জাতীয় সংসদ নির্বাচন
প্রচারে নেই জৌলুস

আর মাত্র ১৬ দিন পরই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ ৫১টি দল এবং স্বতন্ত্র মিলিয়ে ভোট যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন প্রায় দুই হাজার প্রার্থী। বুধবার রাত থেকেই প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন ভোটের মাঠে থাকা প্রার্থীরা। দেশজুড়ে পুরোদমে প্রচার-প্রচারণা চললেও অপূর্ণতা রয়েছে সাধারণ ভোটারসহ জনমনে-এমনই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যে উৎসবমুখর পরিবেশ ও উদ্দীপনা থাকার কথা, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় নেই সেই চিরচেনা জৌলুস, বরং ভোটারদের মাঝে বিরাজ করছে চরম বিভ্রান্তি ও উদাসীনতা। অনেক এলাকায় খেটে খাওয়া দিনমজুরসহ সাধারণ ভোটাররা এমনকি তাদের প্রার্থীর নাম বা পরিচয় পর্যন্ত জানেন না বলে এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন তারা।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিদের্শনা মতে, পোস্টার বিহীন ভোটের প্রচার-প্রচারণা অনেকটাই জৌলুস হারিয়েছে। ভোটাররাও বুঝতে পারছেন না নির্বাচনের আমেজ। পোস্টার না থাকায় অনেকেই বিভিন্ন দলের বা স্বতন্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের চিনতে পারছেন না। নির্বাচনে প্রার্থী ও তার কর্মী-সমর্থকদের সামনা-সামনি প্রচারের চেয়ে বেশি প্রাধান্য পেতে স্কুল, কলেজ, হাট-বাজার, বাড়ি-বাড়ি, ঘরে-ঘরে এমনকি পাড়া, মহল্লার সর্বত্র প্রার্থীর ছবি, নাম ও প্রতীক সম্বলিত পোস্টার সাটানো থাকতো। শুধু ভোটারাই নয় ছোট শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধা পর্যন্ত প্রার্থী ও তার নামসহ প্রতীক সহজেই চিনে ফেলতো। ভোটের প্রচার-প্রচারণার ক্ষেত্রে এইটাই ছিল সর্ব্বোচ জৌলস। কিন্তু নির্বাচনী মাঠে নেই সেই চিরচেনা জৌলুস। কাজেই প্রচার-প্রচারণায় নিষ্প্রাণ ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে ভোটারদের মনে- এটাই মনে করছেন বিশিষ্টজনরা।
সরেজমিনে সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাড়া-মহল্লায় পোস্টার বা প্রচারণার অভাবে তারা প্রার্থীর পরিচয় নিয়ে ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছেন। ভোটারদের বড় একটি অংশের প্রশ্ন-যিনি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন, তিনি কি তাদের এলাকার লোক নাকি বহিরাগত? আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি কিংবা জামায়াত- কোন দল থেকে কে দাঁড়িয়েছেন বা কারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন, তা খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে, প্রচারণার ডিজিটাল মাধ্যমগুলোও সব শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছে। বর্তমান যুগে তথ্য আদান-প্রদানের অন্যতম মাধ্যম স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট হলেও, দেশের একটি বড় অংশের সাধারণ মানুষের কাছে এই প্রযুক্তি নেই। ফলে অনলাইনে কী প্রচারণা চলছে বা প্রার্থীরা কী বলছেন, তা সাধারণ ভোটারদের অগোচরেই থেকে যাচ্ছে। ভোটারদের ভাষ্যমতে, ‘এই মোবাইল তো সবার কাছে নাই। মোবাইল না থাকলে প্রার্থীর খবর জানমু কেমনে?
এমন এক পরিস্থিতিতে ভোটাররা বলছেন, তারা যারে ভালো লাগে তাকেই ভোট দিতে চান, কিন্তু প্রার্থীর চাক্ষুষ উপস্থিতি বা প্রচারণায় দৃশ্যমান পরিচিতি না থাকলে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। বিগত আওয়ামী সরকারের সময় ভোটে কে দাঁড়ালো আর ভোট কখন হবে এটা নিয়ে কারো মাথা ব্যথা থাকতো না। কারণ ভোটারদের ভোট দেওয়া লাগেনি। ঠিক তখন প্রচার-প্রচারণাও তেমন হতো না, আন্দোলনের মুখে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার পলায়নের পর পোস্টার বিহীন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও পাড়া, মহল্লায় অর্থাৎ গ্রাম-গঞ্জে উৎসবের আমেজ কম দেখা যাচ্ছে। সৃষ্টি হয়নি ভোটের আনন্দঘন পরিবেশ।
ইসি সূত্র জানা গেছে, আচরণবিধিতে সংশোধন এনে গত ১০ নভেম্বর গেজেট জারি করে নির্বাচন কমিশন। এতে বলা হয়েছে, ভোটের প্রচারণায় রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা কোনো ধরনের পোস্টার ব্যবহার করতে পারবেন না। তবে পোস্টারের ব্যবহার বন্ধ করলেও প্রার্থীরা লিফলেট, হ্যান্ডবিল, বিলবোর্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন ব্যবহার করতে পারবেন। এসব লিফলেট, বিলবোর্ড বা ফেস্টুনে রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে দলীয় প্রধান ছাড়া অন্য কারো ছবিও ব্যবহার করা যাবে না।
প্রথমবারের মতো পোস্টার ছাড়াই চলছে সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা। রাজধানী ঢাকার কয়েকটি নির্বাচনী আসনের চিত্র দেখা গেছে। শুধু পোস্টারই নয়, বিলবোর্ডও চোখে পড়েনি কোথাও। এ প্রসঙ্গে মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা রফিক আলম বলেন, পোস্টার ছাড়া জাতীয় নির্বাচন কেমন যেন ফ্যাকাসে লাগছে। কে দাঁড়াইছে না দাঁড়াইছে বুঝতে পারছি না। ভোটের প্রচারণার কোনো আমেজ নেই। ঢাকা-৭ আসনের বাসিন্দা নিজাম উদ্দিন (৭৫)। দীর্ঘ দিন এলাকায় চা বিক্রি করেন। পোস্টার না থাকায় তিনিও এখনো নির্বাচনের আমেজ আঁচ করতে পারছেন না।
এ সময় শফিকুল ইসলাম নামের একজন বলেন, সকল প্রার্থীকে চিনতে পারি না। অনলাইনে প্রচার কীভাবে বুঝবো। সবার কাছে তো স্মার্ট ফোন নাই। আমার এলাকায় কে ভোটে দাঁড়িয়েছে আমি চিনতে পারছি না।
ঢাকা-৮ আসনে বাসিন্দা রিকশাচালক জমির বাদশা। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় রিকশা চালিয়ে জীবনধারণ করেন তিনি। তিনি বলেন, পোস্টার না হলে জাতীয় নির্বাচনে কাকে ভোট দিমু। ভোটে কে খাঁড়াইলো, নিজেগো লোক খাঁড়াইলো নাকি বাইরের লোক খাঁড়াইলো কিছু তো বুঝি না। আমরা ভোটটা দিমু কারে, পোস্টার না থাকলে প্রার্থী ক্যারা খাঁড়াইছে আমরা জানমু ক্যামতে। পোস্টার থাকলে তো মার্কা ও চেহারা দেইখা বুঝন যায়।
ভোলার লালমোহন থেকে আসা মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন। তার বয়স ৬০ ছুঁই ছুঁই। থাকেন ঢাকার মোহাম্মদপুরের সাত মসজিদ হাউজিং এলাকায়। কথা হলে তিনি বলেন, ভোটের আমেজ বোঝা যাচ্ছে না। পোস্টার ছাড়া নির্বাচন আরও খারাপ লাগছে। প্রচারণা শুরু হয়েছে কি না কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে গত ২২ জানুয়ারি থেকে সারাদেশে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, এই প্রচারণা চলবে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত এবং ভোটগ্রহণ শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগে সব ধরনের প্রচার কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে।
ইসি জানিয়েছে, প্রচারণাকালে প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোকে কঠোরভাবে আচরণ বিধিমালা মেনে চলতে হবে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের প্রণীত ‘রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা ২০২৫’-এর বিধি ৬ (ঙ)-এ স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিধিমালায় বলা হয়েছে, জনগণের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে- এমন কোনো স্থান, সড়ক, মহাসড়ক বা জনপথে জনসভা, পথসভা কিংবা যেকোনো ধরনের সমাবেশ করা যাবে না। একই নিষেধাজ্ঞা প্রার্থী বা রাজনৈতিক দলের পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
বিধিমালার বিধি ৬ অনুযায়ী নির্বাচনী প্রচারণা সংক্রান্ত প্রধান নির্দেশনাগুলো হলো : প্রচারণার ক্ষেত্রে সব প্রার্থী সমান অধিকার পাবেন এবং প্রতিপক্ষের কোনো কর্মসূচিতে বাধা বা ভীতি প্রদর্শন করা যাবে না।
কর্মসূচি সমন্বয় ও অনুমতি : প্রচারণা শুরুর আগে রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীকে তাদের বিস্তারিত কর্মসূচি প্রস্তাব আকারে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হবে। একই সময়ে ও একই স্থানে একাধিক দল বা প্রার্থী কর্মসূচি পালন করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা সমন্বয় করবে। এছাড়া জনসভার দিন, সময় ও স্থান নিয়ে কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি নিতে হবে। আবেদনের ক্রম অনুযায়ী এই অনুমতি দেওয়া হবে এবং অনুমতির কপি স্থানীয় নির্বাচন অফিসে জমা দিতে হবে। সভার কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা আগে স্থানীয় পুলিশকে বিষয়টি জানাতে হবে। এছাড়া একটি জনসভায় ৩টির বেশি মাইক্রোফোন বা লাউড স্পিকার ব্যবহার করা যাবে না।
পোস্টার, লিফলেট ও ব্যানারের বিধিনিষেধ : নির্বাচনী প্রচারণায় কোনো প্রকার পোস্টার ব্যবহার করা যাবে না। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর অপচনশীল দ্রব্য যেমন রেক্সিন, পলিথিন বা প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি কোনো প্রচারপত্র, লিফলেট বা ব্যানার ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ডিজিটাল মাধ্যম ছাড়া অন্য সব প্রচার সামগ্রী (ব্যানার, লিফলেট, ফেস্টুন) অবশ্যই সাদা-কালো রঙের হতে হবে। ব্যানারের আকার সর্বোচ্চ ১০ ফুট বাই ৪ ফুট, লিফলেট এ-ফোর সাইজ এবং ফেস্টুন ১৮ ইঞ্চি বাই ২৪ ইঞ্চি হতে হবে। এসব সামগ্রীতে প্রার্থী নিজের ছবি ও প্রতীক ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করতে পারবেন না।
যানবাহন ও স্থাপনায় নিষেধাজ্ঞা : কোনো দালান, দেয়াল, গাছ, বেড়া, বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের খুঁটি বা সরকারি স্থাপনায় কোনো প্রকার লিফলেট বা ফেস্টুন লাগানো যাবে না। এছাড়া বাস, ট্রাক, ট্রেন, স্টিমার, লঞ্চ, রিকশা বা অটোরিকশাসহ কোনো যানবাহনেই প্রচারণা সামগ্রী সাঁটানো যাবে না। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর ফেস্টুন, ব্যানার ও বিলবোর্ডের ওপর অন্য কোনো প্রার্থীর প্রচারণা সামগ্রী টাঙানো যাবে না। একইসঙ্গে এসব ফেস্টুন বা ব্যানারের কোনো প্রকার ক্ষতিসাধন, বিকৃতি বা বিনষ্ট করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
মিছিল ও শোডাউন : নির্বাচনী প্রচারণায় বাস, ট্রাক, নৌযান বা মোটরসাইকেলসহ কোনো যান্ত্রিক বাহন নিয়ে মিছিল, জনসভা বা শোডাউন করা যাবে না। এমনকি যেকোন ধরনের মশাল মিছিলও নিষিদ্ধ। দলীয় প্রধান বা সাধারণ সম্পাদক পদমর্যাদার ব্যক্তিরা যাতায়াতের জন্য হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে পারলেও সেখান থেকে লিফলেট, ব্যানার বা অন্য কোনো প্রচার সামগ্রী প্রদর্শন, বিতরণ বা নিক্ষেপ করা যাবে না।
তোরণ, ক্যাম্প ও দেয়াল লিখন : কোনো প্রকার গেইট বা তোরণ নির্মাণ করা যাবে না। চলাচলের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এমন কোনো ক্যাম্প বা স্থাপনা তৈরি করা নিষিদ্ধ। এছাড়া কোনো দেয়ালে লিখে বা ছবি এঁকেও নির্বাচনী প্রচারণা চালানো যাবে না।
বিলবোর্ড ব্যবহারের শর্ত : প্রচারণায় বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে, তবে প্রচার অংশের আয়তন সর্বোচ্চ ১৬ ফুট বাই ৯ ফুট হতে হবে। সংসদীয় আসনের প্রতিটি ইউনিয়ন, পৌরসভা বা মেট্রোপলিটন ওয়ার্ডে একটি করে তবে পুরো নির্বাচনী এলাকায় সর্বোচ্চ ২০টির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে না।
আচরণ ও উপাসনালয়ের পবিত্রতা : প্রচারণাকালে ব্যক্তিগত কুৎসা রটনা, অশালীন ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য বা চরিত্র হনন এবং লিঙ্গ, সাম্প্রদায়িকতা বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে এমন কোনো উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া যাবে না। মসজিদ, মন্দির, গির্জা বা প্যাগোডাসহ কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়, সরকারি অফিস বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো প্রচারণা চালানো যাবে না। এছাড়া ভোটারদের প্রভাবিত করতে কোনো প্রকার বলপ্রয়োগ বা অর্থ ব্যয় করা যাবে না। এছাড়া ভোটারদের প্রভাবিত করতে কোনো প্রকার বলপ্রয়োগ বা অর্থ ব্যয় করা যাবে না।
ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও শান্তি রক্ষা : নির্বাচন উপলক্ষ্যে কোনো নাগরিকের জমি, ভবন বা অন্য কোনো স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তির কোনো প্রকার ক্ষতিসাধন করা যাবে না। এছাড়া অনভিপ্রেত গোলযোগ ও উচ্ছৃঙ্খল আচরণের মাধ্যমে কারও শান্তি বিনষ্ট করা যাবে না।
ভোরের আকাশ/এসএইচ