‘কোষ্টাল ক্লাইমেট ডায়ালগ’-এ বিশিষ্টজনেরা
উপকূলের সংকট সমাধানে সর্বদলীয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে

উপকূলের সংকট সমাধানে সর্বদলীয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। তারা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলের জীবন-জীবিকা ও প্রাণ-প্রকৃতি ঝুঁকিতে আছে। প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে আঘাত এই ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই ঝুঁকি মোকাবেলায় দীর্ঘ মেয়াদী সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। এ জন্য সকল রাজনৈতিক দলের একক সিদ্ধান্তে আসতে হবে।
রোববার (১ নভেম্বর) শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরাম আয়োজিত ‘কোষ্টাল ক্লাইমেট ডায়ালগ’-এ এসব কথা বলেন তারা। উপকূলীয় জনগণের নীতিগত প্রস্তাবনা (উপকূল ঘোষণা) আগামী বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে (কপ-৩১) তুলে ধরার দাবিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল লতিফ। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাবে উপকূল সীমাহীন সংকটে আছে। বিশাল উপকূলকে পিছিয়ে রেখে জাতীয় অগ্রগতি অসম্ভব। সরকার উপকূলের সংকট সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরামের সভাপতি আমিনুর রসুলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন বলেন, উপকূলের সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে পদক্ষেপ নিয়েছেন। বিএনপির ৩১দফা কর্মসূচি ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে এ বিষয়ে স্পষ্ট অঙ্গীকার রয়েছে। সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে নবায়ণযোগ্য জ্বালানির প্রসারে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও কর্মসূচির বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে পরিবেশের বিদ্যমান সকল সংকটের সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
উপকূলের সমস্যা সমাধানে সংসদের ভিতরে বাইরে কাজ করার জন্য উপকূল বিষয়ক সংসদীয় ককাস গঠনের প্রস্তাব করেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তিনি বলেন, দীর্ঘ লড়াই ও গণঅভ্যুত্থানের পর অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত বর্তমান বিএনপির সরকারের কাছে জনগণের বিপুল প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশা পুরণে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। জনগণের মতামতের ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণ এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে সকল প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, সরকারের উন্নয়ন কর্মকাতা উপকূলের ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে। সুন্দরবন রক্ষার কথা বলে বনের মধ্যে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ সিদ্ধান্ত নিলে তা হবে স্ববিরোধী। উপকূলের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় হাসপাতাল, নাকি উড়োজাহাজ কেনা জরুরি, সেটা সরকারের নীতি-নির্ধারকদের বিবেচনা করতে হবে।
উপকূল ও জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে সর্বদলীয় একক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা জরুরি বলে মন্তব্য করেন সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (সিপিআরডি) নির্বাহী প্রধান মো. শামসুদ্দোহা। তিনি বলেন, শুধু জলবায়ু সম্মেলনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। আমাদেরও কিছু করণীয় আছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলো এই সকল জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সবসময় বিরোধী অবস্থানে থাকেন। বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছ থেকে ন্যায্য হিস্যা আদায়ের পাশাপাশি আগামীতে রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি একক অবস্থান নির্ধারণ করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি মোস্তফা কামাল মজুমদার বলেন, অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যর জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল। আর সুন্দরবন দেশের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় হিসেবে কাজ করছে এবং কার্বন শোষণের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সুন্দরবনসহ উপকূলীয় অঞ্চলকে রক্ষায় উজানের পানি প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
মূল প্রবন্ধে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, দেশের প্রায় ৩২ শতাংশ ভূখ-জুড়ে বিস্তৃত উপকূলে প্রায় ৪ কোটি মানুষের বসবাস। লবণাক্ততা, ভাঙন ও সুপেয় পানির সংকট সমাধান না হলে মানুষ জীবিকা ও ভিটেমাটি হারিয়ে উদ্বাস্তু হতে বাধ্য হবেন। তাই উপকূলীয় পরিবেশগত সংকট নিরসনে জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত, টেকসই বাঁধ ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা গ্রহণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, কৃষি ও অবকাঠামো উন্নয়ন, সুন্দরবন সংরক্ষণ এবং দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।
সভাপতির বক্তব্যে আমিনুর রসুল জলবায়ু সম্মেলনে উপকূলের দাবিগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিক সমাজ ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্রের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরো বক্তৃতা করেন চিলড্রেন ওয়াচ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শাহ ইসরাত আজমেরী, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম আজাদ, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)’র যুগ্ম সম্পাদক হুমায়ুন কবীর সুমন, বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন, সিডিপির চেয়ারম্যান মিহির বিশ্বাস, চট্টগ্রামের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কামাল পারভেজ, কাপ-এর নির্বাহী পরিচালক খোন্দকার রেবেকা সান-ইয়াত, রি-ওয়েটের প্রকল্প ব্যবস্থাপক আসিফ মইনুর চৌধুরী, ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরামের সহসভাপতি সাকিলা পারভীন, মেরিন জার্নালিস্টস নেটওয়ার্কের সেক্রেটারি কেফায়েত শাকিল, রিভার বাংলার সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ, কসমসের নির্বাহী পরিচালক মেহনাজ মালা, ইকো সোসাইটির পরিচালক মো. জহুরুল ইসলাম, ক্লাইমেট ফ্রন্টিয়ারের জুবায়ের ইসলাম, ড্রিম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের মনোবিজ্ঞানী ও গবেষক তানজীম জামান, মৃত্তিকার চেয়ারম্যান খাদিজা খাতুন, এবিসিডি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাকিল আহমেদ প্রমূখ।
ভোরের আকাশ/এনএস