নিষ্প্রাণ বিএনপি অফিস

রাজনৈতিক উত্তাপের কেন্দ্রবিন্দু বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়টি যেন এখন নিষ্প্রাণ অফিস- এমনটাই মনে করছেন রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, যে ফটকের সামনে হাজারো নেতাকর্মীর ভিড় থাকত, স্লোগানে মুখরিত হতো রাজপথ, কর্মসূচিসহ রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ের ওপর প্রতিদিন সংবাদ সংম্মেলন হতো আর গণমাধ্যম কর্মীদের ভিড় থাকত, সেখানে এখন শুধুই নীরবতা। অফিসটিতে রয়েছে শুধু মাত্র কর্মকর্তা-কর্মচারী। মাঝে মধ্য দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের দু-চারজন নেতাকর্মী দেখা যায়। তাও চোখে পড়ার মতো নয়- এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের মধ্যদিয়ে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি। ১৭ ফেব্রুয়ারি গঠিত হয় বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এরপর ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। একইসঙ্গে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় দলটির ১০ জন নেতাকে উপদেষ্টা করা হয়।
এছাড়া কিছু নেতা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পান। কাজেই বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা এমপি-মন্ত্রী হওয়ায় চিত্র বদলে গেছে নয়া পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। এমনকি রাজধানীর গুলশানস্থ চেয়ারম্যানের কার্যালয়েও। ভোটের আগে দলটির কার্যলায় দু’টিতেই রাতদিন ভিড় করতেন নেতাকর্মীরা। এখন নেতাকর্মীদের কেউ কেউ ছুটছেন সচিবালয়ে। কেউ কেউ যাচ্ছেন নবনির্বাচিত এমপি ও মন্ত্রীদের বাসায়-বলছেন রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দলটির নয়াপল্টনস্থ কার্যালয়ের প্রাণ ছিল বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী। দিনরাত অফিসটিকে প্রাণবন্ত করে রাখতেন। রাজনৈতিক কর্মসূচিসহ রাষ্ট্রের ও জনগণের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে প্রতিনিয়ত প্রেস ব্রিফিং করতেন। পাশাপাশি ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নেতাকর্মীদের ভিড় থাকত। এমনকি রাজধানী ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নেতাকর্মীরা পার্টি অফিসে আসত।
নেতাকর্মীরা মনে করতো, কোন নেতা পাওয়া না গেলেও রুহুল কবির রিজভী ভাইকে পাওয়া যাবে। রিজভী ভাই সর্বদা অফিসটিকে প্রাণবন্ত করে রাখতো। তার অনুপস্থিতিতে নিষ্প্রাণ আজ পার্টি অফিস ধারণা করছেন বিশিষ্টজনরা।
দলটির সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ ফেব্রুয়ারি শারীরিকভাবে অসুস্থতার কারণে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে। তিনি জ্বর, ঠান্ডা ও শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর কিছুটা সুস্থ হয়ে ১৬ ফেব্রুয়ারি নিজ বাসায় ফিরেন দলটির এই নেতা। চিকিৎসকদের পরামর্শে বর্তমানে তিনি বাসায় বিশ্রাম নিচ্ছেন বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়। নয়াপল্টনের সরগরম দপ্তরটি এখন প্রায়ই নেতাকর্মী শূন্য; অলস সময় কাটাচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, দপ্তরের দায়িত্বে থাকা দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্যার অসুস্থ। সেজন্য অফিস আসছেন না। আর সরকার গঠনের পর নেতারা যেমন আসছেন না, কর্মীরাও আসছেন কম। মনে করেন, আমরা একরকম এতিম হয়ে গেছি। তবে নিষ্প্রাণ অফিসে কিছুটা প্রাণ ফিরে পেয়েছিল গত ২৩ ফেব্রুয়ারি কিছুক্ষণ। নয়াপল্টনস্থ বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের খোজখবর নিতে এসেছিলেন দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অফিসে এলে কর্মী-সমর্থকরা তাকে স্বাগত জানান।
প্রধান ফটকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান বিএনপিরসহ দপ্তর সম্পাদক মুনির হোসেন, তারিকুল ইসলাম ও বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান। পরে বিএনপি মহাসচিব তিন তলায় নিজের চেম্বারে গিয়ে বসেন। সেখানে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য সালেহ উদ্দিন, হিন্দু, বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্টের সহ-সভাপতি তপন কুমার মজুমদারসহ অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ফুল দিয়ে বিএনপি মহাসচিবকে স্বাগত জানান। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজ কর্মের খোঁজখবর নেন এবং সকলকে নিয়মিত অফিসে থাকার তাগিদ দিলেন মহাসচিব। মহাসচিব প্রায় ৪৫ মিনিট অবস্থানের পর সচিবালয়ের উদ্দেশ্যে দলীয় অফিস ত্যাগ করেন।
এ প্রসঙ্গে বিএনপি দফতরের কর্মকর্তা রেজাউল করীম বলেন, গত ছয়দিন একেবারে ফাঁকা ছিল, নেতাকর্মী কেউ সেভাবে আসেনি। আমাদের কাজ-কর্ম ছিল না। তবে ২৩ ফেব্রুয়ারি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্যার আসছিলেন, সেদিন অনেকে আসছেন, স্লোগান দিয়েছিলেন, গম গম করছিল অফিস। এরপর থেকে আবার নেতাকর্মী কম।
মহানগর বিএনপির কর্মী আবদুল হালিম বলেন, মহাসচিব আসবেন জেনে ওইদিন সকাল ১০টায় পার্টি অফিসে এসেছি। সঙ্গে আরও কয়েকজন এসেছে। তবে ৪৫ মিনিটির পরই আবার অফিসের কর্মচারীদের অলস সময় পার করা, নিয়মিত কর্মব্যস্ততা না থাকা, এবং রাজনৈতিক কোলাহলহীনতা হয়ে পড়ে।
নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা বিএনপিকর্মী তোবারক হোসেন বললেন, এসেছিলাম পার্টি অফিসে, কেউ নেই। তিনতলায় গিয়ে দেখায়ায় সব ফাঁকা, খাঁ খাঁ করেছে। দল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিয়ে সরকার গঠন করেছে। এখনই যদি দলের এই দশা হয়, নেতারা যদি নয়াপল্টনের অফিসের ঠিকানা ভুলে যান; তাহলে আমরা যাব কোথায়? বিএনপির অফিস কর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেল, দলের নেতারা এখন আর কার্যালয়ে আসেন না।
কার্যালয়ের নিচে দাঁড়ানো রফিক নামে এক কর্মী বলেন, আগে এমন দেখা গেছে যে-সকালে বলেন, বিকালে বলেন, সন্ধ্যায় বলেন, কোনো না কোনো নেতা থাকতেন।
নিরাপত্তা কর্মীরা জানান, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এরপর নেতারা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। সেদিন নেতারা না এলেও কর্মীদের অনেকেই এসেছিলেন। এরপর অফিসে তেমন কেউ আসেননি।
বিএনপি সমর্থক কলিম উদ্দিন বলেন, আমি শাহজাহানপুর কলোনিতে সাবলেট থাকি। প্রতিদিন বিএনপি অফিসের কাছ দিয়ে যাই। গত ১৬-১৭ বছর দেখেছি এই অফিসে নেতাকর্মীদের ভিড় আছেই। নেতাদের গাড়িও দেখা গেছে পার্টি অফিসের সামনে। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে দেখছি যে, বিএনপি অফিসের কর্মী সেভাবে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাবেক এক যুবদল নেতা বলেন, নয়াপল্টনে ভিড় কমেছে, সচিবালয়মুখী নেতাকর্মীরা : ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে জেল, জুলুম, অত্যাচার, নির্যাতন এবং দমনপীড়নের সময়ও সরব ছিল রাজধানীর নয়াপল্টনের বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয়। এখন দলের সুসময়ে নেতাকর্মীর ভিড় আগের চেয়ে কমেছে। এমপি-মন্ত্রী হওয়া নেতারা এখন কম আসছেন। বিএনপি’র কেন্দ্রীয় দপ্তরের দায়িত্বে থাকা দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অসুস্থ। সেজন্য তিনি কার্যালয়ে আসছেন না।
গত ২৩ শে ফেব্রুয়ারি দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যান। ওইদিন নেতাকর্মীদের ভিড় ছিল। পরের দিন অবশ্য ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের পাশাপাশি দলের গুলশানের কার্যালয়েও আগের মতো ভিড় নেই। তবে কিছু নেতাকর্মী এখন সচিবালয়মুখী হয়েছেন। তারা ফুল নিয়ে মন্ত্রীদের শুভেচ্ছা জানাতে যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ কোনো কারণ ছাড়াই এলাকার পরিচয়ে মন্ত্রীদের দপ্তরে যাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দল আর সরকার এক নয়। সরকার তার কাজ করবে। আর কর্মসূচিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড ও কথার জবাব দেওয়ার দায়িত্ব কিন্তু দলটির নেতাদের। যা মন্ত্রীসভার নয়। কাজেই দলের কর্মকাণ্ড সরব করতে হলে নেতাদের কার্যালয়মুখী হওয়া জরুরি।
ভোরের আকাশ/এসএইচ