নির্বাচন পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমান
মানবিক রাষ্ট্র গড়তে ঐক্যের বিকল্প নেই

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’র (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় ও গণতন্ত্রপ্রিয় জনগণ আবারো বিএনপি-কে বিজয়ী করেছে। আলহামদুলিল্লাহ। এ বিজয় বাংলাদেশের, এ বিজয় গণতন্ত্রের, এ বিজয় বাংলাদেশের জনগনের। তিনি বলেন, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় পর দেশে জনগণের সরাসরি ভোটে জবাবদিহিমূলক সংসদ ও সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। গতকাল শনিবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বলরুমে নির্বাচন পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
যেকোন মূল্যে দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করে তারেক রহমান বলেন, কোনো ধরনের সহিংসতা, প্রতিশোধ বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না। তিনি বলেন, জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেট অনুযায়ী দল নির্বাচনী অঙ্গীকার ও ৩১ দফা বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে।
রাষ্ট্র মেরামতের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিএনপি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং অকার্যকর সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহ পুনর্গঠনের মধ্য দিয়েই নতুন যাত্রা শুরু হবে। জনগণের রায় পেলে রাষ্ট্র মেরামতের যে রূপরেখা বিএনপি উপস্থাপন করেছিল, তা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।
রাষ্ট্র মেরামতের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তারেক রহমান বলেন, বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দলের সঙ্গে মতবিনিময়ের ভিত্তিতে প্রণীত ৩১ দফা এবং দলীয় ইশতেহারের প্রতিটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিএনপি কাজ করবে। একইসঙ্গে কয়েকটি বিষয়ে ‘নোট অফ ডিসেন্ট’ দিয়ে বিএনপি জুলাই সনদেও স্বাক্ষর করেছিল। আমরা জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ প্রত্যাশিত প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করব।
জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও গণঅধিকার পরিষদসহ ৫১টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দলকে অভিনন্দন। আমাদের পথ ও মত ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক। জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা। সরকার ও বিরোধী দল দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।
নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, যে কোনো মূল্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে। কোনো রকম অন্যায় বা বেআইনি কর্মকাণ্ড বরদাস্ত করা হবে না।
তিনি বলেন, সম্ভাব্য অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিজয় মিছিল না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। শত উসকানির মুখেও নেতাকর্মীদের শান্ত ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। দলমত, ধর্ম বা ভিন্নমত নির্বিশেষে দুর্বলের ওপর সবলের আক্রমণ মেনে নেওয়া হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলোই মূলত গণতন্ত্রের বাতিঘর। সরকার এবং বিরোধী দল যে যার অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে অবশ্যই দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, প্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ নির্বাচনের অনুষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিশেষ ধন্যবাদ জানান বিএনপির চেয়ারম্যান। একইসঙ্গে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম ও পর্যবেক্ষকদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যারা শহীদ ও হতাহত হয়েছেন, তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। যাদের রক্তের বিনিময়ে আজকের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ, তাদের অবদান জাতি চিরকাল স্মরণ রাখবে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারপারসন মরহুম বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, সারা দেশে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির সর্বস্তরের নেতা-কর্মী সমর্থক ছাড়াও দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের সামনে আজকের এই সময়টি ভীষণ আনন্দের। এমন এক আনন্দঘন পরিবেশে আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি আমাদের ভারাক্রান্ত করে। রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার এমন একটি গণতান্ত্রিক সময়ের প্রত্যাশায় তিনি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়েছিলেন। স্বৈরাচার কিংবা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে কখনোই আপস করেননি। দেশ এবং জনগণের স্বার্থের প্রশ্নে বরাবরই তিনি ছিলেন অটল অবিচল। আমরা আল্লাহর দরবারে মরহুমা খালেদা জিয়ার মাগফিরাত কামনা করছি।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, স্বাধীনতার ঘোষকের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) দেশের জনগণ আবারও রাষ্ট্র পরিচালনার ম্যান্ডেট দিয়েছে। জনগণ বিএনপির প্রতি যে বিশ্বাস এবং ভালোবাসা দেখিয়েছে, এবার মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য নিরলস কাজের মাধ্যমে জনগণের এ বিশ্বাস ও ভালোবাসার প্রতিদান দেওয়ার পালা। আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যেতে হবে।
বিএনপির সর্বস্তরের নেতা-কর্মী সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, শত নির্যাতন নিপীড়নের পরও আপনারা রাজপথ ছাড়েননি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অটুট-অনড় ছিলেন। এবার দেশ গড়ার পালা। দেশ পুনর্গঠনের এই যাত্রায় আপনি আমি আমাদের প্রত্যেককে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। আমরা গণতন্ত্র এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এই বিজয়কে শান্তভাবে দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে উদ্যাপন করেছি। নির্বাচনোত্তর বাংলাদেশে যাতে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে এ জন্য শত উসকানির মুখেও আমি সারা দেশে বিএনপির সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের শান্ত এবং সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।
দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তারেক রহমান বলেন, এখন দেশ গড়ার পালা। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং জনগণের প্রতি জবাবদিহিতার মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখতে হবে। সবশেষে বিশ্বের গণতান্ত্রিক শক্তি, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং দেশের স্বাধীনতাপ্রিয় জনগণকে আবারো অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানান তারেক রহমান। বক্তব্য শেষে তারেক রহমান দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাব দেন।
জনগণকে কনভিন্স করাই বিএনপির ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং: দুইশ’র বেশি আসন পেতে আপনাকে ইঞ্জিনিয়ারিং করতে হলো কি না- সাংবাদিক খালিদ মুহিউদ্দীনের এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, জনগণকে কনভিন্স করাই বিএনপির ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং।
আমরা অবশ্যই সার্ক পুনরুজ্জীবিত করতে চাইব: পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম জিও নিউজের এক প্রতিবেদক প্রশ্নের জবাবে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, বিএনপি সরকার গঠনের পর অবশ্যই দক্ষিণ এশিয়া সহযোগিতা সংস্থা সার্ক পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশই সার্কের উদ্যোক্তা ছিল। তাই স্বাভাবিকভাবেই আমরা চাইব সার্কের পুনরুজ্জীবন। বিএনপি সরকার গঠনের পর এই বিষয়ে উদ্যোগ নেবে। এই বিষয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে কথা বলবে সরকার।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে: সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুতে বিএনপি অবস্থান জানতে চাওয়া ভারতের এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে। সংবাদ সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ইসমাঈল জবিউল্লাহ। অনুষ্ঠানে সমাপনি বক্তব্য দেন স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।
এছাড়া স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, বেগম সেলিমা রহমান, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ড. মওদুদ আহমেদ পাভেল, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, জয়নুল আবেদিন, শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, আন্তর্জাতিক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসির উদ্দীন আহমেদ অসীম, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন প্রমূখ উপস্থিত ছিলেন।
ভোরের আকাশ/এসএইচ