শিরোনাম
বিদেশি সহায়তা নয়, বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠনের উদ্যোগবাংলাদেশে হামের প্রকোপ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও পোলিও প্রাদুর্ভাবের ‘সতর্কতা’শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও কমেছে শিক্ষার্থীবিদেশি ঋণ কমেছে ৪২.৩৪%, ছয় উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিশ্রুতি নেইকক্সবাজারে আগুন: ডিএনএ পরীক্ষায় নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত, এখনো নিখোঁজ ১অনলাইন টিকিটের কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ কঠিন: রেলমন্ত্রীনিপ্পন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের নৈশভোজে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রীবিদেশি সহায়তা নয়, বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠনের উদ্যোগবাংলাদেশে হামের প্রকোপ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও পোলিও প্রাদুর্ভাবের ‘সতর্কতা’শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও কমেছে শিক্ষার্থীবিদেশি ঋণ কমেছে ৪২.৩৪%, ছয় উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিশ্রুতি নেইকক্সবাজারে আগুন: ডিএনএ পরীক্ষায় নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত, এখনো নিখোঁজ ১অনলাইন টিকিটের কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ কঠিন: রেলমন্ত্রীনিপ্পন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের নৈশভোজে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রী

জামায়াতের সোনালি সময়

সিরাজুল ইসলাম

প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০১ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী ফুরফুরে মেজাজে রয়েছে। দলটির ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। নানা প্রতিশ্রুতি আর আশ্বাস দিয়ে তারা মানুষের মন জয় করার চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে তারা অনেকটা সফলও হয়েছে। অতীতের যেকোনো সময়ের নির্বাচনের চেয়ে তারা ভালো ফলাফল করবে- এটা মোটামুটি নিশ্চিত। সরকার গঠন করতে না পারলেও তারা বিরোধী দলের আসনে বসবেন।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন ইমদাদুল হক। ভোট দিতে তিনি যাচ্ছেন ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় নিজ বাড়িতে। এ জন্য তাকে বেশ ধকল পোহাতে হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার আলাপচারিতায় তিনি বলেন, এবার তিনি প্রথম ভোট দেবেন। মনে অনেক উৎসাহ। এ কারণে তিনি দুর্ভোগ স্বীকার করেই বাড়ি যাচ্ছেন। কোন দলকে ভোট দেবেন- এমন প্রশ্নে রাখঢাক না রেখেই তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীকে তিনি ভোট দেবেন। জামায়াতে ইসলামী কেন তার পছন্দের, তা-ও ব্যাখ্যা করলেন সাবলীলভাবে। তিনি বললেন, অতীতে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও বিএনপি দেশ শাসন করেছে। এবার জামায়াতকে সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। তাদের শাসনব্যবস্থাও আমরা দেখতে চাই। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার পরিবহন শ্রমিক রুবেল মিয়া এবার প্রথম ভোট দেবেন। তিনিও জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দিতে চান। কারণ হিসেবে তিনি বললেন, জামায়াত ক্ষমতায় এলে চাঁদাবাজি থাকবে না বলে তিনি মনে করেন। এছাড়া আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি দেশ শাসন করেছে। এবার জামায়াতকে সুযোগ দেওয়া দরকার।

রাজধানীর রামপুরায় আসবাবপত্রের ব্যবসা করেন হানিফ শেখ। তিনি বলেন, তিনি এবার জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেবেন। তার বিশ্বাস- জামায়াত ক্ষমতায় এলে দেশে ইসলামী শাসন কায়েম হবে। অপকর্ম, চাঁদাবাজি থাকবে না। মানুষ শান্তিতে থাকবে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির শাসন ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীকে একটি বার সুযোগ দেওয়া দরককার।

সূত্র বলছে, জামায়াতে ইসলামীর যে বিপুল কর্মী-সমর্থক রয়েছে- এটা অনেকেরই অজানা ছিল। এবারের নির্বাচনে তাদের পরিচয় প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের সরব উপস্থিতি রয়েছে। অথচ আওয়ামী লীগের টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনকালে তারা ছিল নীরব। ব্যাপক দমন-পীড়নের পরও দলটি গোপনে সুসংগঠিত এবং তারা শক্তি সঞ্চয় করেছে। এবারের নির্বাচনে সেই শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে যাচ্ছেন তারা। দুই দলকে (আওয়ামী লীগ-বিএনপি) দেখলাম। এবার জামায়াতকে দিয়ে দেখি- এমন আওয়াজও রয়েছে ভোটের মাঠে। ফলে তাদের আসন এবং ভোট বাড়বে বলেই ইঙ্গিত মিলছে। অবিভক্ত ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠিত দলটি এখন সোনালী সময় পার করছে।

ভরসা নারী ও আ.লীগের ভোট : সূত্র জানিয়েছে, এবার বিপুল সংখ্যক নারী জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেবেন। কারণ দলটির নারী কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারী ভোটারদের ম্যানেজ করতে সক্ষম হয়েছেন। তারা ভোট দেবেন বলে ওয়াদা করিয়েছেন। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস থাকবে না এবং নারীরা নিরাপদে থাকবেন বলে তারা বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের ভোট এবার জামায়াতে ইসলামী পাবে বলে দলটি আশা করছে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন- জামায়াত ক্ষমতায় গেলে তারা আওয়ামী লীগের লোকদের হয়রানি করবেন না; বরং নিরাপত্তা দেবেন। বিষয়টিতে আশ্বস্ত হয়েছেন তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতারা। এ কারণে তারা জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেবেন। এছাড়া বিএনপির নির্বাচন করছেন- এমন বিপুল সংখ্যক মানুষের ভোট জামায়াতে ইসলামী পাবে বলে তারা আশা করছেন। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, এটা তাদের কৌশল। নির্বাচনে অনেক কৌশল নিতে হয়।

যা বলছেন বিশ্লেষকরা : রাজনীতি বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, জামায়াতের তো হারানোর কিছু নেই। সুতরাং তারা তো খোশ মেজাজে থাকবেই। তারা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ভালো আছে। তারা ভালো করবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, জামায়াতে ইসলামীর আদর্শগতভাবে কিছু পরিবর্তন এসেছে। তারা এখন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় না। তবে ইসলামী মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে তারা রাজনীতি করছে। তারা অনেকটা তুরস্কের একে পার্টির মতো। 

জামায়াতের ফুরফুরে অবস্থার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্ম জামায়াতে ইসলামীর দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো তারা বেশ ভোকালিস্ট একটা পার্টি। তারা জুলাই আন্দোলনের স্পিরিট সামনে রেখে কাজ করছে। এদেশের একটা বড় অংশ বিশেষ করে তরুণরা ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়ছে- জামায়াত সেটাকে লুফে নিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী নারীদের নিরাপত্তার কথা বলছে। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কথা বলছে। এটা তরুণ প্রজন্ম এবং সুইং ভোটারদের ভালো লেগেছে। মূলত এই ভোটেই জয়-পরাজয় নিশ্চিত হয়। অন্যদিকে বিএনপি দ্বৈত নাগরিক ও ঋণ খেলাফি অনেককে মনোনয়ন দিয়েছে। এটাকে অনেকে ভালোভাবে নেয়নি।  

সিনিয়র সাংবাদিক তারিক আল বান্না বলেন, বাংলাদেশে যত রাজনৈতিক দল রয়েছে, জামায়াতে ইসলামী তাদের মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী। তাদের অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। তাদের বিশাল কর্মী বাহিনী তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ। যেহেতু আওয়ামী লীগ মাঠে নেই, সেহেতু বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী। তারা আওয়ামী লীগের ভোট টানার চেষ্টা করছে। কিছু ক্ষেত্রে তারা সফল হচ্ছে। এ কারণে দলটি ফুরফুরে মেজাজে রয়েছে।

জামায়াতে ইসলামী সরকার গঠন করতে পারবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীর আসন সংখ্যা বাড়বে।

প্রসঙ্গত, জামায়াত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার এবং পাকিস্তান বিভক্তির বিরোধীতা করেছিল। দলটির অনেক নেতাকর্মী সেসময় গঠিত আধা-সামরিক বাহিনীতে যোগদান করেছিল; যারা গণহত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত। জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা আধাসামরিক বাহিনী শান্তি কমিটি গঠনে নেতৃত্ব দিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ১৯৭২ সালে সরকার জামায়াতকে রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং দলের নেতারা পাকিস্তানে নির্বাসনে চলে যান।

পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের পর এবং কয়েকটি সামরিক অভ্যুত্থানের পর ১৯৭৭ সালে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসেন। তিনি জামায়াতের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেন। দলটির নেতাকর্মীরা ফিরে আসার অনুমতি পান এবং ১৯৭৯ সালের মে মাসে তৎকালীন জামায়াতে ইসলামীর অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা আব্বাস আলী খানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৮০-এর দশকে জামায়াত গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধারের জন্য বহুদলীয় জোটে যোগদান করে। এসময় দলটি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও সমসাময়িক বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আন্দোলন করে। ২০০১ সালে নির্বাচনের পূর্ব মুহূর্তে বিএনপির সাথে আরো অন্য দুটি দলসহ চারদলীয় ঐক্যজোট গঠন করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচনে চারদলীয় ঐক্যজোট জয়লাভ করলে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে জামায়াতের দুজন সদস্য মন্ত্রী হন। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি ৩০০টি আসনের মধ্যে ৫টিতে বিজয়ী হয়। ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করে। ট্রাইব্যুনালে দলটির কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয় এবং সেটা কার্যকর করা হয়। কারাদণ্ডও দেওয়া হয়। ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও এটিএম আজহার সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট থেকে খালাস পান।

প্রসঙ্গত, সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী ১৯৪১ সালের ২৬ আগস্ট লাহোরের ইসলামিয়া পার্কে সামাজিক-রাজনৈতিক ইসলামি আন্দোলনের অংশ হিসেবে জামায়াতে ইসলামী হিন্দ নামে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। জামায়াত ভারতের মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধিতা করেছিল। জামায়াত ১৯৪৬ সালের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় দল মুসলিম লীগকে সমর্থন করেনি। স্বাধীনতা ও ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পর মওদুদী ভারত থেকে পাকিস্তান চলে যান। পাকিস্তানে ২০২৪ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী একটি আসনেও বিজয়ী হতে পারেনি। ভারতের পার্লামেন্টেও জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধি নেই। কিন্তু রমরমা অবস্থা বাংলাদেশে।

ভোরের আকাশ/এসএইচ
 

জাতীয় সংসদ নির্বাচন

শেয়ার করুন: