উচ্ছ্বসিত নেতাকর্মীরা
তারেক রহমানকে সংবর্ধনায় প্রস্তুত বিএনপি

দীর্ঘ ১৭ বছরের বেশী সময় লন্ডনে প্রবাস জীবন কাটানো বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে উচ্ছ্বসিত দলটির নেতাকর্মীরা। দলের শীর্ষ নেতাকে ইতিহাসের স্মরনীয় করে রাখতে স্মরণকালের সংবর্ধনা দিতে সব ধরণের প্রস্তুতি নিয়েছে দলটি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে সংবর্ধনা দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। এ উপলক্ষে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের মঞ্চ তৈরির কাজ চলছে। রাজধানী কুড়িল বিশ্বরোড থেকে পূর্বাচলমুখী ৩০০ ফিট সড়কের একটি অংশ নিয়ে মঞ্চ তৈরির কাজ চলছে। এই নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার জন্য কমিটির সদস্যরা দিনরাত পরিশ্রম করছেন বলে জানিয়েছেন বিএনপির নেতারা।
ইতিমধ্যে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজনে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের অনুমতি পেয়েছে দলটি। এ প্রসঙ্গে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য লিখিত অনুমতি পাওয়া গেছে। দলনেতাকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দিতে চান তারা। তারেক রহমানের জন্য ঠিক করা হয়েছে বাড়িও। তারেক রহমানের সফরসঙ্গী হিসেবে থাকছেন স্ত্রী-কন্যাসহ আরও পাঁচজন। সঙ্গে থাকছে তার আদরের পোষা বিড়াল ‘জেবু’।
জানা গেছে, বিমানের বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি ২০২০ ফ্লাইটে টিকিট বুকিং করেছেন তারেক রহমান। ফ্লাইটটি ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হওয়ার কথা রয়েছে। সব ঠিক থাকলে বোয়িং ৭৮৭-৯ মডেলের উড়োজাহাজটি ২৫ ডিসেম্বর বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাবে। বিএনপির নেতাকর্মীরা মনে করেন, তারেক রহমান ফিরলে দলের অভ্যন্তরে, এমনকি দেশের রাজনীতিতে একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ভোটের পরিবেশ আরও ভালো হবে।
সচেতন নাগরিকদের অনেকে বলছেন, দীর্ঘ প্রবাস জীবন থেকে তারেক রহমান নিজেকে একজন পরিশীলিত নেতা হিসেবে গড়ে তুলেছেন। দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকলেও দলের মধ্যে ঐক্য ধরে রেখেছেন। তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে আগামী ২৫ ডিসেম্বর কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে ঢাকা মহানগর পুলিশ। এ প্রসঙ্গে অভ্যর্থনা কমিটির আহ্বায়ক ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, তারেক রহমানের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে আমাদের নিরাপত্তা টিম সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করছে। সরকারও বেশ সহযোগিতা করছে।
সংবর্ধনা: দেশের বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানাতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। দেশে ফিরলে তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন স্মরণীয় করতে বিশেষ আয়োজন করছে বিএনপি। বিশাল সংবর্ধনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরমধ্যে রাজধানীর খিলক্ষেত থানাধীন ৩০০ ফুটে সংবর্ধনা দেওয়া হবে বলে দলটির সূত্রে জানা গেছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে ঘিরে সারা দেশের সাধারণ মানুষ ও নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা কাজ করছে। ২৪ ডিসেম্বর রাতে ও ২৫ ডিসেম্বর সকালের মধ্যে আমাদের নেতাকর্মীরা কীভাবে বিমানবন্দরে পৌঁছবেন সে নির্দেশনাও ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে অভ্যর্থনা কমিটির সদস্যসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ইতিহাসের স্মরণীয় জনসমাগম নিশ্চিত করতে কমিটি দিনরাত পরিশ্রম করছে। স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস স্মরণীয় করে রাখতে স্মরণকালের বৃহত্তম গণজমায়েতের পরিকল্পনা করছে দলটি।
জানা গেছে, অভ্যর্থনা কমিটিতে বিএনপির ১০ বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, অঙ্গসংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবেরা সদস্য হিসেবে রয়েছেন।
সূত্রে জানা গেছে, বিমানবন্দর থেকে এভারকেয়ার হাসপাতাল পর্যন্ত নেতাকর্মীরা রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে তারেক রহমানকে সংবর্ধনা জানাবেন। বিমানবন্দর থেকে তারেক রহমান এভারকেয়ার হাসপাতালে যাবেন। সেখানে তার মা খালেদা জিয়ার চিকিৎসা চলছে। সারাদেশ থেকে বিপুল সংখ্যাক ছাত্র-জনতা ঢাকায় আসবেন তারেক রহমানকে সংবর্ধনা জানাতে। দলীয় নেতাকর্মীর আসার সুবিধার্থে বিএনপি’র পক্ষ থেকে ২৪ শে ডিসেম্বর দিবাগত রাতের বিভিন্ন রুটে রেলগাড়ি রিজার্ভ করতে ইচ্ছুক। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী নির্দিষ্ট ভাড়া পরিশোধ করা হবে।
রেলপথ রুটের বিবরণ; ১. কক্সবাজার-ঢাকা, ২. সিলেট-ঢাকা, ৩. জামালপুর-ময়মনসিংহ-ঢাকা, ৪. টাঙ্গাইল-ঢাকা, ৫. চাঁপাইনব্বাগঞ্জ-রাজশাহী-ঢাকা, ৬. পঞ্চগড়-নিলফামারী-পার্বতীপু-ঢাকা, ৭. কুড়িগ্রাম-রংপুর-ঢাকা। উল্লেখিত রুটে ১টি করে স্পেশাল ট্রেন/অতিরিক্ত বগি রিজার্ভ করার অনুমতি প্রদানের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে ঢাকাকে জনসমুদ্রে পরিণত করতে চায় তারা। ইতিমধ্যে গুলশান কার্যালয়ে প্রস্তুতি সভা করেছে দলটি। দেশের জেলায় জেলায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উচ্ছ্বাস। কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশনার আগেই তৃণমূল নেতাকর্মীরা নিজেরাই যানবাহন ভাড়া করছেন। শুধু ঢাকা নয়, দেশের সবগুলো জেলা, উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায় থেকে দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ সংবর্ধনায় যোগ দেবেন। তারা বাস, ট্রাক, মাইক্রো, লঞ্চ, ট্রেন ও বিমানযোগে আসবেন। উত্তরাঞ্চলের জেলা উপজেলা থেকে আসা নেতাকর্মীদের গাড়িবহর টঙ্গীর ইজতেমা মাঠে রাখা হবে। সেখান থেকে হেঁটে বিমানবন্দর সড়কে জড়ো হবেন তারা।
এছাড়া পূর্বাঞ্চলের জেলা উপজেলা থেকে নেতাকর্মীদের গাড়িবহর পূর্বাচলের তিনশ’ ফিট সড়কের উভয়পাশে খালি জায়গায় পার্কিং করা হবে। সেখান থেকে হেঁটে নেতাকর্মীরা বিমানবন্দর সড়কে আসবেন। এছাড়া বিভিন্ন জেলা থেকে ট্রেনে করে নেতাকর্মী আসবেন। বিমানবন্দর স্টেশনে নেমে সংবর্ধনায় যোগ দেবেন। তাই সাধারণ মানুষের যানজটের ভোগান্তি এড়াতে তারেক রহমানের ফেরার ক্ষণটি বড়দিনের ছুটিকে বেছে নেয়া হয়েছে। বিমানবন্দরে দলের সিনিয়র নেতারা থাকবেন। আর বিমানবন্দরের বাইরে থেকে গুলশান কার্যালয় পর্যন্ত বিস্তৃত হবে দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের ঢল। তবে বিমানবন্দর থেকে তারেক রহমানের সরাসরি এভারকেয়ার হাসপাতালে অসুস্থ মা বেগম খালেদা জিয়াকে দেখতে যাওয়ার কথা রয়েছে। সেজন্য বিমানবন্দর থেকে এভারকেয়ার হাসপাতাল পর্যন্ত নেতাকর্মীরা রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে তারেক রহমানকে সংবর্ধনা জানাবেন।
ঢাকা-৬ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ইশরাক হোসেন বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে স্মরণীয় সংবর্ধনার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
তিনি বলেন, তারেক রহমানের আগমন ঘিরে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকবে। বিভিন্ন জেলা থেকে আগত নেতাকর্মীদের আমরা সংগঠিতভাবে বরণ করে নেব। এটি হবে ইতিহাসের একটি স্মরণীয় সংবর্ধনা।
তিনি আরও বলেন, ঢাকা মহানগরী থেকেই ২০-২৫ লাখ মানুষের সমাগম সম্ভব, যদি দলীয় নেতাকর্মীরা আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপি দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। আমাদের সংসদ সদস্য প্রার্থী ও নেতাকর্মীরা চাইলে এটি কোনো কঠিন কাজ নয় যোগ করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তরের আহবায়ক আমিনুল হক বলেন, তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে শুধু সারা দেশের জেলা উপজেলা নয়, ইউনিয়ন পর্যায় থেকেও নেতাকর্মী ঢাকায় আসবে। তারা নিজেরাই বাস-ট্রাক মাইক্রো ভাড়া করছে। ঢাকা মহানগরও প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব বলেন, তারেক রহমান ফেরার খবরে দলের নেতাকর্মী ও দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে জোয়ার তৈরি হয়েছে। রাজনীতির ইতিহাসে খুবই স্বরনীয় হয়ে থাকবে দিনটি। সবধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি। তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে ঢাকা মহানগর পুলিশ। তিনি দেশে পা রাখার পর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে এই নিরাপত্তা আয়োজনের সূচনা হবে। দেশে ফেরার পর তিনি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার সময় পাবেন পুলিশ প্রটেকশনসহ বিশেষ নিরাপত্তা। এছাড়া তারেক রহমানের বাসভবন এবং অফিসেও থাকবে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা। নিরাপত্তা ছাড়পত্র ছাড়া কাউকে তার ধারেকাছেও ভিড়তে দেবে না পুলিশ।
তারেক রহমান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পা রাখার পর তাকে বহনকারী গাড়ির আগে পিছে পুলিশ প্রটেকশন দেবে ঢাকা মহানগর পুলিশ। পুলিশ প্রটেকশনের গাড়িসহ তারেক রহমানের কাছে যারা ডিউটি করবেন, তাদের ‘সিকিউরিটি ভেটিং’ শুরু করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। তাদের রাজনৈতিক আদর্শ এবং পরিবারের সদস্যদের বিষয়ে তদন্তের পর তারেক রহমানের নিরাপত্তায় নিয়োজিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। এ জন্য একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা তারেক রহমানের নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের বিষয়ে নানামুখী তদন্ত করবে। গোয়েন্দা তদন্তে যেসব পুলিশ সদস্যের বিষয়ে ইতিবাচক প্রতিবেদন পাওয়া যাবে না, তাদের তারেক রহমানের নিরাপত্তায় নিয়োজিত করা হবে না। ইউনিফর্মধারী পুুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও নানা ছদ্মবেশে গোয়েন্দারা তারেক রহমানের নিরাপত্তার দিকটি দেখভাল করবেন।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এসএন নজরুল ইসলাম বলেন, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আমরা তাকে পুলিশ প্রটেকশন দেব। এছাড়া আরও নানামুখী ব্যবস্থা থাকবে। বিমানবন্দর থেকে গুলশানে আসার পথে কয়েক হাজার পুলিশ মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ওই দিন তার নিরাপত্তা উপলক্ষে মাঠে থাকবে ঢাকা মহানগর পুলিশের সোয়াট টিম, বোম ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা। তার বাসা ও অফিস ডগ স্কোয়াড দিয়ে সুইপিংয়ের মাধ্যমে নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে পুলিশ। গুলশান অ্যাভিনিউর ১৯৬ নম্বর বাসাটি কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলবে পুলিশ। সিসি ক্যামেরায় মোড়ানো থাকবে পুরো বাড়িটি। অনুমোদিত কাউকে এই বাড়ির আশপাশেই ভিড়তে দেওয়া হবে না।
দলটির একাধীক নেতা বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে বড় আয়োজন করতে যাচ্ছে বিএনপি। অভ্যর্থনায় ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে দলটি। নিরাপত্তাসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। পরিদর্শন করেছেন বিমানবন্দর থেকে আগমন পথের সড়ক। ওইদিন দুপুরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নিয়মিত ফ্লাইটে তিনি ঢাকায় হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবেন। এরপর তাকে রাজধানীর তিনশ ফিটে সংবর্ধনা দেবে বিএনপি।
ভোরের আকাশ/এসএইচ