সাংবাদিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তারেক রহমান
মতপার্থক্য যেন পরিনত না হয়

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, যেকোনো মূল্যে দেশকে গণতান্ত্রিক ধারায় রাখতে হবে। মতপার্থক্য থাকবে তবে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। আমাদের সবার মনে রাখতে হবে, মতপার্থক্য যেন মতবিরোধে পরিণত না হয়। তিনি বলেন, বিগত সরকারের আমলে মতবিরোধের বাজে দৃষ্টান্ত দেখেছে দেশ। কাজেই। ১৯৭১, ৯০ এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের অর্জন সামনে রেখে সবাই মিলে কাজ করলে দেশ এগিয়ে যাবে। হিংসা প্রতিশোধের পরিণতি কি হতে পারে, সেটা আমরা দেখেছি ২০২৪, ৫ আগস্ট। তাই আমরা ৫ আগস্টের আগের পরিস্থিতিতে ফিরতে চাই না। ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে আর কোনো প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধের রাজনীতি দেখতে চান না। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক, তবে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিভেদ দূর করে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখাই সময়ের দাবি। এক্ষেত্রে মতপার্থক্য ভুলে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। সবাই মিলে কাজ করতে হবে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশ গণতন্ত্রের দিকে যাবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

গতকাল শনিবার রাজধানীর বনানীস্থ হোটেল শেরাটনের বলরুমে সাংবাদিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েই সাংবাদিকদের কাছে গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন বিএনপির চেয়ারম্যান। এ সময় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার সঙ্গে ছিলেন।
তারেক রহমান বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় ৫ আগস্টের আগে ফিরে তাকানোর সুযোগ নেই। দেশের মানুষ স্বপ্ন দেখছে, সকল আশা হয়তো পূরণ করা সম্ভব নয়, তবে সবাই যদি স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের জন্য কাজ করি তাহলে জাতিকে সঠিক পথে নিয়ে যেতে পারবো।
দেশে না থাকলেও সারাক্ষণ মন ছিল দেশের সঙ্গেই: তারেক রহমান বলেন, আমি দেশে না থাকতে পারলেও সারাক্ষণ যোগাযোগ রেখেছি। সবার তথ্য রাখার চেষ্টা করেছি। গত ১৬ বছরে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের কথা আমি জানি। পাশপাশি আমার নেতাকর্মী এবং আমার মা নির্যাতনের শিকারের বড় উদাহরণ।
জাতিকে সঠিকপথে পরিচালিত করার প্রত্যাশা: বিএনপি সরকার গঠন করলে জাতিকে সঠিকপথে পরিচালিত করবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, আমাদের সমস্যা ছিল, আমাদের সমস্যা আছে। ঐক্যবদ্ধভাবেই দেশের সকল সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
তিনি আরও বলেন, আমি আমার অবস্থান থেকে যদি চিন্তা করি আমার এক পাশে ১৯৮১ সালের একটি জানাজা; একই সাথে আমার এক পাশে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের একটি জানাজা; আর আমার আরেক পাশে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের একটি ঘটনা। কাজেই আমার মনে হয় এটি শুধু বোধহয় আমার একার জন্য নয়, যারা আমার দলের নেতাকর্মী সদস্য এবং সামগ্রিকভাবে পুরা দেশের মানুষের সামনে এই দুটি উদাহরণ বোধহয় সবচাইতে বাদ বিবেচনা করার জন্য সবচাইতে ভালো উদাহরণ যে আসলে ৫ আগস্টের আগে ফিরে যাওয়ার কোনোই কারণ নেই আমাদের।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, মতবিভেদ হলে, বিভেদ হলে জাতিকে বিভক্ত করে ফেললে কী হতে পারে আমরা দেখেছি। আজকে সেজন্যই অনেকের মুখে অনেক হতাশার কথা আমরা শুনি; কিন্তু তার পরও আশার কথা হচ্ছে যে, তাদের কাছে ভবিষ্যতের চিন্তাও আছে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা আছে।
তিনি বলেন, আমার দেশে ফিরে আসার পরে আমি যে কয়বার আমার বাইরে যাওয়ার একটু বেশি সুযোগ হয়েছে, আমি সাভারে গিয়েছিলাম, আরও কয়েকটি জায়গায় গিয়েছিলাম। আমার কাছে মনে হয়েছে নতুন প্রজন্ম একটি গাইডেন্স চাইছে, নতুন প্রজন্ম একটি আশা দেখতে চাইছে। শুধু নতুন প্রজন্ম নয়, আমার কাছে মনে হয়েছে, প্রত্যেকটি প্রজন্মই মনে হয় কিছু একটি গাইডেন্স চাইছে। আমরা যারা রাজনীতিবিদ করি, আমাদের কাছে হয়তো অনেক প্রত্যাশা; সকল প্রত্যাশা হয়তোবা পূরণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা রাজনীতিবিদরা যদি ১৯৭১ সাল, ১৯৯০ সাল, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট এই সবগুলোকে আমাদের সামনে রেখে আমরা যদি দেশের স্বাধীনতা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য কাজ করি, তাহলে নিশ্চয়ই আমার কাছে মনে হয়, একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমরা জাতিকে একটি সঠিক ডাইরেকশনে নিয়ে যেতে সক্ষম হব।
কৃষকদের সহায়তার জন্য কৃষি কার্ড চালুর ভাবনা: তারেক রহমান বলেন, কৃষকদের সহায়তার জন্য কৃষি কার্ড চালুর ভাবনা রয়েছে। দেশে দেড় কোটির মতন কৃষক আছেন। এত বিশাল সংখ্যক মানুষ- যারা ২০ কোটি মানুষের খাওয়া পরার ব্যবস্থা করছে, খাওয়ার-অন্নের সংস্থান করছে সেই এত বড় সমাজটাকে কীভাবে সাপোর্ট দেওয়া যায়। তাদের হয়তো সেভাবে বলার সুযোগ নেই। এখানে আপনারা সংবাদপত্রের যারা কর্মী আছেন, আপনারা আপনাদের কিছু সমস্যার কথা বলেছেন। আপনাদের সমস্যাটা আমাদের জন্য শুনতে জানতে সহজ হয় বিকজ আমাদের জন্য একটা ভেন্যু আছে, যেখানে আমরা আলাপ করতে পারি। কিন্তু ওই কৃষকগুলো যাদের কোনো ভেন্যু নেই যারা এরকম একটা প্রোগ্রাম অর্গানাইজ করতে পারছে না তারা কীভাবে বলবে কথাগুলো। কাজেই তাদের কথা তো আমাদের জানতে হবে।
দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীর অবদানের কথা তুলে ধরে তার বড় ছেলে তারেক বলেন, মরুহুমা বেগম খালেদা জিয়া নারীদের শিক্ষার ব্যাপারটা নিশ্চিত করেছিলেন। পরবর্তীতে আগামী নির্বাচনে ইনশাল্লাহ জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আমরা সরকার গঠনে সক্ষম হলে আমাদের একটি পরিকল্পনা রয়েছে: এই নারীরাই শিক্ষিত হয়েছে, এদেরকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা।
৪ কোটি পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু প্রস্তাব: দেশের প্রায় ৪ কোটি পরিবারের জন্য একটি যুগান্তকারী ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর প্রস্তাব দেন তারেক রহমান। এই পরিকল্পনার মূল কেন্দ্রে থাকবেন পরিবারের গৃহিণীরা। সেটির লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য হচ্ছে, সেটাই এই নারী সমাজকে গড়ে তোলা। আমাদের হিসাব মতে বাংলাদেশে ৪ কোটি ফ্যামিলি আছে। আমরা যদি পরিবার হিসেবে ভাগ করি, এভারেজে একটি পরিবারে ৫ জন করে সদস্য ধরা হয়েছে। কার্ডের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের গৃহিণী ৫ থেকে ৭ বছর আর্থিক বা খাদ্য সহায়তা পাবেন বলে জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে নারীদের হাতে অর্থ থাকলে তা মূলত স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগে ব্যয় হয়, যা পরিবার ও স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। তিনি আরও জানান, এই সুবিধা হবে সর্বজনীন, যাতে দলীয় পরিচয় বা শ্রেণিবিভাগের কারণে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা বৈষম্যের সুযোগ না থাকে। স্বাস্থ্যখাতে ‘প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা’ ও নতুন কর্মসংস্থান: স্বাস্থ্যখাতে আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে উন্নত বিশ্বের আদলে ‘প্রিভেনশন’ বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর জোর দেন বিএনপির চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, জনগণকে রোগে আক্রান্ত হওয়ার আগেই সচেতন করতে প্রায় ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এই স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ হবেন নারী। তারা ঘরে ঘরে গিয়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবেন। এর ফলে একদিকে জনস্বাস্থ্য উন্নত হবে, অন্যদিকে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, একটি বড় সমস্যা হচ্ছে হেলথ ইস্যু। বাংলাদেশে ২০ কোটি মানুষ। আমরা স্লোগান দিয়ে হয়তো বলতে পারি যে, ‘সকলের জন্য স্বাস্থ্যের ব্যবস্থা করব, আমরা সকলকে স্বাস্থ্য সুবিধা দেব। যেকোনো ধরনের সেটি বাইপাস হোক, কার্ডিয়াক হোক, ক্যান্সার হোক, সবরকম চিকিৎসা ইউকে দেয়। এখন আমরা কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে যে, এই কাজটা করতে গিয়ে ইউকের মতন দেশগুলো ইউরোপের যে ডেভেলপ দেশগুলো আছে তারা হিমশিম খাচ্ছে। তারা এখন যেটাতে চাচ্ছে সেটা হচ্ছে প্রিভেনশন। কিন্তু যদি প্রিভেনশন করা হয়, মানুষকে যদি সচেতন করা হয় যে, এই এই খাবারগুলো খেও না, তাহলে তুমি কিডনি প্রবলেম হবে না। এই খাবারগুলো খেও না, তাহলে তোমার হার্ট প্রবলেম হবে না। এই খাবারগুলো খেও না, তাহলে তোমার ডায়বেটিক হবে না। মানুষকে যদি এভাবে সচেতন করা যায় তাহলে দেখা গেছে, তাতে রাষ্ট্রের খরচ অনেক কমে আসে, মানুষও সুস্থ থাকে। এবং এটার উপর বেস করে যেহেতু ইউরোপেই এই কাজটা চলছে, এটার ওপর বেস করে আমরা হেলথ কেয়ারার অ্যাপয়েন্ট করতে চাই।
নারীদের নিরাপত্তা বিষয়ে এক নারী সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, শুধু নারীর নয়- নারী ও পুরুষ সবারই নিরাপত্তা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় সাত হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যা অস্বাভাবিক। কোনো বছর কম, কোনো বছর বেশি হলেও এমন ঘটনা কেন ঘটছে-তা নিয়ে রাজনীতিবিদদের গভীরভাবে ভাবা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দেশের পানি দূষণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একের পর এক নদী দূষণ হচ্ছে। এর সমাধান নিয়ে সংসদে এবং সেমিনারে আলোচনা হওয়া উচিত।
সাংবাদিকদের কাছে গঠনমূলক সমালোচনা প্রত্যাশা করে তারেক রহমান বলেন, আমরা ইনশাল্লাহ দেশের মানুষের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনে সক্ষম হলে যাতে আপনাদের কাছ থেকে আপনাদের কাছ থেকে এমন ধরনের আলোচনা-সমালোচনা আমরা পাই, যেটা আমাদেরকে সাহায্য করবে দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে। শুধু সমালোচনা- সমালোচনা করার জন্য নয়। আপনাদের কাছ থেকে এমন সমালোচনা আমরা পাই, যাতে আমরা দেশের মানুষের যে সমস্যাগুলো আছে- সেই সমস্যাগুলো যাতে আমরা সমাধান করতে সক্ষম হই।
অনুষ্ঠানে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, মেজর অব. হাফিজ উদ্দিন আহমেদসহ সিনিয়র নেতৃবৃন্দসহ সম্পাদক ও সিনিয়ির সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
ভোরের আকাশ/এসএইচ