শত্রু-মিত্রের খেলায় বিএনপি-জামায়াত

জাতীয় সংসদের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এক বিচিত্র সমীকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একসময়ের রাজপথের মিত্র বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এখন জাতীয় সংসদের দুই বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। একদিকে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায়, অন্যদিকে বিরোধী দল জামায়াত। তবে এই ‘সরকারি দল বনাম বিরোধী দল’ সম্পর্কের আড়ালে চলছে এক গভীর কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা ‘পার্লামেন্ট গেম’, যেখানে দুই পক্ষই কখনো সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে, আবার কখনো একে অপরকে রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করার সুযোগ খুঁজছে। এ যেন শত্রু-মিত্রের খেলায় বিএনপি-জামায়াত- এমনটাই বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজনরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গত কয়েকদিন ধরে ‘গুপ্ত’ শব্দ নিয়ে সংসদ ও রাজপথে চলছে বাগযুদ্ধ সরকারি দল বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াত জোটের মধ্যে। বিএনপি-জামায়াত জোট সংসদ সদস্যদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে দুই দলের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চলছে। কখনো তারা একে অপরের পরিপূরক, আবার কখনো চরম দূরত্ব বজায় রাখছে দুই পক্ষ। তবে এটি আদর্শিক সংঘাত নাকি কৌশলগত দূরত্ব- ভাবছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তারা মনে করছেন, বিএনপি যখন সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ব্যস্ত, জামায়াত তখন সংসদের ভেতর ও বাইরে ছায়াসঙ্গী হওয়ার বদলে নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সত্তা জাহির করতে মরিয়া। জামায়াত এখন একটি শক্তিশালী দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে।
সংসদীয় অধিবেশনে দেখা যাচ্ছে, জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জামায়াত সরকারের কড়া সমালোচনা করছে। বিশেষ করে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রশ্নে জামায়াত সদস্যরা বিএনপির কঠোর সমালোচনা করতে দ্বিধা করছেন না। তবে এই সমালোচনার ধরনটি বেশ কৌশলি।
রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় সংঘর্ষের সম্ভাবনা কম; বরং সামনে থাকবে অবস্থান জানানোর রাজনীতি। সবমিলিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আপাতত মুখোমুখি সংঘাতের চেয়ে নিয়ন্ত্রিত চাপ, পালটা চাপ এবং অবস্থান তৈরির রাজনীতিই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনরা।
সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী অতীত ইতিহাস তা আমরা সবাই খুব ভালো করে জানি। সে কারণেই সমগ্র জাতি অত্যন্ত সচেতনভাবে তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং আগামীতে যেন তাদের রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি নির্মূল করা যায় সেভাবে আমাদেরকে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেছেন, বিএনপি ইঞ্জিনিয়ারিং করে ক্ষমতায় এসেছে। আমি এটার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি, প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং তিনি বা তার দল যে কখনই সুস্থভাবে চিন্তা করেন না তা প্রমাণিত হয়েছে।
বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, সমগ্র পৃথিবীর দেশ থেকে যারা অবজারভার এসেছিল, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো, পত্রপত্রিকা মিডিয়া একবাক্যে স্বীকার করেছে যে, এই নির্বাচনটি ছিল বাংলাদেশের জন্মের পর থেকে সবচেয়ে নিরপেক্ষ, অবাধ এবং সুষ্ঠু। এবং সেই সুষ্ঠু বিচারের মধ্য দিয়েই বিএনপি তার জনপ্রিয়তার প্রমাণ দিয়ে ২১৩টি আসন লাভ করে সরকার গঠন করার সুযোগ পেয়েছে। সুতরাং জামায়াতে ইসলামীর আমিরের এই বক্তব্য আমি আবার প্রত্যাখ্যান করছি শুধু নয়, নিন্দা জানাচ্ছি এবং ক্ষোভ প্রকাশ করছি।
তিনি বলেন, আজকে বিভিন্নভাবে বিএনপির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের উপরে প্রচারণা চালানো হচ্ছে ওই শক্তিটির (জামায়াতে ইসলামী) পক্ষ থেকে। চেষ্টা হচ্ছে একটা ধূম্রজাল সৃষ্টি করা, একটা বিভেদ সৃষ্টি করার। আমরা ৫ আগস্টের পরে যে সুযোগ পেয়েছি বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার, সেই সুযোগ ও প্রচেষ্টাকে নষ্ট করে দেওয়ার মাধ্যমে আবার একটা ফ্যাসিস্ট শাসনের পাঁয়তারা তারা (জামায়াত) করছে কি না সেটা আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে। ভিন্নভাবে দেশকে আবার স্বৈরাচারের মধ্যে তারা নিতে চায় কি না সেটাও আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বিনষ্ট করার জন্য একটি পক্ষ প্রথম থেকেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনের আগে থেকেই অফুরন্ত মিথ্যাচার, প্রোপাগান্ডা, ফেক ইনফরমেশন, সোশ্যাল মিডিয়াকে অন্যায়ভাবে, অনৈতিকভাবে ব্যবহার করে বিএনপিকে জনগণের কাছ থেকে সরিয়ে দেওয়ার একটা প্রচেষ্টা চলেছে। কিন্তু সেটা সক্ষম হয়নি, সফল হয়নি।
তিনি বলেন, এখনো আবার দেখেন; যে সমস্ত কার্টুন করে তারা দিচ্ছে এবং সেগুলোকে নিয়ে গিয়ে যে প্রচেষ্টা তৈরি করছে খুব স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, ওই শক্তি বাংলাদেশকে আবার অস্থিতিশীল করতে চায়। আমরা এই প্রচেষ্টার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং ছাত্র রাজনীতিতে এ ধরনের একটা অবস্থা তৈরি করার যে প্রচেষ্টা করা হচ্ছে আমরা তারও নিন্দা জানাচ্ছি। আমি আশা করব যে, যে সব পক্ষ এই ধরনের অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছেন তার বিরুদ্ধে তারা থাকবেন। কারণ বাংলাদেশের স্বাধীন সচেতন ছাত্রসমাজ বরাবরই অপরাজনীতিকে পরিহার করেছে এবং জনগণও অপরাজনীতি পরিহার করেছে। আমরা এবারো দেখব যে জনগণ এগুলোকে প্রতিরোধ করবে এবং তাদেরকে পরিহার করবে।
এদিকে, জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিএনপি পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিবাদের রাস্তা ধরে হাঁটা শুরু করেছে। রাষ্ট্রের মৌলিক যেসব জায়গায় পরিবর্তন দরকার, সুশাসন কায়েমের জন্য, সত্যিকারের স্বাধীনতার স্বাদ জনগণকে দেয়ার জন্য, প্রত্যেকটি বিষয়ে বিএনপি বিরোধিতা করে চলেছে। এটি জাতির সাথে সুস্পষ্ট প্রতারণা।
জামায়াতের আমির আরো বলেন, সংসদে আমরা প্রথম দিনেই দাবি তুলেছি সংস্কার পরিষদ গঠনের। আমরা শপথ নিয়েছি, তারা শপথ নেন নাই। জাতির সাথে দেওয়া ওয়াদা ভঙ্গ করে তারা প্রতারণা করেছেন। এরপরে যখন জাতিকে প্রতারিত করা হয়েছে, আমরা নোটিশ দিয়ে আলোচনার ব্যবস্থা করেছি। তারা তার বিরোধিতা করেছে। যে আইনগুলো সংশোধন না হলে অধ্যাদেশ বাস্তবায়ন না হলে, ফ্যাসিবাদী শাসনের পরিবর্তন হবে না তার সবগুলো আগের স্বৈরাচারী সরকারের মতো রাখার পক্ষে তারা অবস্থান নিয়েছে।
তিনি বলেন, সম্প্রতি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, এমনকি আইনের আশ্রয়স্থল থানার ভেতরে ঢুকে দুঃখজনকভাবে ডাকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ওপরে হামলা করা হয়েছে। নেত্রকোনায় আমাদের এক এমপি ও তার গাড়ির ওপর হামলা হয়েছে। বার্তা পরিষ্কার, যেদিন তারা গণভোটের রায় অস্বীকার করেছে আমি বলেছিলাম বিএনপি আজ থেকে ফ্যাসিবাদের পথে যাত্রা শুরু করল।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এ বাংলাদেশ আমরা চাই না। আমরা পরিবর্তনের বাংলাদেশ চাই। আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আমাদের সন্তানদের হাতে দা-কুড়াল দেখতে চাই না। আমরা খাতা-কলম দেখতে চাই। কোনো আদুভাই, দাদুভাই, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে আমাদের সন্তানদের পথ আটকাবে, আমরা এটা দেখতে চাই না। এ সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। যদি বন্ধ না করেন, মনে রাখবেন জুলাই শুধু ২৪ সালে ছিল না। জুলাই প্রত্যেক বছরে আসে। সে জুলাই আবার ফিরে আসবে। তখন ফাইনালি ফ্যাসিবাদের কবর রচনা হবে। শুভ বুদ্ধির উদয় হোক, জনগণের রায়ের প্রতি সম্মান দেখান। ৭০ ভাগ মানুষের রায় মেনে নিন। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন যদি না করেন, আমাদের লড়াই সংসদের ভেতরেও চলবে, খোলা ময়দানেও চলবে ইনশাআল্লাহ।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো সরকার মাত্র দুই মাসে এতটা অজনপ্রিয় হয়নি। আমরা জানি না, আগামী ছয় মাসে তাদের কী পরিণতি হবে। আমরা কোনো অস্থিতিশীলতা চাই না। আমাদের দাবি একটাই, গণভোটের আলোকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন। আমরা সেটার জন্য রাজপথে এবং সংসদে আছি। ঐক্যবদ্ধভাবে আমরা এ দাবি আদায় করে ছাড়বো।
এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, বাংলাদেশের প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানকে বিএনপি যে নতুন করে দলীয়করণ করছে, এর মাধ্যমে তারা আওয়ামী লীগের পথেই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বিএনপি যদি আওয়ামী লীগের পথে, পুরনো স্বৈরাচারের পথে এ দেশকে এগিয়ে নিতে চায়, তাহলে বাংলাদেশের জনগণ আবারো রুখে দাঁড়াবে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড দিয়ে জনগণকে ভোলানোর চেষ্টা করছে; কিন্তু এ কার্ড দিতে দিতে তাদের জ্বালানি ফুরিয়ে গেছে, তেল ফুরিয়ে গেছে।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। আমরা গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য জনগণকে সাথে নিয়ে আবার দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলব। যেসব সাংবিধানিক কাঠামো ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার জন্য দায়ী, তার প্রত্যেকটি সংস্কারের জন্য যে প্রস্তাবনা, তাতে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে বিএনপি।
ভোরের আকাশ/নি