দুর্গাপূজায় ৩৩ হাজারের বেশি মণ্ডপে নিরাপত্তা দিয়েছে আনসার-ভিডিপি

শারদীয় দুর্গোৎসব-২০২৬ উপলক্ষে সারাদেশের ৩৩ হাজার ১৬৫টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় ২ লাখ ১২ হাজার ৮১৮ জন আনসার-ভিডিপি সদস্য মোতায়েন করা হয়। উৎসবকে শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন রাখতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, দ্রুত সাড়াদান, অপরাধ প্রতিরোধ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পূজা উদযাপন কমিটির সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী।
বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদের দিকনির্দেশনা ও তদারকিতে ১৫ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত এ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পূজামণ্ডপের নিরাপত্তার পাশাপাশি দর্শনার্থীদের নির্বিঘ্ন চলাচল, নারী ও শিশুদের সুরক্ষা, মানবিক সহায়তা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাহিনীর সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দিতে আনসার ব্যাটালিয়নের সমন্বয়ে ১০৪টি স্ট্রাইকিং ফোর্স টিমের ৬২৪ জন সদস্যকে প্রস্তুত রাখা হয়। ব্যক্তিগত উদ্যোগে আয়োজিত পূজামণ্ডপসহ বিভিন্ন স্থানের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও বাহিনীর নিজস্ব মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হয়। পূজা-পরবর্তী সময়েও নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সদস্যদের দায়িত্বে রাখা হয়।
বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, দুর্গাপূজাকেন্দ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে মোট ১৩১টি ঘটনায় প্রতিরোধমূলক ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিমা ভাঙার চেষ্টা ও ভাঙচুর প্রতিরোধের ২০টি, বিবাদমান সমস্যা সমাধানের ৩৬টি, অগ্নিসংযোগ প্রতিরোধের দুটি এবং মাদকসংক্রান্ত ১৩টি ঘটনা রয়েছে।
এ ছাড়া ২৪টি পৃথক ঘটনায় ৪৯ জনকে আটক করা হয়। উদ্ধার করা হয় ১৫টি শিশু। চুরির অভিযোগে আটক করা হয় আরও ছয়জনকে। পাশাপাশি ১৫টি ঘটনায় মূল্যবান সামগ্রী উদ্ধার এবং বিবিধ সমস্যা-সংক্রান্ত আরও নয়টি ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে।
তবে পূজার দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন ঘটনায় আনসার-ভিডিপির চার সদস্য মৃত্যুবরণ করেন এবং ১৭ জন আহত ও অসুস্থ হন বলে বাহিনীর তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরাপত্তা কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে ‘শারদীয় সুরক্ষা অ্যাপ’ ব্যবহার করা হয়। বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এ অ্যাপের মাধ্যমে ৬৬ হাজার ৩৩০ জন নারী আনসার-ভিডিপি সদস্য দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত পূজামণ্ডপে কোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনা ঘটলে তাঁরা তাৎক্ষণিকভাবে অ্যাপে তথ্য জানান। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
এ ছাড়া সদস্য নির্বাচন ও মোতায়েন ব্যবস্থাপনায় AVMIS এবং STDMS সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, পরিকল্পিত জনবল মোতায়েন ও মাঠপর্যায়ের তাৎক্ষণিক সাড়াদানের মাধ্যমে নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, পূজা উদযাপন কমিটি ও আনসার-ভিডিপি সদস্যদের পারস্পরিক সহযোগিতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সমন্বিত ভূমিকার প্রশংসা করেন।
২০ অক্টোবর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির আয়োজনে শারদীয় শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “ক্ষমতাকেন্দ্রিক মানসিকতার পরিবর্তে জনসেবা, জবাবদিহি ও জনসম্পৃক্ততাকে প্রাধান্য দিয়ে সম্মিলিতভাবে দেশের জন্য কাজ করার এই সংস্কৃতি আরও সুদৃঢ় করতে হবে।”
দায়িত্ব পালনকালে মৃত্যুবরণকারী আনসার-ভিডিপি সদস্যদের আত্মত্যাগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁদের আত্মত্যাগকে বাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সদস্যদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে অভিহিত করেন।
বাহিনীর সদর দপ্তরের কন্ট্রোল রুম ও মিডিয়া শাখা থেকে শুরু করে রেঞ্জ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং মাঠপর্যায়ের সদস্যদের সমন্বিত তৎপরতায় দুর্গোৎসবের নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মতে, দুর্গোৎসব-২০২৬ উপলক্ষে পরিচালিত এ সমন্বিত নিরাপত্তা কার্যক্রম ভবিষ্যতে নির্বাচনসহ বৃহৎ জনসমাগমপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক আয়োজনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হিসেবে কাজে আসবে। জনসম্পৃক্ততা, প্রযুক্তির ব্যবহার, জবাবদিহি ও দ্রুত সাড়াদানের সমন্বয়ে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার এ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় জানিয়েছে বাহিনী।
ভোরের আকাশ/জেআ