ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবি-নেপথ্যে কী!

*গোপনে আধিপত্য বিস্তারের জন্য ছাত্র রাজনীতি বন্ধের নাটকে লিপ্ত ছাত্রশিবির: নাছির
* ছাত্রদলের নোংরা রাজনীতির জন্যই শিক্ষার্থীরা রাজনীতিবিমুখ হচ্ছে: সাদ্দাম
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ইডেন মহিলা কলেজের শান্ত ক্যাম্পাস এখন অস্থির। সাধারণ ছাত্রীদের মুখে এখন একটিই স্লোগানÑ ‘ছাত্র রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস চাই’। এই বিদ্যাপীঠে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের এমন জোরালো এবং ঐক্যবদ্ধ দাবি আগে দেখা যায়নি। কিন্তু কেন হঠাৎ এই দাবি? এর নেপথ্যে কী কেবল সাম্প্রতিক কোনো একটি ঘটনা, নাকি দীর্ঘদিনের শোষণের ফল? এমনই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজনরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত (৯ মে) শনিবার ইডেন মহিলা কলেজের গেটের তালা ভেঙে একদল ছাত্রীর বিক্ষোভ থেকে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি ওঠে। ওই বিক্ষোভের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। যা রাজনৈতিক অঙ্গনেও ‘ছাত্র রাজনীতি বন্ধের’ বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসছে। এর আগে গত মঙ্গলবার তিতুমীর কলেজের নারী শিক্ষার্থীদের একটি দল আবাসিক হলে রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে হলের তালা ভেঙে বিক্ষোভ করেছিলেন।
তবে এ ঘটনা নিয়ে পরস্পরকে দোষারোপ করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবির ও একই মতাদর্শে বিশ্বাসী ছাত্রীরা ছাত্রীসংস্থার সঙ্গে জড়িত থাকে। এ দুটি সংগঠনই জামায়াতে ইসলামীর মতাদর্শে বিশ্বাসী।
বিক্ষোভ প্রসঙ্গে ছাত্রদল বলছে, ছাত্রশিবিরের ইন্ধনে ‘ছাত্র রাজনীতি বন্ধের’ দাবি তোলা হচ্ছে কারণ তাদের ভাষায় ‘ছাত্রশিবিরের সমর্থকরা দলীয় পরিচয় গোপন করে’ দেশের ক্যাম্পাসগুলোতে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। অন্যদিকে, ছাত্রশিবির অভিযোগটি প্রত্যাখ্যান করে বলছে, তারা ছাত্র রাজনীতি বন্ধ চান না, তবে সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রদলের ‘নানা অপকর্মের’ কারণেই ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে এবং সেই ক্ষোভ থেকেই ছাত্র রাজনীতির বন্ধের প্রসঙ্গ আসছে। এর আগে গত মাসেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে হামলা, সংঘর্ষ ও অস্থিরতার ঘটনা ঘটেছিল। তখনও উভয় সংগঠন একে অপরের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো এবং বিভিন্ন কৌশলে ক্যাম্পাস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ করছিল।
ইডেন মহিলা কলেজ সূত্রে জানা গেছে, শনিবার রাত ১১টার দিকে ঢাকার আজিমপুর এলাকা ইডেন মহিলা কলেজের ক্যাম্পাসের ভেতরে বিক্ষোভ শুরু করে একদল ছাত্রী। এক পর্যায়ে তারা হলের প্রধান গেটের তালা ভেঙে ফেলে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের বিক্ষোভের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এসব ভিডিওতে দেখা যায়, একদল শিক্ষার্থী জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করছেন। কোনো কোনো ভিডিওতে দেখা গেছে বিক্ষোভে অংশ নেওয়াদের মধ্যে কয়েকজন সেখানে থাকা ছাত্রদলের পোস্টার-ব্যানার ছিঁড়ে ফেলছেন।
এ প্রসঙ্গে ইডেন কলেজের এক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, কলেজের ছয়টি হল থেকেই ছাত্রীরা অনেকে এসে এই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন এবং তারা ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি করছিলেন। তিনি বলেন, আমাদের কলেজের গেটের সামনে ‘রাজনীতিমুক্ত’ শব্দগুলো লেখা ছিল। শনিবার সন্ধ্যায় সেটি ছাত্রদলের নেতারা মুছে ফেললে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে বিভিন্ন হল থেকে কিছু ছাত্রী এসে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে রাতে কলেজের শিক্ষকরা এসে ছাত্রীদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেন। এসময় শিক্ষার্থীরা বহু বছর ধরে হলে আছেন কলেজের এমন কয়েকজন ছাত্রদল নেত্রীর হলে থাকার বৈধতা নিয়ে আপত্তি জানান। একই সঙ্গে তারা ইডেন কলেজের ক্যাম্পাসের ভেতরে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি জানান। এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় ছাত্রদলের মধ্যে।
এ বিষয়ে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির তার ভেরিফায়েড ফেসবুকে লিখেন, কলেজ প্রশাসনের কাছে দাবি জানাচ্ছি, আপনারা সবার রাজনৈতিক অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করুন। আপনারা শিবিরের কূটচালের সামনে মাথানত করবেন না। ধোঁকাবাজির শিকার হবেন না। অন্যথায়, সমগ্র দেশ থেকে গুপ্ত রাজনীতির অবসান ঘটানো হবে।
ছাত্রদল নেতার জবাবে ছাত্রশিবিরের সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম তার ভেরিফায়েড ফেসবুকে লিখেছেন, বিভিন্ন ক্যাম্পাসে আবার রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাসের স্লোগান উঠেছে। এর দায় সম্পূর্ণ ছাত্রদলকেই নিতে হবে। আর মতের সঙ্গে না মিললেই ‘গুপ্ত’ ট্যাগিং খেলার এক অপরিণামদর্শী রাস্তা তারা বেছে নিয়েছে। এই ট্যাগিং পলিটিক্সের কারণে তাদের কত বড় পতন নেমে আসতে পারে, তা তারা চিন্তাও করছে না।
তবে এ প্রসঙ্গে ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেছেন, ৫ আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ‘ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের’র দাবিতে মানববন্ধন হয়েছিল এবং সেসব মানববন্ধনের নেতৃত্বে যারা ছিলেন তাদের অনেকেই পরে শিবিরের নেতৃত্বে এসেছে। তিতুমীর কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী মেডিকেলসহ অনেক জায়গায় এটি ঘটেছে। তিতুমীরে যিনি আন্দোলন করেছেন তিনি সেখানকার শিবিরের সভাপতি হয়েছেন। রাজশাহী মেডিকেলে ‘নো পলিটিক্স ইন ক্যাম্পাস’ আন্দোলনের নেতা হয়েছেন সেখানকার শিবিরের সভাপতি। এখন ইডেনেও সেই একই খেলা শুরু হয়েছে, বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
ছাত্রদল নেতা নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, শিবির তাদের গুপ্ত শাখার কর্মীদের লেলিয়ে দিয়ে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার জন্য মব সৃষ্টি করেছিল বিভিন্ন ক্যাম্পাসে। যারা এই মবের নেতৃত্ব দিয়েছে পরবর্তীতে তারাই গুপ্ত সংগঠনের শীর্ষ নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তার দাবি, শিবির গুপ্ত রাজনীতির করে ছাত্ররাজনীতিকে দুর্গন্ধময় করে ফেলেছে। আবার তারাই গোপনে আধিপত্য বিস্তারের জন্য ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি করানোর নাটক করে।
এ প্রসঙ্গে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলছেন, ছাত্রদলের নোংরা রাজনীতির জন্যই শিক্ষার্থীরা রাজনীতি বিমুখ হয়ে যাচ্ছে। ইডেনে ১৬-১৭ বছর ধরে তাদের নেতারা সিট দখল করে রেখেছে। সেগুলো শিক্ষার্থীদের ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। সেখানে শিবির নেই। আর আমরা চাই ছাত্র রাজনীতি থাকুক। তবে একটা কোড অব কন্টাক্ট থাকতে হবে যে ক্যাম্পাসের ছাত্র রাজনীতি কেমন হবে।
ছাত্রশিবিরের সভাপতির দাবি, ছাত্রদলের ‘নোংরা রাজনীতির’ খেসারত পুরো ছাত্ররাজনীতির ওপর এসে পড়ছে এবং এজন্য শিক্ষার্থীরা ছাত্র রাজনীতি নিয়ে ভীত হয়ে পড়েছে।
নূরুল ইসলাম সাদ্দাম অভিযোগ করেন, শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ না করে চাঁদাবাজি, স্ট্যান্ড দখল, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস, দখলদারি এবং নিষিদ্ধ লীগকে কমিটিতে পুনর্বাসনসহ সারা দেশে কমিটি দেওয়াকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘর্ষের রাজনীতির কারণে শিক্ষার্থীরা আবার আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে আবার রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাসের স্লোগান উঠেছে। এর দায় সম্পূর্ণ ছাত্রদলকেই নিতে হবে, বলেন ছাত্রশিবিরের এই নেতা।
সাধারণ ছাত্রীরা অভিযোগ করেছেন, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে ক্যাম্পাসকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার বিকল্প নেই। ইডেন কলেজের এই আন্দোলন কেবল একটি ছাত্রসংগঠনের বিরুদ্ধে নয়, বরং ছাত্র রাজনীতির নামে চলমান লেজুড়বৃত্তি এবং অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক নীরব বিপ্লব। শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে এবং ছাত্রীদের নিরাপত্তা বজায় রাখতে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের এই দাবি এখন গণদাবিতে পরিণত হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ইডেন কলেজে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো দেড় দশকের বেশি সময়কাল হলের সিট নিয়ে ছিল বাণিজ্য। সাধারণ ছাত্রীদের অভিযোগ, কলেজের বৈধ সিট পেতে হলে ছাত্রসংগঠনের প্রভাবশালী নেত্রীদের দ্বারস্থ হতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, হলের নিয়ন্ত্রণ থাকে ছাত্রসংগঠনের হাতে, যেখানে সাধারণ ছাত্রীদের চড়া মূল্যে সিট ভাড়া নিতে হয় এবং বিনিময়ে তাদের বাধ্যতামূলকভাবে রাজনৈতিক মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিতে হয়।
ছাত্রীরা মনে করেন, হলের সিট বরাদ্দ থেকে শুরু করে শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব প্রশাসনের হাতে থাকলেও তারা পরোক্ষভাবে ছাত্রসংগঠনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। ফলে কোনো অন্যায়ের প্রতিকার চাইতে গিয়ে ছাত্রীরা প্রশাসনের কাছ থেকে তেমন কোনো সহযোগিতা পাননি। এই আস্থাহীনতা থেকেই ছাত্রীরা নিজেরাই রাজপথে নেমে এসেছেন।
ভোরের আকাশ/এনএস