শিরোনাম
বিদেশি সহায়তা নয়, বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠনের উদ্যোগবাংলাদেশে হামের প্রকোপ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও পোলিও প্রাদুর্ভাবের ‘সতর্কতা’শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও কমেছে শিক্ষার্থীবিদেশি ঋণ কমেছে ৪২.৩৪%, ছয় উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিশ্রুতি নেইকক্সবাজারে আগুন: ডিএনএ পরীক্ষায় নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত, এখনো নিখোঁজ ১অনলাইন টিকিটের কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ কঠিন: রেলমন্ত্রীনিপ্পন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের নৈশভোজে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রীবিদেশি সহায়তা নয়, বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠনের উদ্যোগবাংলাদেশে হামের প্রকোপ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও পোলিও প্রাদুর্ভাবের ‘সতর্কতা’শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও কমেছে শিক্ষার্থীবিদেশি ঋণ কমেছে ৪২.৩৪%, ছয় উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিশ্রুতি নেইকক্সবাজারে আগুন: ডিএনএ পরীক্ষায় নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত, এখনো নিখোঁজ ১অনলাইন টিকিটের কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ কঠিন: রেলমন্ত্রীনিপ্পন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের নৈশভোজে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রী

১ শতাংশ ভোটারের সমর্থন নিয়ে বিপাকে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা

মাজাহারুল ইসলাম

প্রকাশ : ৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:০৫ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ১২(৩ক)(ক) বিধান অনুযায়ী, নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার এক শতাংশ ভোটারের সমর্থন-সংবলিত স্বাক্ষরযুক্ত তালিকা মনোনয়নপত্রের সঙ্গে যুক্ত করে দিতে হয়। যারা সমর্থন করবেন, সেই তালিকায় তাদের স্বাক্ষর বা টিপসই থাকতে হবে। তবে কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থী ইতিপূর্বে জাতীয় সংসদের কোনো নির্বাচনে সদস্য নির্বাচিত হয়ে থাকলে বা দলীয় প্রার্থী হলে এটা জমা দিতে হবে না। এই বিধানটি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে যুক্ত করা হয় ২০১১ সালে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র যাচাই বাছাইয়ের সময় স্বাক্ষর দানকারী ভোটারকে পাওয়া যায়নি কিংবা তার স্বাক্ষর মিলেনি-এ ধরনের নানা অভিযোগে অনেক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

যাচাই বাছাইয়ের মধ্যদিয়ে মোট ৭২৩ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে, এর মধ্যে ৩৬৬ প্রার্থীই স্বতন্ত্র, যা বাতিল হওয়া প্রার্থীর অর্ধেকেরও বেশি, ৫০ দশমিক ৬২ শতাংশ। বাকি ৩৫৭ প্রার্থী বিভিন্ন নিবন্ধিত দলের হয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। এবারের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে ৪৭৮ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। ৩৬৬ জন বাদ পড়ায় মোট স্বতন্ত্র প্রার্থীর তিন-চতুর্থাংশের বেশি, অর্থাৎ ৭৬ দশমিক ৫৭ শতাংশের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। যদিও গত সোমবার থেকে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে বাদ পড়া সব প্রার্থীর আপিল আবেদন নিচ্ছেন ইসি। তবে সারা দেশে ৩৬৬ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হওয়া দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্লেষকদের মতে, এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরের বিষয়টি নিয়ে বিগত কয়েকটি নির্বাচনের সময়েই অনেক সমালোচনা হয়েছে। এ নিয়ে নানা ধরনের ঘটনাও ঘটেছে বিভিন্ন উপ-নির্বাচনে। প্রতিটি নির্বাচন এবং এর মধ্যবর্তী বিভিন্ন উপ-নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মনোনয়নপত্রের সাথে দেয়া এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর নিয়ে নানা সমস্যা দেখা দেয় বলছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আইনজীবী বলছেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এই এক শতাংশের সমর্থনের বিধানটিই তার মতে আইনসিদ্ধ নয়। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিপাকেও ফেলতেও এ বিধানটির সুযোগ নেয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতে ভোটারের গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে। ভোটার কোন প্রার্থীকে ভোট দেবেন বা দেবেন না, এটি একান্তই তার চিন্তা ও মতপ্রকাশের অধিকার বলে মনে করেন এই বিশ্লেষক।

তিনি বলেন, সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ এই নিশ্চয়তা দিয়েছে। আরপিও-এর ১২(৩ক)(ক) বিধানের কারণে ভোটারের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুন্ন হচ্ছে। কারণ, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরযুক্ত তালিকা দাখিল করতে হচ্ছে। বিধানটি সংবিধানের ২৭, ৩১ ও ৩৯ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
এ প্রসঙ্গে মনোনয়ন বাতিল হওয়া এক প্রার্থী আপিল করেছেন। তিনি বলেন, যে তার কাছে মনে হয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখার কৌশল এটি।

তিনি আরো বলেন, আমার মতো একজন মানুষের এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরে বিষয়ে অভিযোগ তুলে প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে, এটি গুরুতর বিষয়। এ আইনটি পরিবর্তন হওয়া উচিত।

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ভোটারের যে স্বাক্ষর দরকার, এটি অযৌক্তিক।

বদিউল আলম মজুমদার বলেন, যাদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে তাদের বেশিরভাগই স্বতন্ত্র প্রার্থী। আমরা নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্থার কমিশনের পক্ষ থেকে বলেছিলাম, শুধু ৫০০ ব্যক্তির স্বাক্ষরের বাধ্যবাধকতা যেন থাকে এবং এ স্বাক্ষরগুলো যেন হলফনামার মাধ্যমে দেয়া যায়। শনাক্তের ক্ষেত্রে স্বাক্ষরকারীদের চাপ প্রয়োগের অভিযোগ আছে। এর মাধ্যমে জালিয়াতির সুযোগ থেকে যায়। সংস্কার প্রস্তাবটি আরপিওতে সংযুক্ত হলে এ ধরনের কারসাজি করার আর সুযোগ ছিল না। দুর্ভাগ্যবশত নির্বাচন কমিশন এটি আরপিতে অন্তর্ভুক্ত করেনি, যে কারণে এ জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি বলেন, যারা নির্বাচনে অংশ নিতে চান, তাদের প্রার্থিতা অকারণে বাতিল করা হলে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। যাদের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে, তাদের একটি বিরাট অংশ স্বতন্ত্র। স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ভোটারের যে স্বাক্ষর দরকার, এটি অযৌক্তিক।

স্বতন্ত্র প্রার্থী বিধিমালা-২০১১ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলে সংশ্লিষ্ট আসনের মোট ভোটারের এক শতাংশের স্বাক্ষরিত সমর্থন বা টিপসই দাখিল করতে হয়। এই বিধানকে আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ 'কালাকানুন' হিসেবে আখ্যা দিলেও, অন্যপক্ষ একে অহেতুক প্রার্থীর ভিড় কমানোর মোক্ষম উপায় হিসেবে দেখছেন।

গোপনীয়তা ও সমতার বিতর্ক: সংবিধান বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মতে, গোপন ব্যালটে ভোট দেওয়া যেখানে নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার, সেখানে নির্বাচনের আগেই সমর্থনের তালিকা প্রকাশ করা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার নীতির পরিপন্থী। এর ফলে ভোটের আগেই আঁচ করা যায় কে কাকে পছন্দ করছেন। জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের মতে, এই আইনটি সংবিধানের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদের স্পষ্ট লঙ্ঘন, কারণ এটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে বৈষম্য তৈরি করে। যেখানে রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের এমন কোনো সমর্থন দেখাতে হয় না, সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য এটি বাধ্যতামূলক করাকে 'হাস্যকর' ও গণতান্ত্রিক দেশে সমতার অভাব হিসেবে দেখা হচ্ছে।

স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতিকূলতা: এই আইনের কারণে অনেক যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনে দাঁড়াতে অনীহা প্রকাশ করেন, আবার অনেকে দাঁড়ালেও নানা আইনি জটিলতায় পড়েন। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসলিম জারার মনোনয়নপত্র এই স্বাক্ষর জটিলতার কারণেই বাতিল হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক দলের বাইরে যারা নতুনভাবে নির্বাচন করতে চান বা যাদের রাজনৈতিক দল নেই, তাদের নিরুৎসাহিত করতেই এই ব্যবস্থার প্রচলন রাখা হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গণতন্ত্রের স্বার্থে এবং এই বৈষম্য দূর করতে দ্রুত এই বিষয়ে একটি আইনি নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রার্থিতা ফিরে পেতে আপিল করেছেন ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া তাসনিম জারা। তিনি বলেন, বলেন, ‘ঢাকা-৯ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলাম। সেটি গ্রহণ হয়নি। তাই আমরা আপিল করছি এবং আমরা আইনি লড়াই চালিয়ে যাব। আপনারা দেখেছেন, একদম দেড় দিনের মাথায় প্রায় ৫ হাজার মানুষ স্বতস্ফূর্তভাবে আমাদেরকে স্বাক্ষর দিয়েছেন, অনেক ভালোবাসা দিয়েছেন, নিজেরাই স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে বুথ করেছেন। তো এইটার প্রতি সম্মান জানিয়ে আমরা আমাদের আইনি লড়াইটা চালিয়ে যাব। যারা সই করেছেন এত অল্প সময়ে, উনারা চান আমি যেন নির্বাচনে কনটেস্ট করতে পারি। তো সেজন্য আমরা আপিল করেছি। এবং আমরা আইনি প্রক্রিয়ার লড়াইটা চালিয়ে যাব।’

আপিলে জয় পেয়ে ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তাসনীম জারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন তার আইনজীবী আরমান হোসেন। গত ৩ জানুয়ারি ঢাকা জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তা তাসনিম জারার মনোনয়নপত্র বাতিল করেন। ওই সময় তিনি বলেছিলন, নির্বাচন কমিশন মনোনয়ন বাতিলের কারণ হিসাবে জানিয়েছেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ওই আসনের মোট ভোটারের ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর নিতে হয়। এই এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরের চেয়েও আমি প্রায় ২০০ বেশি স্বাক্ষর জমা দিয়েছি। সেখান থেকে নির্বাচন কমিশন ১০ জনের তথ্য যাচাই করতে গিয়েছিলেন, তার মধ্যে ৮ জনের তথ্য সঠিক পেয়েছেন, বাকি ২ জনের সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে ওই দুইজন ঢাকা-৯ এর ভোটার নন, ওই দুইজন জানতেন ঢাকা-৯ এর ভোটার তারা। তাদের ঠিকানা খিলগাঁও হলেও এলাকার কিছু অংশ ঢাকার আরেকটি আসনের সঙ্গে যুক্ত।

এছাড়া গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী সেন্টু আলী এবং গণঅভ্যুত্থানের নেতা ফাতেমা রহমান বীথির মনোনয়নও তুচ্ছ কারণে বাতিল করা হয়েছে। এছাড়াও নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ূম, মিজানুর রহমান এবং সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতনসহ ৩৬৬জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ভোরের আকাশ/এসএইচ

ভোটারনির্বাচন কমিশনমনোনয়নপত্র

শেয়ার করুন: