শিরোনাম
বিদেশি সহায়তা নয়, বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠনের উদ্যোগবাংলাদেশে হামের প্রকোপ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও পোলিও প্রাদুর্ভাবের ‘সতর্কতা’শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও কমেছে শিক্ষার্থীবিদেশি ঋণ কমেছে ৪২.৩৪%, ছয় উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিশ্রুতি নেইকক্সবাজারে আগুন: ডিএনএ পরীক্ষায় নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত, এখনো নিখোঁজ ১অনলাইন টিকিটের কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ কঠিন: রেলমন্ত্রীনিপ্পন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের নৈশভোজে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রীবিদেশি সহায়তা নয়, বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠনের উদ্যোগবাংলাদেশে হামের প্রকোপ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও পোলিও প্রাদুর্ভাবের ‘সতর্কতা’শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও কমেছে শিক্ষার্থীবিদেশি ঋণ কমেছে ৪২.৩৪%, ছয় উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিশ্রুতি নেইকক্সবাজারে আগুন: ডিএনএ পরীক্ষায় নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত, এখনো নিখোঁজ ১অনলাইন টিকিটের কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ কঠিন: রেলমন্ত্রীনিপ্পন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের নৈশভোজে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রী

সেমিনারে বক্তারা

স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতিতে মিঠুসহ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর দায়ী

ভোরের আকাশ প্রতিবেদক

প্রকাশ : ১২ ডিসেম্বর ২০২৫, ২:৩৪ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
ছবি: ভোরের আকাশ
ছবি: ভোরের আকাশ

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরসহ মেডিকেল কর্তৃপক্ষের সহায়তায় স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি ও অনিয়মের হোতা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঠিকাদার মোতাজ্জেল ইসলাম মিঠু। এই দুর্নীতিবাজ মিঠু শুধু সরকারি অর্থ অপচয় করেনি, মেডিকেলে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিত। দেশের বিভিন্ন মেডিকেলে মিঠুর সরবরাহ করার নষ্ট ও অকেজো যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদির মাধ্যমে ভুল পরিক্ষা-নিরীক্ষার কারণে চিকিৎসকরা ভুল চিকিৎসা দেন রোগীদের। ফলে অকালে ঝরে যায় বহু মানুষের প্রাণ। আর এজন্য দায়ী হলো দুর্নীতিবাজ মিঠু ও এই অব্যবস্থাপনায় জড়িত সরকারের উচ্চমহল, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও অধিদপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।

বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) রাজধানীর সেগুনবাগিচাস্থ বিএমএ’র সভাকক্ষে দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্য আন্দোলন কর্তৃক আয়োজিত সর্বস্তরের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে চাই দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথার বলেন।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মো. মঞ্জুরুল আজীম। সেমিনারে বক্তব্য রাখেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী, লায়ন্স ক্লাব ইন্টারন্যাশনালের সাবেক ডিস্ট্রিক্ট গভর্নর আশফাকুর রহমান, হ্যালকো গ্রুপ লিমিটেডের সাবেক কনসালটেন্ট মশিউর রহমান এবং ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল প্রমুখ।

মঞ্জুরুল আজীম তার প্রবন্ধে বলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত দেশের নাগরিকদের জন্য একটি অপরিহার্য সেবা হলেও, এটি দীর্ঘকাল ধরে দুর্নীতির কারণে জর্জরিত। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসনের অভাবে এই খাতে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি এবং সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং অন্যান্য গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরিবার দুর্নীতির শিকার হয়, যা এই খাতের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে।

১. দুর্নীতির প্রধান ক্ষেত্র ও ধরন 
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি মূলত কয়েকটি প্রধান ক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত : ক. নিয়োগ ও পদোন্নতিতে দুর্নীতি : যোগ্যতা উপেক্ষা করে রাজনৈতিক প্রভাব বা অর্থের বিনিময়ে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর নিয়োগ ও বদলি-পদোন্নতি দেওয়া হয়। অনেক সময় একই স্থানে দীর্ঘদিন থাকার সুবিধা নিতে বা সুবিধাজনক স্থানে বদলির জন্য অর্থ লেনদেন হয়।

খ. সরকারি কেনাকাটায় (প্রকিউরমেন্ট) অনিয়ম : যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি কেনা : চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি, যেমন আইসিইউ যন্ত্রপাতি, অক্সিজেন সিলিন্ডার, আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন ইত্যাদি কেনার সময় চড়া দাম দেখানো হয় বা নিম্নমানের যন্ত্রপাতি কেনা হয়। অনেক সময় অব্যবহৃত যন্ত্রপাতি কিনে সরকারি অর্থের অপচয় করা হয়। এক্ষেত্রে সঠিক উদাহরণ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রভাবশালী ঠিকাদার মিঠু। রংপুর এলজিইডির সাধারণ ঠিকাদার থেকে মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুর উত্থান। সেখানে ছোটখাটো ঠিকাদারি কাজ করতেন। এরপর স্বাস্থ্য বিভাগে ঠিকাদারি শুরু করেন। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। 

গত দুই যুগ ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সকল কেনাকাটা, বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্য ছিল মূলত মিঠুর নিয়ন্ত্রণে। মিঠুর টাকা পকেটে যায়নি এমন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা খুবই কম। মিঠু অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন এবং অনেককে কোটিপতি বানিয়েছেন। মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, বিভাগীয় দপ্তর ও সিভিল সার্জন অফিসসহ স্বাস্থ্যের বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ অফিসে তার পছন্দের লোককে কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হতো।

সম্প্রতি বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকার নিউজ সূত্রে জানা যায়, মিঠু কোনো শীর্ষ কর্মকর্তার রুমে প্রবেশ করলে ওই সময় কোনো কর্মকর্তা কিংবা কোনো দর্শনার্থী প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকত। জানা গেছে মিঠুর সরবরাহকৃত কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বাক্সবন্দি অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অনেক যন্ত্রপাতি চালু করার কয়েক মাস পর বিকল হয়ে গেছে। মিঠুর সরবরাহকৃত যন্ত্রপাতি নিম্নমানের ও ব্যবহারের অনুপযোগী। প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালে প্রকাশিত বহুল আলোচিত পানামা পেপারসে বাংলাদেশের ঠিকাদার ব্যবসায়ী হিসেবে মিঠুর নাম উল্লেখ রয়েছে।

ওষুধ ও কেমিক্যাল ক্রয় : প্রয়োজনের অতিরিক্ত ওষুধ কেনা বা নির্দিষ্ট কোম্পানির কাছ থেকে বেশি দামে ওষুধ কেনার অভিযোগ প্রায়ই ওঠে। বিদ্যমান পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট (পিপিএ) ও রুলস (পিপিআর) অনুযায়ী, কেনাকাটার জটিলতা ও এসেন্টিয়াল ড্রাগ কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল) ও সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরেজ ডিপোর (সিএমএসডি) সক্ষমতার ঘাটতির কারণে ওষুধ ও মেডিকেল ইকুইপমেন্ট সরবরাহের ব্যবস্থায়ও সংকট বিরাজমান। আবার ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিকেল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার (নিমিউ অ্যান্ড টিসি), ট্রান্সপোর্ট অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স অর্গানাইজেশন (টেমও), স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের সীমাবদ্ধতা ও গাফিলতির চিত্র কারোর অজানা নয়। আর অ্যাকাউন্টস ও অডিট অফিসের দৈরাত্ম্যের চিত্রও আমাদের অজানা নয়।

গ. সেবা গ্রহণে ঘুষ ও হয়রানি : রোগীদের কাছ থেকে অবৈধভাবে ঘুষ আদায় করা হয়, বিশেষ করে জরুরি সেবা, ট্রলি হুইলচেয়ার ব্যবহার, বেড বরাদ্দ, এমনকি চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য। টিআইবি’র জাতীয় খানা জরিপ ২০২৩ অনুসারে, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান হতে সেবা নিতে গিয়ে ৪৯ দশমিক ১ শতাংশ খানা দুর্নীতির শিকার হয়েছে। দুর্নীতির ধরন অনুযায়ী সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও ওষুধ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে ১৯ দশমিক ২ শতাংশ, ঘুষ বা নিয়মবহির্ভূত অর্থ দিয়েছে বা দিতে বাধ্য হয়েছে ১৯ দশমিক ১ শতাংশ, চিকিৎসায় অবহেলা ও হয়রানির শিকার হয়েছে ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ, এবং অসদাচরণ বা দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছে ১১ দশমিক ৯ শতাংশ খানা।

সম্প্রতি টিআইবির স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে ৪৮.৭ শতাংশ পরিবার দুর্নীতির শিকার হয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় এ হার ৪৫ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৫১ শতাংশ। সেবা নেওয়ার সময় গড়ে ৬৮০ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে সেবা নিয়েছে ৩২.২ শতাংশ পরিবার, তবে দুর্নীতির হার জেলা সদর হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি ৫২৪ শতাংশ। মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুষ দেওয়ার ঘটনা ১২ শতাংশ ছিল। জরিপে উঠে এসেছে ট্রলি হুইলচেয়ার সেবা নিতে গিয়ে ৫৬.৫ শতাংশ পরিবার দুর্নীতির সম্মুখীন হয়েছে এবং খাদ্য পরিষেবায় দুর্নীতির হার ৬৬.৪ শতাংশ ছিল। সন্তান জন্মদান বা সি-সেকশনে গড়ে ২ হাজার ২৫৬ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। সরকারি হাসপাতালের ট্রলি হুইলচেয়ারের ঘুষ গড়ে ১৪১ টাকা এবং কমিউনিটি ক্লিনিকের ঘুষ গড়ে ১৭ টাকা ছিল।

ঘ. সরকারি হাসপাতাল পরিচালনায় অব্যবস্থাপনা : সরকারি হাসপাতালের ট্রলি, হুইলচেয়ার থেকে শুরু করে সাধারণ চিকিৎসা সরঞ্জাম পেতেও রোগীদের অবৈধ অর্থ দিতে হয়। সরকারি ওষুধ ও সরবরাহ চুরি করে বাইরে বিক্রি করার ঘটনাও দুর্নীতির একটি বড় অংশ। অনেক চিকিৎসক তাদের সরকারি দায়িত্ব পালনের সময়সীমায় মনোযোগ না দিয়ে ব্যক্তিগত প্রাইভেট প্র্যাকটিসে বেশি সময় দেন।

ঙ. বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও ক্লিনিকগুলোর নিয়ন্ত্রণহীনতা : অনেক বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই বা অনুমোদনের শর্ত ভঙ্গ করে পরিচালিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠান প্রায়শই ভুল রোগ নির্ণয়, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও অতিরিক্ত বিলের মাধ্যমে রোগীদের প্রতারিত করে।

২. দুর্নীতির মূল কারণসমূহ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব : সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং বাজেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথেষ্ট স্বচ্ছতা নেই। কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহিতা ব্যবস্থার অনুপস্থিতি দুর্নীতিকে উৎসাহিত করে। পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ ও তার সঠিক ব্যবহার না হওয়া, যদিও স্বাস্থ্য খাতে বাজেটের পরিমাণ বাড়ছে কিন্তু সেই অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অব্যয়িত থাকে বা দুর্নীতি ও অপচয়ের কারণে লক্ষ্য অনুযায়ী ব্যবহার হয় না। যদিও বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাত বিশেষভাবে নজরে আসে কোভিডের পর থেকে।

সে বছরের পরিস্থিতি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এমন একটি জনগুরুত্বপূর্ণ খাতে জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে কোনো প্রস্তুতি থাকে না। ২০১৯-২০২০ সালের বাজেটে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দ ছিল মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির মাত্র ০ দশমিক ৮৯ শতাংশ। অর্থ মূল্যে যার পরিমাণ ২৫ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা। পুরো বাজেটের আকারের তুলনায় তা ছিল মাত্র ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। অথচ পরিবহন ও যোগাযোগ খাত পেয়েছিল বাজেটের ২৬ দশমিক ১ শতাংশ, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাত পেয়েছিল ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ। আবার এই ২৫ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকার মধ্যে ১৩ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল পরিচালন খাতে।

এর মাত্র এক চতুর্থাংশের মতো বরাদ্দ ছিল ওষুধ ও সরঞ্জাম কেনার পেছনে। বাকি অর্থ চলে যাচ্ছে বেতন-ভাতায়, যদিও প্রয়োজনের তুলনায় এখনো চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা অনেক কম। আবার এই ১৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও, খরচ করতে না পারায় সংশোধিত এডিপি ১০ হাজার ১০৮ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছিল। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় টিআইবি'র জাতীয় খানা জরিপ ২০১৭ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত খাতগুলোর একটি স্বাস্থ্য খাত, যেখানে দুর্নীতির হার ৪২.৫ শতাংশ। আবার বাজেটে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ হয় তা ব্যবহার করাই সম্ভব হয় না।

গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ৪১ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ১৬ হাজার ৮৯ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এডিপির বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়, বিভিন্ন হাসপাতাল, ক্লিনিক নির্মাণ, সিটিস্ক্যান, এমআরআই মেশিনসহ সব ধরনের চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার জন্য। অর্থাৎ চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্যই এই বরাদ্দ দেওয়া হয়।

এডিপিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মোট প্রকল্পের সংখ্যা ছিল ২৮টি। এসব প্রকল্পের বিপরীতে মোট বরাদ্দ ছিল ১৬ হাজার ৮৯ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যয় হয়েছিল মাত্র ৫৫৬ কোটি ৪ লাখ টাকা, যা শতাংশের হিসাবে ৫.০৬। অর্থাৎ প্রতি মাসে এক শতাংশেরও কম কাজ হয়েছে। বাকি ছয় মাসে প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ করা অসম্ভব বলে মন্তব্য করেছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) জুলাই ডিসেম্বর মেয়াদের অগ্রগতি প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এডিপিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুটি আলাদা বিভাগের অধীনে মোট ২৮টি প্রকল্প ছিল। 

এর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ১৫টি প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ রয়েছে ১১ হাজার ১৫৩ কোটি ১২ লাখ টাকা। অর্থবছরের ছয় মাসে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে ৪.৯২ শতাংশ, যা আর্থিক হিসাবে ৫৪৮ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। অপরদিকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের ১৩টি প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ ছিল ৪ হাজার ৯৩৬ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। অর্থবছরের ছয় মাসে ব্যয় হয়েছে ৭ কোটি ৬ লাখ টাকা। বাস্তবায়ন হার ০.১৪ শতাংশ।

প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা : স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে অনেক নীতি ও নির্দেশনা বাস্তবায়নে ঘাটতি থাকে। তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে ৫ হাজার ৪৬১টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৮১০টি ঢাকা বিভাগে অবস্থিত। পাশাপাশি ৩৬টি স্পেশালাইজড হাসপাতালের মধ্যে ১৯টি ঢাকায় অবস্থিত হওয়ায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী লোকজন উন্নত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রতিনিয়ত ঢাকার ওপর চাপ বাড়ছে। সমন্বয়হীনতার কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় একটি আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর অধীন পরিচালিত হচ্ছে যেখানে পরিকল্পনা অর্থ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্য খাতকে ভিন্ন মর্যাদায় দেখার পরিবর্তে অন্যান্য খাতের মতোই একই পাল্লায় দেখছে এবং মানবিক প্রয়োজনের চেয়ে আর্থিক সাশ্রয় অগ্রাধিকার পাচ্ছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ভেতরেও দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার অসমতা বিদ্যমান, যার ফলে সচিবালয়, অধিদপ্তর ও মাঠপর্যায়ে ব্যবস্থাপনার মধ্যে একটি বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতা : রাজনৈতিক প্রভাবের অপব্যবহার করে কিছু অসাধু ব্যক্তি বা চক্র সরকারি কেনাকাটা, নিয়োগ ও বদলিতে প্রভাব খাটিয়ে দুর্নীতি করে থাকে। ২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগপর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা শিক্ষার ক্ষেত্রগুলো প্রবল শক্তি দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করেছে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ)। রাজনৈতিক দল সমর্থিত সংগঠনসহ মন্ত্রীদের স্বজন এবং তাদের আদর্শে আদর্শিত ঠিকাদার ও কর্মকর্তারা সকল দূর্নীতির চাকাকে সচল রেখেছেন।

আইনের দুর্বল প্রয়োগ : দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) অন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দুর্বলতা ও আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা দুর্নীতিবাজদের শাস্তি থেকে রেহাই পেতে সাহায্য করে। ১১ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য খাতে সিন্ডিকেট করে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় আলোচিত ঠিকাদার মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুকে গ্রেপ্তার করা হলেও গত ২৭ নভেম্বর আদালত তাকে জামিন দেয়।

২. দুর্নীতির প্রভাব : স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির প্রভাব সুদূরপ্রসারী এবং এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের উপর আঘাত হানে। জনগণের দুর্ভোগ বৃদ্ধি : ঘুষ ও অনিয়মের কারণে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয় বা মানসম্পন্ন সেবা পেতে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সহ্য করতে বাধ্য হয়।

চিকিৎসা সেবার মান অবনতি : নিম্নমানের যন্ত্রপাতি ও ওষুধ কেনার কারণে চিকিৎসার মান খারাপ হয়, যা রোগীদের আরোগ্য লাভের পথে বড় বাধা।

আস্থার সংকট : দুর্নীতির কারণে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যায়, ফলে তারা বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল বেসরকারি চিকিৎসার দিকে ঝুঁকতে থাকে।বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমসিএ) গবেষণায় দেখা যায়, প্রতিবছর ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ ১৯টিরও বেশি দেশে ৮ লাখের বেশি রোগী উন্নত চিকিৎসার জন্য যাচ্ছেন।

এর মধ্যে ১৭ শতাংশ হৃদরোগ, ১৪.৫ শতাংশ কিডনি, ১১.৫ শতাংশ অর্থপেডিক সার্জারি, ১১ শতাংশ লিভার ও ক্যানসার, ৯ শতাংশ নিউরোলজি, ৬ শতাংশ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও ইউরোলজি এবং ৪ শতাংশ গাইনোকলজি ও জেনারেল সার্জারির জন্য বিদেশমুখী। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, চিকিৎসকদের পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া, ভুল রোগ নির্ণয় এবং অব্যবস্থাপনার কারণে আস্থা হারিয়ে রোগীরা বিদেশে যাচ্ছেন।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে বিদেশে চিকিৎসা খাতে ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। মানবসম্পদ ক্ষতি : অদক্ষ বা অযোগ্য কর্মীদের নিয়োগের ফলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পেশাদারিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা মহামারি বা দুর্যোগের সময় স্পষ্ট হয়ে ওঠে (যেমন কোভিড ১৯ সংকটের সময় দেখা গিয়েছিল)। পরিশেষে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি একটি কাঠামোগত সমস্যা, যা কেবলমাত্র সরকারের একক প্রচেষ্টায় দূর করা সম্ভব নয়। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার, স্বাস্থ্যকর্মী, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ নাগরিক সকলের সম্মিলিত প্রয়াস অপরিহার্য। স্বাস্থ্য খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা গেলেই কেবল দেশের প্রতিটি মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার হিসেবে মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা লাভ করতে পারবে এবং একটি সুস্থ জাতি গঠন সম্ভব হবে।

ভোরের আকাশ/এসএইচ

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়মোতাজ্জেল ইসলাম মিঠু

শেয়ার করুন: