ইসির কাণ্ডে ক্ষোভ

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কর্মকাণ্ডের প্রভাব পড়ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ব্যালট পেপার সংক্রান্ত ইস্যুটি ইসির ভাবনায় আগেই নেওয়া প্রয়োজন। পোস্টাল ব্যালট-সংক্রান্ত বিষয়ে নেপথ্যে রহস্য কী! রহস্যই-বা থাকবে কেন। সবকিছু ইসির ওপেন করা উচিত। তবে যদি কোন রহস্য থাকে সেটি কার ঈশারায় অথবা কার স্বার্থে- এটিও ইসির প্রকাশ করা কর্তব্য। কারণ স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির অঙ্গ সংগঠন ছাত্রদল যে সব বিষয় নিয়ে ইসি ভবন ঘেরাও কর্মসূচি দিয়েছে, সেটি ইসি এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই।
ইসি ভবন ঘেরাওয়ের নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদল বলছে, নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের বহিঃপ্রকাশ এটি। পোস্টাল ব্যালট-সংক্রান্ত বিষয়ে ইসির পক্ষপাতদুষ্ট ও প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত, যা নির্বাচনপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর সংশয় সৃষ্টি করেছে জনমনে। তারা মনে করছে, একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর চাপের মুখে দায়িত্বশীল ও যৌক্তিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে হঠকারী ও অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ, যা কমিশনের স্বাধীনতা ও পেশাদারিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অনেক ক্ষেত্রে কমিশন পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে, যা একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে অন্তরায় হতে পারে। তবে বিদ্যমান ত্রুটিগুলো দ্রুত সমাধান করলে এই কমিশনের অধীনেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব মনে করেন তিনি।
মির্জা ফখরুল বলেন, ভোটারদের কাছে পৌঁছানো পোস্টাল ব্যালটগুলো ত্রুটিপূর্ণ। নির্দিষ্ট একটি দলকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যেই এই ব্যালট তৈরি করা হয়েছে। অনতিবিলম্বে প্রতীক সংবলিত সঠিক ব্যালট পেপার সরবরাহ করতে হবে।
কমিশনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, যেসব কর্মকর্তা পক্ষপাতমূলক আচরণ করছেন, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। সব দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। ব্যালট পেপারসহ নির্বাচন প্রক্রিয়ার সব কারিগরি ত্রুটি দ্রুত সমাধান করতে হবে। দেশের বিভিন্ন এলাকা ভোটারদের ঢাকা মহানগরীর নির্বাচনী এলাকায় স্থানান্তর করে নিয়ে এসে প্রার্থীদের বিজয়ী করার জন্য একটি রাজনৈতিক দল কৌশল নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি।
এ প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ঢাকা মহানগরী এলাকার বিভিন্ন নির্বাচনি এলাকায় একটি রাজনৈতিক দল তাদের মনোনীত সমর্থিত প্রার্থীদের নির্বাচনে বিজয়ী করার অনৈতিক কূটকৌশল অবলম্বন করে ব্যাপক হারে দেশের ভিন্ন ভিন্ন এলাকা হতে ভোটার এলাকা পরিবর্তন পূর্বক ঢাকা মহানগর এলাকার ভোটার হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বিএনপি মহাসচিব, মোট কত সংখ্যক ভোটার, কোন কোন এলাকা থেকে ঢাকা মহানগরীর কোন কোন সংসদীয় নির্বাচনী এলাকায় কী কারণে স্থানান্তর হয়েছেন, সেই ভোটারদের বিস্তারিত বিবরণ জরুরি ভিত্তিতে আমাদের সরবরাহ করার জন্য আমরা অনুরোধ করেছি।
অভিযোগ জানিয়ে তিনি বলেন, জামায়াতের নির্বাচনি কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিকাশ নম্বর, এনআইডির কপি সংগ্রহ করছে, যা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ভঙ্গ, ক্রিমিন্যাল অফেন্স। এই বিষয়ে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত বলে আমরা আহ্বান জানিয়েছি। বিএনপি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে বিশ্বাসী, এই কারণে আমাদের চেয়ারম্যান ব্যক্তিগত সফর বাতিল করেছেন। অথচ বিভিন্ন রাজনীতিক দলের দলীয় প্রধানসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা প্রতিনিয়ত আচরণবিধি ভঙ্গ করে দলীয় প্রচারণা চালাচ্ছে। এই বিষয়েও জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য আমরা অনুরোধ জানিয়েছি বললেন তিনি।
মির্জা ফখরুল বলেন, বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকার রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার, পুলিশ সুপার, ওসিসহ অন্যান্য কর্মকর্তাবৃন্দ একটি দলের পক্ষে কেউ কেউ কাজ করছেন বলে আমরা অভিযোগ পেয়েছি। তদন্তপূর্বক তাদের প্রত্যাহার করার জন্য বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ জানানো হয়েছে'।
এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, ব্যালট পেপারে এক্সাক্টলি খবরের কাগজে নানা রকম রিপোর্ট আসতেছে, তো এটা ইসি পরিষ্কার করে বলুক আমাদেরকে। যে ব্যালট পেপার নিয়ে ছাত্রদল আন্দোলন করছে, এই যে ব্যালট পেপার। এই ব্যালট পেপারে কি আছে বলুক? কেন সেটা করে না, সেটাও তো একটা রহস্য। কেন এই রহস্য? কার ইঙ্গিতে সেই রহস্যটা রেখেছে।
তিনি বলেন, আপনার বহু রকম আমাদের অপশক্তি আমাদের দেশে কাজ করছে। কে আর কার ইঙ্গিতে সে পেপারটা দেখিয়ে দিচ্ছে না সবাইকে, ওটা তো আর কোন সিক্রেট কিছু না।
ছাত্রদলের ঘেরাও কর্মসূচির বিষয়ে তিনি বলেন, কি এই রহস্যটা বিএনপি কেন হঠাৎ আর যদি এটাই সমস্যা হয়ে থাকে তাহলে ব্যালট পেপারটা ইসি আপনার কাগজে ছাপিয়ে দিচ্ছে না কেন? যদি ছাপিয়ে দেয় তাহলে তো ঝামেলা খতম। এটা তো কোন সিক্রেট ডকুমেন্ট না, তো তাহলেই তো আন্দোলন থেমে যায় কার ভরসে কার ইঙ্গিতে সে ব্যালট পেপার ইয়ে করছে না ওপেন করছে না এটা আমারও প্রশ্ন। নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতদুষ্টের অভিযোগসহ তিন ইস্যুতে নির্বাচন ভবনের বাইরে চলে ছাত্রদলের ঘেরাও কর্মসূচি।
সরেজমিন দেখা যায়, রাজধানীর আগারগাঁও নির্বাচন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, ঢাকা মহানগর উত্তর, ঢাকা মহানগর দক্ষিণসহ প্রতিটি থানা থেকে নেতাকর্মীরা ঘেরাও কর্মসূচিতে অংশ নেন। ঘেরাও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে অংশ নেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির।
নির্বাচন কমিশন ঘেরাও প্রসঙ্গে ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, এখানে অনেকগুলো ইস্যু রয়েছে। ব্যালট পেপার ইস্যু রয়েছে। এছাড়াও একটি বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রভাব প্রতিপত্তি ইতোমধ্যে দেখা গেছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা আজ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এসেছি। যদি এই জবরদস্তিমূলক সিদ্ধান্ত এবং বিশেষ গোষ্ঠীর প্রভাব বন্ধ না হয়, তবে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। তিন কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন তিনি। সেগুলো হলো- ১.পোস্টাল ব্যালট-সংক্রান্ত বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতদুষ্ট ও প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত, যা নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর সংশয় সৃষ্টি করেছে। ২. বিশেষ একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর চাপের মুখে দায়িত্বশীল ও যৌক্তিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে হঠকারী ও অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ, যা কমিশনের স্বাধীনতা ও পেশাদারিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ৩. বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ প্রভাব ও হস্তক্ষেপে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের নজিরবিহীন ও বিতর্কিত প্রজ্ঞাপন জারি, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য অশনিসংকেত। তবে ছাত্রদলের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি জোরদার করেছে নির্বাচন আয়োজনকারী সংস্থাটি। পুলিশের পাশাপাশি নৌবাহিনী, র্যাব, আনসার বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। ইসির সামনে এনে রাখা হয়েছে রায়ট কার ও জল কামান।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি বাহরাইনে এক ঠিকানায় অনেকগুলো পোস্টাল ব্যালট পৌঁছানোর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এ বিষয়ে গত ১৪ জানুয়ারি ব্যাখ্যা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেছেন, বাহরাইনের বিষয়টি হলো, আপনারা জানেন, ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ পোস্টাল ব্যালট পাঠাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ কয়েকটি দেশের পোস্টাল সিস্টেম ভিন্ন রকমের। বাহরাইনের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে, সেখানে প্রায় ১৬০টি ব্যালট একটি জায়গায় একটি বক্সে রেখে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ডেলিভারি পয়েন্ট হিসেবে বিষয়টি অনেকটা ছাত্রজীবনের মতো হোস্টেলে যেমন একটি নির্দিষ্ট জায়গায় চিঠিপত্র রেখে দেওয়া হতো এবং সেখান থেকে সবাই নিজের নিজের চিঠি নিয়ে নিতো, ঠিক সেভাবেই একটি বক্সে ১৬০টি ব্যালট রাখা হয়। পরে প্রবাসী বাংলাদেশি ভাইয়েরা ওই বক্স খুলে চার-পাঁচ জন মিলে ভাগ করে নেন, যে যার পাশের ঘরে থাকে, সে তারটা নিয়ে পৌঁছে দেবে, ব্যাপারটা এরকম। আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি, প্রবাসী ভোটাররা ভোটের একটি ব্যালট হাতে পাওয়ার আনন্দ ধরে রাখতেই কেউ এটি পোস্ট করেছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ভোরের আকাশ/এসএইচ