জয়ের টার্গেট জাতীয় সংসদ নির্বাচনে
কৌশলে এগোচ্ছে বিএনপি

আর মাত্র পৌনে তিন মাস পরই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনকে সামনে রেখে জয়ের চ্যালেঞ্জ নিয়ে কৌশলে এগোচ্ছে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি। সর্বদিকে দৃষ্টি রেখে ভোটমুখী রয়েছে দলটি। অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা কোন দলের বিতর্কিত বক্তব্যকে উপেক্ষা করে চলছে দলটির নেতারা। কিছু মহল নির্বাচন নিয়ে চক্রান্ত করার অপচেষ্টা করলেও সজাগ-সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছে দলটি।
দেশের গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ঘোষিত সময়েই সংসদ নির্বাচন হোক- এটাই দলটির প্রত্যাশা। কাজেই জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভাষণে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেও স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানিয়েছে বিএনপি। একদিনে গণভোট ও নির্বাচনের সিদ্ধান্ত স্বাগত জানায় দলটির নেতারা। পক্ষান্তরে একদিনে গণভোট ও নির্বাচনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি তোলেন জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি ইসলামপন্থি দল।
গণভোট ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে প্রতিক্রিয়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের ভাষণের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা নিজের সই করা জুলাই জাতীয় সনদ লঙ্ঘন করেছেন।
বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, সংবিধান বাস্তবায়ন আদেশের সঙ্গে জুলাইয়ে স্বাক্ষরিত সনদের বহু গরমিল রয়েছে। রাষ্ট্রে ঐক্যের পরিবর্তে বিভাজন তৈরি হচ্ছে এর দায় কি প্রধান উপদেষ্টা নেবেন? তিনি বলেন, সার্বভৌমত্বের এখতিয়ার সংসদের। কিছু চাপিয়ে দেওয়া এখতিয়ার বহির্ভুত, যেসব ধারণা উপস্থাপন করা হচ্ছে তা সাংঘর্ষিক।
তিনি বলেন, গণভোটের জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের বিষয়েও বিএনপি একমত কিন্তু গণভোটের চারটি প্রশ্ন জনগণের ওপর জবরদস্তিমূলকভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে, ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচনের ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত ও নির্বাচনের দিন গণভোট অনুষ্ঠানের ঘোষণা করায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ধন্যবাদ জানিয়েছে বিএনপি। বৃহস্পতিবার রাতে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটি বৈঠক শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন দলটি।
এছাড়া, নির্বাচনে বিজয় অর্জনের লক্ষে বিভিন্ন কৌশলী দলটি। তিনশত আসনের মধ্যে ২৩৬ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণা করলেও বাকি আসনগুলোর মধ্যে প্রার্থী নির্ধারণ করা হচ্ছে। একইসঙ্গে বিগত দিনের আন্দোলনে জোটসঙ্গীদের প্রার্থী দেওয়ার ক্ষেত্রেও যাচাই-বাছাই করে সমঝোতার মধ্য দিয়ে আসন বণ্টন করা হচ্ছে বলে দলটির সূত্রে জানা গেছে।
বিএনপির স্পষ্ট বার্তা, জয়ের ব্যাপারে কোথাও ন্যূনতম ছাড় দিতে রাজি নয় দলটি। বহিষ্কৃত নেতাদেরকে ফিরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া নির্বাচনী কৌশল মনে করছেন দলটির নেতারা।
দলের সূত্রে জানা যায়, মান-অভিমান ভুলে পদবঞ্চিত ও বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার হওয়া নেতাদেরও ধানের শীষ মার্কাটি তুলে দিচ্ছে দলটির হাইকমান্ড। মূলত দলের জন্য ত্যাগ, নিষ্ঠা ও জনপ্রিয়তাসহ মাঠের নানা বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে মনোনয়ন দিয়েছে দেশের প্রধান এই গণতান্ত্রিক দলটি। পদ স্থগিত-বহিষ্কারাদেশ অব্যাহতি পাওয়া নেতাদের মনোনয়ন পাওয়ার তালিকায় আছেন খুলনা-২ আসনের নজরুল ইসলাম মঞ্জু, ময়মনসিংহ-৬-এ ফখরুদ্দিন আহমেদ বাচ্চু, পিরোজপুর-৩ আসনে রুহুল আমিন দুলাল, কিশোরগঞ্জ-৪ আসনে অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান। দলীয় আস্থা ও মূল্যায়ন পেয়ে ধানের শীষকে বিজয়ী করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এসব প্রার্থী।
খুলনা-২ আসনের মনোনীত বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু দক্ষিণ বঙ্গের একজন প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিত। তবে ২০২১ সালে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাকে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তখন মঞ্জু ছিলেন খুলনা বিভাগের দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। তার পরিবর্তে সহ-সাংগাঠনিক সম্পাদক পদে দায়িত্বে থাকা অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে খুলনা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সূত্রে জানা যায়, দেশের রাজনীতিতে খুলনা সবসময় আলোচিত। দক্ষিণাঞ্চলের রাজনীতিতে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চল। এমন প্রেক্ষাপটে মঞ্জুর ফেরত আসা দলীয় রাজনীতিতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে গত চার বছর পদবিহীন থাকলেও মাঠে ছিলেন সক্রিয়, নিজস্ব ব্যানারে নিয়মিত আয়োজন করেছেন রাজনৈতিক কর্মসূচি। দীর্ঘ বিরতির পর আবারও খুলনা-২ আসনে প্রার্থী মনোনীত হয়ে মঞ্জু বলেন, দল আমার ওপর যে আস্থা রেখেছে, জনগণকে সঙ্গে নিয়েই তা রক্ষা করতে চাই। খুলনা বিএনপি ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে থাকলে জয় সুনিশ্চিত।
তিনি আরও বলেন, দলের মধ্যে যে দূরত্ব ছিলো তা মনোনয়ন ঘোষণার মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়েছে। আমরা সবাইকে নিয়েই ঐক্যবদ্ধ থেকে ধানের শীষের প্রতীকের জন্য লড়াই করবো। উল্লেখ্য, এর আগে ২০০৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মঞ্জু সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এদিকে ময়মনসিংহ-৬ আসন থেকে বিএনপির সম্ভাব্য দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন ফখরুদ্দিন আহমেদ বাচ্চু। যদিও ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের নানা অভিযোগে দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। ফখরুদ্দিন আহমেদ ময়মনসিংহ জেলা দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও ভালুকা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ছিলেন। তবে ভোটের মাঠে শক্ত অবস্থান, জনপ্রিয়তা এবং ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ত্যাগ ও নির্যাতনের শিকার এই নেতা শেষ পর্যায়ে এসে দলীয় মনোনয়ন পান। এর আগে চলতি বছরের ২৪ অক্টোবর বাচ্চুর বিরুদ্ধে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে বিএনপি।
এ ব্যাপারে ফখরুদ্দিন আহমেদ বাচ্চু বলেন, গত সাড়ে ১৫ বছর ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে এলাকায় সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছি। দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছি। দল আমাকে মনোনীত করেছে। আশা করছি, দলমত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে ধানের শীষের প্রতীক জয়লাভ করাবো।
পিরোজপুর-৩ আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী রুহুল আমিন দুলাল। আদর্শ পরিপন্থি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থেকে দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে গত বছর প্রাথমিক সদস্যসহ সকল পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক রুহুল আমিন দুলালকে। তবে একাধিক জরিপে দলের সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থী হিসেবে দুলালের নাম উঠে আসে। এছাড়া স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও তার বড় অবদান ছিল। প্রতিপক্ষ দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে জয় পেতে তাই দুলালের উপরই ভরসা রেখেছে বিএনপি।
কিশোরগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে একাধিকবার আলোচিত-সমালোচিত অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান। চলতি বছরের ২৬ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে ‘কুরুচিপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য’ দেওয়ায় বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ফজলুর রহমানের প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলীয় সব ধরনের পদ তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হয়।
দলীয় সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিল, ফজলুর রহমান এখন থেকে টক শো কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো বক্তব্য দেওয়ার সময় যেন দেশের মর্যাদা ও দলের নীতিমালা ক্ষুণ্ন না হয় এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না লাগে, সেদিকে সজাগ থাকতে হবে। নানা বিচার-বিশ্লেষণে এই আসনেও জয় নিশ্চিত করতে ফজলুর রহমানের উপরই ভরসা বেখেছে বিএনপি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বহিষ্কৃত এবং অব্যাহতি দেওয়া নেতাদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম, জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ (বীরবিক্রম) বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনেকটা চ্যালেঞ্জের মোখোমুখি হতে হবে। তাই যারাই এলাকায় গ্রহণযোগ্য এবং জনপ্রিয় তাদেরই মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
হাফিজ উদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, সামনের চ্যালেঞ্জিং নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা যার বেশি, যে প্রার্থী নিজের যোগ্যতায় নির্বাচিত হতে পারবেন, এ ধরনের প্রার্থীকেই বিএনপি দলীয় মনোনয়ন দিয়েছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ বহিষ্কৃত ছিল। তবে আসন যাতে হাতছাড়া না হয় এবং আগামীতে দলকে আরও শক্তিশালী করার জন্য তাদের দলে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। মনোনয়ন দেওয়া ছাড়াও পদ স্থগিত বা অব্যাহতি পাওয়া অনেককে এরইমধ্যে স্বপদে বহাল করা হয়েছে।
ভোরের আকাশ/এসএইচ