আলোচনায় বিএনপির মনোনয়ন

‘মুখে কষ্টের হাসি, মনে তীব্র যন্ত্রণা’- এই ছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ত্যাগী নেতাদের অবস্থা। আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৩৭ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে বিএনপি। সোমবার রাতে বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও বড় দল বিএনপির যারা মনোনয়ন পাননি তাদের অনেকের মনে মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। যেহেতু এটা দলীয় হাই কমান্ডের সিদ্ধান্ত, তাই অনেকেই মুখ ফুটে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। সেটা যাইহোক, হঠাৎ করেই বিএনপি আসন্ন নির্বাচনের জন্য প্রার্থী ঘোষণা দিলে, কে নমিনেশন পেলেন আর কে পেলেন না- এটাই গতকাল দিনভর ছিল রাস্তা-ঘাটে, অফিস-আদালতে, চায়ের আড্ডায়, বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজে, বাস-ট্রেনে অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয়বস্তু। ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ ছিল বিএনপির মনোনয়ন ঘোষণা।
সোমবার বিকেলে রাজধানীর গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে দলীয় প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ঘোষিত তালিকায় বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ ১২টি আসনে নারী প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ফেনী-১, বগুড়া-৭ ও দিনাজপুর-৩ আসন থেকে প্রার্থী হচ্ছেন। আর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রথমবারের মতো নির্বাচন করবেন বগুড়া-৬ আসনে। আন্দোলন-সংগ্রামে পাশে থাকা সমমনা দলগুলো এবং বিএনপিরই যারা যোগ্য প্রার্থী, তাদের জন্য বাকি আসনগুলো ফাঁকা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে দলের একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকায় অনেক আসনে প্রার্থী তালিকা ঘোষণা হয়নি।
এর মধ্যে একটি জেলা রয়েছে, যেখানে কাউকেই মনোনয়ন দেয়নি বিএনপি। বাগেরহাটে তিনটি আসন থাকলেও কোনোটিতে প্রার্থী দেওয়া হয়নি। তালিকায় জেলার তিনটি আসনের প্রার্থীর নামের ঘরটি খালি রয়েছে। এদিকে খালি রাখা ৬৩ আসনের মধ্যে ৪০টি জোটসঙ্গীদের দেওয়ার কথা ভাবছে দলটি, বাকি ২৩ আসনে এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি কেন্দ্রীয় কমিটি। সেগুলো নিয়ে সিদ্ধান্ত পরে জানানো হবে।
প্রার্থী তালিকা ঘোষণার আগে সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টায় জরুরি বৈঠকে বসেন বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। প্রায় পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী চলা এই বৈঠকে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত এবং চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে করণীয় নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়।
সন্ধ্যায় সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পর দেখা গেছে এই তালিকায় নেই নজরুল ইসলাম খান, রুহুল কবির রিজভী, বেগম সেলিমা রহমান, অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, আসাদুজ্জামান রিপন, শামসুজ্জামান দুদু, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, আসলাম চৌধুরী, হাবিব উন নবী সোহেল, আবদুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, নাজিম উদ্দীন আলম, কামরুজ্জামান রতন, হুমায়ুন কবীর, রুমিন ফারহানা, গিয়াস কাদের চৌধুরী, নাসির উদ্দিন অসীম, রবিউল ইসলাম নয়ন, হাসিনা আহমদ, আফরোজা আব্বাস, রুমানা মাহমুদ, গোলাম আকবর খোন্দকার, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, রফিকুল ইসলাম মজনু, বজলুল করিম আবেদ, হাসান আল মামুন, সাইফুল ইসলাম ফিরোজসহ অনেক ত্যাগী ও শীর্ষ নেতাদের নাম। এই নেতারা অবশ্য কেউ মনোনয়ন না পাওয়া নিয়ে কোনো কথা বলেননি। তবে তারা দলীয় প্রধানের প্রতি তাদের শতভাগ আস্থার কথাও প্রকাশ করেছেন।
এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, ‘এটি দলের প্রাথমিক তালিকা। দল মনে করলে যেকোনো কারণে যেকোনো সংশোধনী আসতে পারে।’
এদিকে, দলের যারা মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন, তাদের অনেকের সমর্থকরা সোমবার রাত ও গতকাল মঙ্গলবার ক্ষোভ জানিয়েছে, বিক্ষোভ প্রদর্শন ও ট্রেন-মহাসড়ক অবরোধ করেছে।
বিক্ষোভকারীরা বলছেন, ‘দলের এমন অনেককেই মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, যারা বিগত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ আমলে সরাসরি বিএনপির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছেন, নেতাকর্মীদের থেকে দূরে থেকেছেন। আওয়ামী আমলের শেষভাগে দেশের চরম দুঃসময়ে যারা দলীয় কাণ্ডারি হয়ে মাঠে থেকেছেন, পুলিশ-সন্ত্রাসীদের নিপিড়নের স্বীকার হয়েও পালিয়ে থাকেননি, তাদের অনেকেই মনোনয়ন পাননি।’
মাদারীপুর-১ আসনে কামাল জামান মোল্লাকে মনোনয়ন দেওয়ায় ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন মনোনয়নবঞ্চিত জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক সাজ্জাদ হোসেন ওরফে লাভলু সিদ্দিকীর অনুসারীরা। প্রায় দুই ঘণ্টা অবরোধের কারণে এক্সপ্রেসওয়ের উভয় পাশে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। বিক্ষোভকারীদের দাবি, বিএনপি ঘোষিত প্রার্থী কামাল জামানকে পরিবর্তন করে লাভলু সিদ্দিকীকে মনোনয়ন দিতে হবে। কামাল জামান শিবচর উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক।
এ বিষয়ে সাজ্জাদ হোসেন ওরফে লাভলু সিদ্দিকী বলেন, যারা ‘জয় বাংলা’ বলে এখনো, যাদের চৌদ্দ গোষ্ঠী কোনো দিনও বিএনপি করে নাই। তাদের মনোনয়ন দেয় বিএনপি। ৫ আগস্টের আগে কোনো দিন শিবচরে তারা আসেনি। চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে বিএনপির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীকে দলীয় মনোনয়ন না দেওয়ায় তার বিক্ষুব্ধ কর্মী-সমর্থকেরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন। সোমবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী শহীদ মিনার এলাকায় মহাসড়ক অবরোধ করেন তারা।
এ সময় বিক্ষোভকারীরা টায়ার জ্বালিয়ে স্লোগান দেন। এ সময় তারা ‘দুর্দিনের আসলাম ভাই, আমরা তোমায় ভুলি নাই’ ‘আসলাম ভাইয়ের ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’ এমন স্লোগান দেওয়া হয়। এছাড়া মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে অবরোধ করার খবর পাওয়া গেছে। আসনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের নাম ঘোষণা করা হয়।
কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে বিএনপির স্থানীয় সরকারবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেছেন তার অনুসারী নেতাকর্মীরা। সোমবার রাত ৯টার দিকে শহরের মজমপুর রেলগেটে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে এ বিক্ষোভ করেন তারা। সেখানে বিক্ষোভকারীরা সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভের পাশাপাশি প্রতিবাদ মিছিলও করেন।
এছাড়া সদর উপজেলার মধুপুর-লক্ষীপুর এলাকাতেও সোহরাব উদ্দিনের সমর্থকেরা সড়কে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেছেন। এ আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা বিএনপির সদস্যসচিব জাকির হোসেন সরকার।
এ বিষয়ে অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘শুনেছি আমার সমর্থকেরা বিক্ষোভ করছেন। আমি শহরের বাইরে আছি।’
মনোনীত প্রার্থী জাকির হোসেন সরকার বলেন, কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যিনি মনোনয়ন পাবেন, তাঁর পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। তবে এ নির্দেশনা যদি কেউ না মানেন, তাহলে কেন্দ্র ব্যবস্থা নেবে।
মেহেরপুর-২ (গাংনী) আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন দলের একাংশের নেতাকর্মীরা। সোমবার রাত আটটায় গাংনী উপজেলা শহরে কুষ্টিয়া-মেহেরপুর সড়কে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে এ বিক্ষোভ করেন মনোনয়নবঞ্চিত জেলা বিএনপির সভাপতি জাভেদ মাসুদের অনুসারীরা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, উপজেলা বিএনপির দলীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে উপজেলা চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। বিক্ষোভে শতাধিক নেতাকর্মী অংশ নেন। বিক্ষোভের কারণে কিছু সময়ের জন্য শহরের যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
কুমিল্লা-৬ আসনে নির্বাচনের জন্য বিএনপির মনোনয়ন না পাওয়ায় আমিন উর রশিদ ইয়াছিনের কর্মী-সমর্থকরা কুমিল্লা শহরে ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বিক্ষোভ করেছেন। তাদের দাবি, আমিন উর রশিদ ইয়াছিন গত ১৭ বছর বৈরী পরিস্থিতিতে কুমিল্লা সদরে বিএনপিকে আগলে রাখেন। সোমবার রাত ১০টার দিকে কুমিল্লা নগরীর কান্দিরপাড় পূবালী চত্বর এলাকায় এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের আলেখারচর অংশে অবরোধ করে এ বিক্ষোভ মিছিল করা হয়।
এ সময় সমর্থকরা, ‘এই নমিনেশন মানি না, মানব না’, ‘ইয়াছিন ভাই, ইয়াছিন ভাই’ সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এ আসনে মনোনয়ন পান বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক এমপি মনিরুল হক চৌধুরী।
বিএনপি নেতা ও সাবেক এমপি লায়ন হারুনুর রশিদ চাঁদপুর-৫ আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। এর প্রতিবাদে চাঁদপুর-লক্ষ্মীপুর আঞ্চলিক সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীরা। সোমবার রাতে সড়কের ফরিদগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে তারা।
মাগুরা-২ আসনে বিএনপির ঘোষিত প্রার্থী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরীর মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে দলটির নেতাকর্মীরা। সোমবার রাতে আড়পাড়া বাজারে মাগুরা-যশোর মহাসড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে তারা।
সাতক্ষীরা-৩ আসনে কাজী আলাউদ্দীনের মনোনয়ন ঘোষণার পর কালিগঞ্জ ও নলতায় সমর্থকরা বিক্ষোভ করেন, ডা. শহিদুল আলমকে প্রার্থী করার দাবি জানানো হয়। সাতক্ষীরা-২ আসনে আব্দুর রউফের মনোনয়নেও সমর্থকেরা অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
নাটোরে মনোনয়নবঞ্চিত ডা. ইয়াসির আরশাদ রাজনের সমর্থকরা সোমবার রাতে মহাসড়কে আগুন জ্বালান। রাজনের বোন ফারজানা শারমিন পুতুলকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। পুলিশ আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে এবং যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। এক ব্যক্তির ওপর হামলার ঘটনা ঘটে; পরিস্থিতি বর্তমানে শান্ত।
ময়মনসিংহের গৌরীপুরে যাত্রীবাহী হাওর এক্সপ্রেস ট্রেন অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন বিএনপি ঘোষিত প্রার্থী তালিকায় ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর) আসনের বঞ্চিত প্রার্থী আহমেদ তায়েবুর রহমান হিরণের অনুসারীরা। এতে নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ-ঢাকার রেলযোগাযোগ কিছুক্ষণ বন্ধ ছিল।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গৌরীপুর রেলওয়ে স্টেশনে ঢাকাগামী হাওড় এক্সপ্রেস ট্রেনে এই অবরোধের ঘটনা ঘটে। তবে ঘটনার খবরে তাৎক্ষণিক রেলওয়ে থানা পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যাত্রী ভোগান্তির বিষয়টি বিক্ষোভকারীদের বুঝিয়ে রেলপথ থেকে সরিয়ে দেয়। ফলে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হাওড় এক্সপ্রেস ট্রেনটি ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।
এর আগে বিক্ষোভকারীরা মনোনয়নবঞ্চিত সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আহম্মেদ তায়েবুর রহমান হিরণের পক্ষে স্লোগান দেয়। এ সময় তারা গৌরীপুর আসনে প্রার্থী পরির্বতনের দাবি জানান। যে ৬৩ আসন এখনো ঘোষণা বাকি রেখেছে বিএনপি, সেগুলো চূড়ান্ত করার পর এই ক্ষোভ-হতাশা হয় কিছুটা নিরসন হবে, নয় সেটা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা।
ভোরের আকাশ/এসএইচ