বেকারত্ব-দুর্নীতিমুক্ত দেশের আকাঙ্ক্ষা

আর মাত্র ৯ দিন পরই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ৫১টি দল অংশ নিয়েছে। দলগুলোর এবং স্বতন্ত্র মিলিয়ে ভোট যুদ্ধে অংশ নিয়েছে প্রায় দুই হাজার প্রার্থী। জয়ের টাগের্ট নিয়ে ভোটের মাঠে প্রচার-প্রচারণায় রয়েছে প্রার্থীরা। এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রার্থীর জয়-পরাজয়ের জন্য বড় ফ্যাক্টর নতুন ভোটার-এমনটাই ভাবছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্যমতে বিশিষ্টজনরা বলছে, দেশে বর্তমানে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি। এরমধ্যে নতুন ভোটারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার কোটি। যাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৩ বছর। অথাৎ দেশের মোট ভোটারের প্রায় ৩৫ শতাংশ ভোটার তরুণ। এই বিশাল ভোটব্যাংকই এবারের নির্বাচনের নিয়ামক শক্তি। এই তরুণরা এমন একটি সরকার প্রত্যাশা করছে, যারা দুর্নীতিমুক্ত দেশ এবং বেকারত্ব দূরীকরণে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
একইসঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা অনুযায়ী বৈষম্যহীন সমাজ গঠন করবে। ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার ও কর্মজীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও তরুণদের একটা বড় দাবি-এমনই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। বেশ কয়েকজন তরুণ ভোটারের সঙ্গে নির্বাচনে নিয়ে আলাপকালে তাদের প্রত্যাশা সম্পর্কে জানা যায়, তরুণরা চান সৎ নেতৃত্ব, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা এবং পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা একটি নতুন বাংলাদেশ।
এবারের নির্বাচন ঘিরে তরুণদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা অনেক। কারণ ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন ছিল নানা কারণে প্রশ্নবিদ্ধ। একতরফা নির্বাচন, রাতের ভোট, কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে না পারা এবং ব্যালট ছিনিয়ে নিয়ে সিল দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগে বিতর্কিত ঐ নির্বাচনগুলো। কাজেই গত ১৫ বছর পর নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোটাররা ভোট দিতে পারবে বলে আশা করছে এই তরুণরা।
বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনের পাদ্রীশিবপুর ইউনিয়নের রঘুনাথপুরের বাসিন্দা মো: জিয়াউল হক জীবন (২১) নতুন ভোটার হয়েছেন। ভোট দিতে যাবেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, জীবনে প্রথমবার ভোট দেবো। তাই অনেক আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি। আশা করি, এবারের নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে।
একই গ্রামের রোজী আক্তার বলেন, আমরা গ্রামের মানুষ। আমাদের কাছে এলাকার উন্নয়ন সবার আগে। এজন্য সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দিতে চাই। বিশেষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে তরুণদের দেশের সম্পদে পরিণত করবেন- এমন প্রার্থীকেই বেছে নিতে চাই। নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার শুকুন্দী বালিয়াকান্দা গ্রামের কলেজছাত্র আবির খান একজন নতুন ভোটার। এবারের নির্বাচন, সুষ্ঠু ও অবাধ ও উৎসবমুখর পরিবেশে হবে বলে প্রত্যাশা তার।
তিনি বলেন, পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার অপেক্ষায় আছি। আমি মনে করি ভোট দেওয়া প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা রাখতে চান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের একজন শিক্ষার্থী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন এলে বেশ ভালো ভালো ইশতেহার দেয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার বাস্তবায়ন তেমন দেখা যায় না। আশা করি এবার দলগুলো জনগণকে দেওয়া কথা রাখবে। নির্বাচনে সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এই শিক্ষার্থী।
তিনি আরও বলেন, এ নির্বাচন অভ্যুত্থান পরবর্তী নির্বাচন। মানুষ ভোটাধিকার ফেরত চায়। তবে আমরা গণমাধ্যমে দেখছি, কোনো কোনো প্রার্থী নিয়ম ভেঙে সময়ের আগেই প্রচারণায় নেমেছেন। অনেক প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিতে গিয়ে ‘মবের’ শিকার হয়েছেন। এসব বিষয় নির্বাচন কমিশন ও সরকারের নিরপেক্ষতা ও সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সম্প্রতি নির্বাচন ঘিরে শেরপুর, ভোলাসহ বেশ কিছু স্থানে সহিংসতার ঘটনা তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরে রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৩৩ জন। এই সহিংসতা নির্বাচনকেন্দ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বাড়িয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে প্রার্থীদের বড় একটি অংশ কোটিপতি ও ঋণগ্রস্ত। তাদের অর্থ ও পেশিশক্তির প্রভাব নিয়ে তরুণদের মধ্যে সন্দেহ আরও গভীর হয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ইয়াসির আরাফাত। জুলাই আন্দোলনে অংশ নেন রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে। নোয়াখালী-৬ আসনের তরুণ এই ভোটার মনে করেন, এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতা বদলের নয়, কাঠামোগত পরিবর্তনের সুযোগ। তার ভাষায়, সৎ ও যোগ্য মানুষকে নির্বাচিত করতে না পারলে জুলাই আন্দোলনের অর্থই হারিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, তরুণদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে-নতুন কর্মসংস্থান, মানসম্মত ও আধুনিক শিক্ষা, নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। ইয়াসির আরাফাতের মতো দেশের কাঠামোগত পরিবর্তন চান তেজগাঁও কলেজের অর্থনীতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তাজরিন সুলতানা এ্যানি। তিনি কুমিল্লা-৪ আসনের ভোটার।
ভোট দিতে যাবেন কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে এই শিক্ষার্থী বলেন, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে ভোট দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। ভোটের মাধ্যমেই আমরা যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিকে নির্বাচিত করার সুযোগ পাই। তাই আমি আমার ভোট অবশ্যই দেবো।
তরুণ ভোটারদের প্রত্যাশা প্রসঙ্গে নির্বাচন বিশ্লেষক ও ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি বলেছেন, দেশের প্রায় ৩৫ শতাংশ ভোটার তরুণ। এবারের নির্বাচনে তারা বড় ফ্যাক্টর। তারা এমন একটি সরকার চায়, যারা দেশকে দুর্নীতিমুক্ত এবং বেকার তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। তার মতে, ব্যক্তিগত জীবন,
পরিবার ও কর্মজীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও তরুণদের একটি বড় দাবি।
জেসমিন টুলি বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ছিল বেকারত্ব দূর করে শিক্ষিত যুবকদের জন্য চাকরির ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি যারা ইতোমধ্যে কর্মরত আছেন, তাদের কর্মস্থল ও চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা- ওই আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল। তাই আমার মনে হয়, তরুণরা এবার ভেবেচিন্তে ভোট দেবে। যারা দুর্নীতিমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে পারবে তরুণরা তাদেরই ক্ষমতায় দেখতে চায়। কেননা, তরুণরা সামনে এগোতে চায়। যারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা পূরণ করবে, এমন প্রার্থীদের ভোট দেবেন তরুণরা। দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি-মুক্ত এবং তরুণদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার আশ্বাস দেন ঢাকা-৮ আসনের বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাস।
তিনি বলেন, তরুণ ভোটাররা নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্য মুখিয়ে আছে। তরুণরা চায় এমন এক দেশ, যেখানে দখল, চাঁদাবাজি ও মাস্তানি থাকবে না। আমরা ক্ষমতায় গেলে যুবক ও তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ডিজিটাল ও নতুন প্রযুক্তিবিষয়ক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানো হবে।
তরুণদের জন্য ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও তাদের আত্মনির্ভরশীল করার জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান নোয়াখালী-২ আসনের বিএনপির প্রার্থী জয়নুল আবদিন ফারুক। তিনি বলেন, ক্ষমতায় গেলে ১৮ মাসের মধ্যে ১ কোটি কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করা হবে। পাশাপাশি চাাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধ বন্ধে তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলবে। ঘুষ, দুর্নীতিমুক্ত ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণে কাজ করবে বিএনপি।
ঢাকা-৭ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হামিদুর রহমান হামিদ বলেন, আমরা তরুণদের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে চাই। যে বাংলাদেশে তরুণ নেতৃত্বও প্রতিষ্ঠিত হবে। বিএনপি সরকার গঠন করলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি তরুণদের উন্নয়নে বেশ কিছু উদ্যোগ নেবে।
ভোরের আকাশ/এসএইচ