি। তাই ঢাকায় গাড়ির সংকট দেখা দিয়েছে।
ভোরের আকাশ/এসএইচ