ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
আইনি লড়াইয়ে প্রার্থীরা

আর মাত্র ৩৫ দিন পরই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে যাচাই-বাছাইয়ের মধ্যদিয়ে ৭২৩ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা।
ইসি সূত্রে জানা যায়, বিএনপির ২৫, জামায়াতে ইসলামীর ১০, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ৩, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ৩৯, জাতীয় পার্টির (জাপা) ৫৯, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) ২৫ এবং স্বতন্ত্র ৩৩৮ জন প্রার্থীর মনোনয়পত্র বাতিল হয়। আপিলের প্রথম দিন মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া ৭২৩ জনের মধ্যে ৪২ জন আপিল করছেন। প্রার্থিতা টিকিয়ে রাখতে আইনি লড়াইয়ে রয়েছেন প্রার্থীরা। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে বাদ পড়া প্রার্থীরা আপিল করতে পারবেন ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত।
ইসির তথ্য অনুযায়ী, ৩০০টি আসনে এক হাজার ৮৪২ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়। যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় ৭২৩টি মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। হলফনামায় তথ্যে গলদ, তথ্য গোপন, ঋণখেলাপি, দ্বৈত নাগরিকত্বের জটিলতা, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে সমর্থনকারী ভোটারের তথ্যে গরমিলসহ নানা অসংগতির কারণে এসব প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। তবে মনোনয়ন বাতিল হওয়া প্রার্থীরা অনেকেই নিজেদের প্রার্থিতা টিকিয়ে রাখতে আপিলের সুযোগ নিচ্ছে বলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।
বাদ পড়া প্রার্থীদের ভাগ্য নির্ধারণ: ১০ জানুয়ারি শুরু হয়ে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে আপিল নিষ্পত্তি। তবে, বাদ পড়া প্রার্থীরা মনে করেন, তাদের মনোনয়ন বৈধ ছিল এবং তারা আইনি প্রক্রিয়ায় তাদের অধিকার ফিরে পেতে চান, তাই আপিল করছেন। অথাৎ প্রার্থিতা রক্ষায় সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখছেন প্রার্থীরা।
প্রার্থিতা ফিরে পেতে আপিল করা একাধীক স্বতন্ত্র প্রার্থী বলেন, সংসদ নির্বাচনের প্রার্থিতা ফিরে পেতে আপিল করেছেন। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসি ভবনে গিয়ে গতকাল আপিল করেন।
এ প্রসঙ্গে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী বলেন, আমরা আপিল করছি এবং আমরা আইনি লড়াই চালিয়ে যাব।
ইসি সূত্রে আরো জানা গেছে, প্রার্থিতা বাতিল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) ৭ নির্দেশনা মেনে আপিল করা যাবে।
নির্দেশনাগুলো হলো-
১. আপিল আবেদন কমিশনকে সম্বোধন করে স্মারকলিপি আকারে (নির্ধারিত ফরমেটে) দায়ের করতে হবে।
২. আপিল দায়েরকালে মনোনয়নপত্র গ্রহণ বা বাতিলের তারিখ, আপিলের কারণ সংবলিত বিবৃতি এবং মনোনয়নপত্র বাতিল বা গ্রহণ আদেশের সত্যায়িত কপি দাখিল করতে হবে।
৩. আপিল আবেদনের ১টি মূল কপিসহ সর্বমোট সাতটি কপি দাখিল করতে হবে।
৪. আপিল আবেদন নির্বাচন কমিশনের আপিল আবেদন গ্রহণ সংক্রান্ত কেন্দ্রে নিজ নিজ অঞ্চলের নির্ধারিত বুথে জমা দিতে হবে।
৫. আপিল আবেদন ৫ জানুয়ারি ২০২৬ হতে ৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের মধ্যে দায়ের করতে হবে।
৬. আপিল কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত বা রায়ের কপির জন্য নির্ধারিত ফরমে আবেদন দাখিল করতে হবে। ফরমের নমুনা নির্বাচন কমিশনে আপিল দায়ের সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় বুথ থেকে সংগ্রহ করা যাবে।
৭. আপিল দায়েরকারী অথবা আপিল দায়েরকারীর পক্ষে মনোনীত ব্যক্তি আপিলের রায়ের কপি সংগ্রহ করতে পারবেন।
সরেজমিনের চিত্রে দেখা যায়, মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া হেভিওয়েট প্রার্থী থেকে শুরু করে স্বতন্ত্রসহ সব পর্যায়ের নেতারাই প্রার্থিতা ফিরে পেতে আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়েছেন। প্রার্থীরা তাদের প্রার্থিতা রক্ষায় আপিল করছেন কারণ এটি তাদের বৈধভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পদক্ষেপ।
প্রার্থিতা বাতিলের সিদ্ধান্তকে ‘অন্যায্য’ দাবি করে অনেকে বলছেন, আশা করছি, কমিশন তাঁদের ন্যায়বিচার দেবে। আপিল প্রার্থীদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার শেষ সুযোগ এবং অনেক ক্ষেত্রে আপিলের ফল তাদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে মনে করছেন তারা। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রার্থিতা ফিরে পেতে আপিল করেছেন ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া তাসনিম জারা। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গতকাল সোমবার নির্বাচন কমিশন ভবনে গিয়ে ঢাকা অঞ্চলের বুথে আপিল করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক এ নেত্রী।
আপিল প্রক্রিয়া শেষে তিনি বলেন, ঢাকা-৯ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলাম। সেটি গ্রহণ হয়নি। তাই আমরা আপিল করছি এবং আমরা আইনি লড়াই চালিয়ে যাব।
তিনি বলেন, আপনারা দেখেছেন, একদম দেড় দিনের মাথায় প্রায় ৫ হাজার মানুষ স্বতস্ফুর্তভাবে আমাদেরকে স্বাক্ষর দিয়েছেন, অনেক ভালোবাসা দিয়েছেন, নিজেরাই স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে বুথ করেছেন। তো এইটার প্রতি সম্মান জানিয়ে আমরা আমাদের আইনি লড়াইটা চালিয়ে যাব। যারা সই করেছেন এত অল্প সময়ে, উনারা চান আমি যেন নির্বাচনে কনটেস্ট করতে পারি। তো সেজন্য আমরা আপিল করেছি। এবং আমরা আইনি প্রক্রিয়ার লড়াইটা চালিয়ে যাব। আপিলে জয় পেয়ে ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তাসনীম জারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন তার আইনজীবী আরমান হোসেন। গত ৩ জানুয়ারি ঢাকা জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তা তাসনিম জারার মনোনয়নপত্র বাতিল করেন।
বাতিল হওয়া প্রার্থী: মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের শেষ দিন রোববার কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসনে জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব (বর্তমান আনিসুল ইসলাম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন জাপার নির্বাহী চেয়ারম্যান) মুজিবুল হক চুন্নুর মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। বেশ কিছু জেলায় বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। শেষ দিনে জামায়াতের তিনজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কুড়িগ্রাম-৩ আসনের প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে দ্বৈত নাগরিকত্ব জটিলতায়। আর নেত্রকোনা-৫ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাসুম মোস্তফার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে একটি মামলার তথ্য গোপন করে নিজেকে খালাস দেখানোর কারণে। দ্বৈত নাগরিকত্ব জটিলতায় চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এ কে এম ফজলুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়।
ইসি জানিয়েছে, খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করায় ওই তিন (ফেনী-১, বগুড়া-৭ ও দিনাজপুর-৩ আসন) আসনে তাঁর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে রাখা হয়নি। চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগরের ১৬টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে ১৪৩ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। তবে বাছাই শেষে বাতিল হয়েছে ৪২ জনের মনোনয়নপত্র। প্রার্থিতা টিকেছে ১০১ জনের। গতকাল চট্টগ্রামে ৭টি আসনে ১৬ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। ফরিদপুর-১ আসনের ১৫ জন প্রার্থীর মধ্যে ৮ জনের মনোনয়নপত্র প্রথমে স্থগিত করা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সংশোধনী জমা দিতে সক্ষম হওয়ার তাঁদের মধ্যে ৭ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। দ্বৈত নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত কারণে সিলেটের তিনটি আসনের তিনজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র এর আগে স্থগিত করা হয়েছিল। বিষয়টি খতিয়ে দেখার পর শেষ দিনও তাঁদের মধ্যে দুজনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়। তাঁরা হলেন সিলেট-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী এম এ মালিক ও সিলেট-৬ আসনে গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী জাহিদুর রহমান। তবে সিলেট-১ আসনে এনসিপির প্রার্থী এহতেশামুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
এর আগে শুক্রবার বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। তবে ঢাকা-১৮ আসনে তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষিত হয়েছে। ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারার মনোনয়নপত্র শনিবার বাতিল হয়। কক্সবাজার-২ আসনে জামায়াতের প্রার্থী এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয় গত শুক্রবার। রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূমের মনোনয়নপত্র বাতিল হয় শনিবার (কিশোরগঞ্জ-৫)। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) অনেক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে দলের নতুন নেতৃত্ব সংক্রান্ত তথ্য নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থায় হালনাগাদ না হওয়ায়।
ভোরের আকাশ/এসএইচ