ইশতেহার ঘোষণায় তারেক রহমান
মানবিক ও সমৃদ্ধশালী দেশ গঠনে অঙ্গীকার বিএনপির

রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শন হিসেবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে একটি ইনসাফ-ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে সুদৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে দলটি। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে এই ইশতেহার ঘোষণা করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। অনুষ্ঠানে ইশতেহারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন বিএনপির চেয়ারম্যান। আসন্ন নির্বাচনে তারেক রহমান দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং এটিই তার প্রথম ইশতেহার। বেলা সাড়ে তিনটায় কোরআন তেলোয়াতের মধ্যে দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এ সময় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, জিয়াউর রহমানের ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং বিগত আন্দোলনে বিএনপির শহীদ নেতাকর্মী ও জুলাই গণ- অভ্যুত্থানে শহীদদের জন্য আল্লাহর দরবারে হাত তুলে মোনাজাত করা হয়। এরপরে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে এবং দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খানের পরিচালনা আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ড. আব্দুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সেলিমা রহমান, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, চেয়াম্যানের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন, মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুম্মন, শায়রুল কবির খান প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইশতেহারে ‘করব কাজ, গড়ব দেশ’ প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে বিএনপি। এই ইশতেহারের শ্লোগান হলো ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।
আগামী দিনে ক্ষমতায় গেলে ইশতেহারে ৯টি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে বিএনপি। ইশতেহারকে পাঁচটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। এতে মোট ৫১টি দফাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। ইশতেহারে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বিস্তৃত সংস্কার ও সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, প্রবাসী কার্ড চালু, জনগণের কল্যাণে বহুমুখী সহায়তা কর্মসূচি, যুবকদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং জাতি গঠনে ‘ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনসহ দেশের কাঠামো ও পরিবেশের উন্নয়নে নানা পরিকল্পনা।
ইশতেহারে আওয়ামী লীগের শাসনামলে পুঁজিবাজারে সংঘটিত অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির তদন্ত, খতিব-ইমাম-মুয়াজ্জিনদের মাসিক সম্মানী প্রদানসহ বিভিন্ন জনমুখী ইস্যুকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় না দেওয়া, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের নির্ভুল তালিকা প্রণয়ন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। নারী ও তরুণদের আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইশতেহারের বিষয়বস্তু চূড়ান্ত করা হয়েছে।
বিএনপি জানায়, দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, প্রয়াত চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফা এবং জুলাই জাতীয় সনদের সমন্বয়েই এই নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে। দলটির ইশতেহারে বলা হয়, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতাকে সমুন্নত রেখে ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠাই বিএনপির মূল লক্ষ্য। মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে একটি ইনসাফ-ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে দলটি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০, তারেক রহমানের রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা এবং জুলাই জাতীয় সনদে যেসব বিষয়ে যে আঙ্গিকে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো সেভাবেই বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
নির্বাচন ব্যবস্থা ও সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করে বিএনপি বলেছে, ‘ভোটকে রাষ্ট্রক্ষমতায় একমাত্র বৈধ উৎস হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে। নির্বাচন ব্যবস্থা ও সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলা হবে। ফ্যাসিবাদ ও বিদেশি তাঁবেদারিত্বের কোনো পুনরাবৃত্তি আর হতে দেওয়া হবে না। সমাজের সব স্তরে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করে সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে একটি প্রকৃত জনকল্যাণমূলক সরকার গঠন করা হবে। একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংরক্ষণ ও বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে নিবিড় জরিপের ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের নির্ভুল তালিকা প্রণয়নের অঙ্গীকার করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা ও এর স্মৃতি সংরক্ষণ করা হবে। মুক্তিযোদ্ধা উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়া হবে।
এছাড়া, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও গত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে শহীদদের নিজ নিজ এলাকায় তাদের নামে সরকারি স্থাপনার নামকরণ করা হবে। আন্দোলনে যারা পঙ্গু হয়েছেন বা চোখ হারিয়েছেন, তাদের স্বীকৃতি, উন্নত চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানে সহায়তা দেওয়া হবে। শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের সার্বিক সহায়তা নিশ্চিত করা হবে এবং তাদের কল্যাণে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি পৃথক বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হবে। রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতে ঘোষিত ৩১ দফার আলোকে ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক ও পুনর্বাসনমূলক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় একটি ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে। সুশাসন ও উন্নয়নের মূল ভিত্তি হিসেবে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা বলেছে বিএনপি।
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর ও উপ-রাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব: জনগণের ভোটে রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর এবং উপ-রাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টি করতে চায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। একই সঙ্গে সংসদের উচ্চকক্ষ প্রবর্তন, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং উচ্চকক্ষে ২০ শতাংশ নারী অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে দলটি। জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঘোষিত ইশতেহারে এসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি।
ইশতেহারের রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কার অংশে বলা হয়েছে, সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সংবিধানে পুনঃস্থাপন করা হবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অগণতান্ত্রিক সংশোধনী বাতিল, ৩১ দফার ভিত্তিতে সংস্কার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল, উপ-রাষ্ট্রপতি পদ সৃজন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংসদে উচ্চকক্ষ প্রবর্তন, বিরোধীদলীয় ডেপুটি স্পিকার, উচ্চকক্ষে ২০ শতাংশ নারী, ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে সংস্কার করবে দলটি।
এছাড়া ৩১ দফা ও জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন, মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস এবং ন্যায়পরায়ণ বাংলাদেশ গঠনে ফ্যাসিবাদ ও তাঁবেদারিত্বের পুনরাবৃত্তি দমন, বৈষম্য দূরীকরণ ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, ভোটকে রাষ্ট্রক্ষমতার একমাত্র বৈধ উৎস হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, রাষ্ট্রের প্রত্যেক স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলসমূহকে সঙ্গে নিয়ে জনকল্যাণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠন করা হবে, গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে ভবিষ্যৎমুখী এক নতুন ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চায় বিএনপি।
রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষ্যে বিএনপির ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে, বিএনপি বিশ্বাস করে জাতি গঠন মানে কেবল রাষ্ট্র পরিচালনা নয়, বরং বিভাজন অতিক্রম করে একটি অভিন্ন জাতীয় সত্তা নির্মাণ। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের অবসান ঘটানো, আমাদের একটাই পরিচয় আমরা সবাই বাংলাদেশি, বাংলাদেশের মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, পাহাড়ের মানুষ, সমতলের মানুষ, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই মিলে গড়ে তোলা হবে জাতীয় ঐক্য ও অখণ্ড জাতীয় সত্তা এবং ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন গঠন করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে বিএনপি।
সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ-উগ্রবাদ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা: নির্বাচনকে সামনে রেখে ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ (জিরো টলারেন্স) নীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটি জানিয়েছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেলে তারা দুর্নীতির সঙ্গে কোনো প্রকার আপস করবে না এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সুদূরপ্রসারী সংস্কার পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
ইশতেহারে বলা হয়েছে, বিএনপি মনে করে, সুশাসন উন্নয়নের মূল ভিত্তি। রাষ্ট্রের সর্বস্তরে আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। শাসন ও বিচার ব্যবস্থার ভিত্তি হবে ইনসাফ। সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে মেধাভিত্তিক, স্বচ্ছ, দক্ষ ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তোলা হবে, দুর্নীতি ও অর্থপাচার দমন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি মহান মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা বিএনপির সুশাসন দর্শনের মূল। দুর্নীতি দমন এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ হবে সর্বপ্রথম অগ্রাধিকার।
বিএনপির সুদূর প্রসারী পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশ সারাবিশ্বে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কলঙ্ক থেকে মুক্তি পায় দাবি করে দলটির ঘোষিত ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে, বিএনপি ২০০১ সলে যখন ক্ষমতা গ্রহন করে তখন দেশটি দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন ছিল, ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে বিএনপি যখন রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়, তার অনেক আগেই বিশ্বে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়নের অপবাদ থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ ইমার্জিং টাইপার হিসেবে স্বীকৃতি পায়।’
ইশতেহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এরই ধারাবাহিকতায় বিএনপি দুর্নীতির সাথে কোন আপস করবে না। সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার জন্য পদ্ধতিগত ও আইনের সংস্কারের পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। উন্মুক্ত দরপত্র, রিয়েল টাইম অডিট, প্রকল্পের ‘পারফরম্যান্স অডিট’ এবং সিঙ্গেল-উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স বাস্তবায়ন করা হবে। অর্থপাচার রোধ ও ফ্যাসিবাদী আমলের পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরত আনতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
আইনের শাসনের নামে কোনো প্রকার কালা-কানুনের শাসন কিংবা বেআইনি নিপীড়ন গ্রহণযোগ্য হবে না, দলটির এমন শক্ত অবস্থান ব্যক্ত করে ইশতেহারে বলা হয়েছে, ‘বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ বাতিল করা হবে। জুলাই-আগস্ট-২০২৪ গণ-অভ্যুত্থানসহ ফ্যাসিস্ট আমলের মানবতা বিরোধী অপরাধের সুবিচার নিশ্চিত করা হবে। সে সকল হত্যাকাণ্ডের অনুসন্ধান শুরু করে দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা হবে। গুম প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আইনানুগ ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হবে। মেধাভিত্তিক মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ পড়তে স্বচ্ছভাবে সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা হবে।
এমনকি প্রশাসনিক সংস্থার কমিশন গঠন ও পিএসসি-কে শক্তিশালীকরণ, জবাবদিহিমূলক ও দলীয়করণমুক্ত জনপ্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে। বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে। দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত বিচার প্রাপ্তি ও বিচার সেবার আধুনিকায়ন করা হবে। বিচারপতি নিয়োগ আইন প্রণয়ন ও জুডিশিয়ান কমিশন গঠন করা হবে। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হবে। একই সঙ্গে পুলিশকে জনবান্ধব ও সেবাবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা হবে। অনলাইন অভিযোগ দায়ের ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং পুলিশ কমিশন আইন পুনঃনিরীক্ষণ করা হবে।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের প্রাণকেন্দ্র উল্লেখ করে বিএনপি’র ইশতেহারে বলা হয়, স্থানীয় সমস্যা স্থানীয় পর্যায়েই সমাধানের নীতি অনুসরণ করে শক্তিশালী ও কার্যকর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। যেখানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা বাড়ানো হবে, পর্যাপ্ত অর্থায়নের মাধ্যমে জনগণের হাতে প্রকৃত ক্ষমতা ন্যস্ত করা হবে এবং উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ে অন্তত একবার উন্মুক্ত জনসভার আয়োজন করা হবে। বিলবোর্ডসহ উন্মুক্ত মাধ্যমে স্থানীয় সেবা সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করে স্বচ্ছতা ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।
দারিদ্র্য নিরসন ও সামাজিক সুরক্ষায় বিএনপি মানবিক, ন্যায়সংগত ও মর্যাদা ভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছে। যেখানে রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিকের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবে। পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মৎস্যজীবী ও প্রাণিসম্পদ খামারিদের ‘পেশাভিত্তিক কার্ড’ প্রদান করা হবে। দারিদ্র্য নিরসন ও সামাজিক সুরক্ষার আওতা সম্প্রসারণ ও সুশাসন বাস্তবায়ন করা হবে।
ইশতেহারে ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতে নিয়োজিত ব্যক্তিদের বার্ধক্যের দুর্দশা লাঘবের জন্য কার্যকর পেনশন ফান্ড গঠন, দারিদ্র্যপীড়িত ও পিছিয়ে থাকা অঞ্চলে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জাতীয় নাগরিক সেবা নিশ্চিতকরণ, পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি হতদরিদ্র ও এতিম শিশুদের কল্যাণে একটি বিশেষ তহবিল গঠনের কথাও বলা হয়েছে।
সরকার গঠন করতে পারলে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পরিবারের প্রধান নারী সদস্যের নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদান, স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা এবং নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিকাশে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের অঙ্গীকার করেছে বিএনপি। কৃষি উন্নয়ন ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সার্বিক সুরক্ষা দেওয়া হবে। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে ইশতেহারে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ চালুর কথা বলেছে বিএনপি।
এছাড়াও বেকারভাতা প্রদান এবং কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা, হাইস্কুল, সরকারি অফিস, গ্রামীণ ডিজিটাল সেন্টার, হাসপাতাল, রেলস্টেশন ও বিমানবন্দরসহ জনবহুল স্থানে বিনামূল্যে ইন্টারনেট চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং ক্যারিয়ার সেন্টার স্থাপন করার কথা দলটির ইশতেহারে বলা হয়েছে।
বিএনপির পররাষ্ট্রনীতি হবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’: আগামী নির্বাচনে জনগণের ভোটে রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেলে পররাষ্ট্রনীতিতে ‘সবার আগে বাংলাদেশ নীতি ধরেই আগামীতে পথ চলবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। নির্বাচনী ইশতেহারে পররাষ্ট্রনীতির রূপরেখায় তুলে ধরে এ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে দলটি।
এতে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির অঙ্গীকার করা হয়, যেখানে সব আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সম্পৃক্ততায় জাতীয় সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং জনগণের কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বিএনপি সকল রাষ্ট্রের সঙ্গে সমতা, ন্যায্যতা, বাস্তবধর্মী ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে এবং আন্তর্জাতিক বিধি-বিধান অনুযায়ী দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেবে।
ইশতেহারে বিএনপি উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশের সীমান্তের বাইরে ‘বন্ধু আছে, প্রভু নেই। দলটি জোর দিয়ে বলেছে, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং নাগরিকদের কল্যাণ-এই বিষয়গুলোই তাদের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে থাকবে।
নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি জানিয়েছে, সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে বাংলাদেশ একটি আত্মমর্যাদাশীল, সক্রিয় ও দায়িত্বশীল বৈশ্বিক ভূমিকা পালন করবে।
দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্ক প্রসঙ্গে বিএনপি বলেছে, আন্তর্জাতিক বিধি ও নিয়ম মেনে সমতা, বাস্তববাদ এবং পারস্পরিক স্বার্থের স্বীকৃতির ভিত্তিতে সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলায় তারা গুরুত্ব দেবে। আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে দলটি জানিয়েছে, বাংলাদেশ অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না এবং নিজের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো হস্তক্ষেপ সহ্য করবে না। ইশতেহারে অর্থনৈতিক কূটনীতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থা, জোট ও উদীয়মান আঞ্চলিক ব্লকের সঙ্গে নতুন বাজারে প্রবেশ এবং অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনে বিএনপি উদ্যোগ নেবে। বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং শিল্পখাতে মূল্য সংযোজন বাড়াতে কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে দক্ষ বাংলাদেশি জনশক্তির প্রবেশাধিকার বাড়াতে শ্রম ও অভিবাসন কূটনীতি জোরদার করা হবে।
বৈশ্বিক বাণিজ্য ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে বিএনপি জানিয়েছে, প্রধান বৈশ্বিক শক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে নিরলস প্রচেষ্টা চালানো হবে। রপ্তানি বহুমুখীকরণ, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং শুল্ক ও বাণিজ্য সুবিধা সুরক্ষায় কার্যকর কূটনীতি গ্রহণের অঙ্গীকার করা হয়েছে। কৃষি ও শিল্পের কাঁচামাল নিশ্চিত করতে এবং বাণিজ্য সম্পর্ক বৈচিত্র্য আনতে দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে। বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা—জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা, উপকূলীয় নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তি-মোকাবিলায় আঞ্চলিক কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদার করা হবে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বিষয়ে বিএনপি জানিয়েছে, সমতা, সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের ভিত্তিতে পারস্পরিক সম্মান ও বোঝাপড়ার ওপর দাঁড়িয়ে সম্পর্ক গড়ে তুলতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যে তাদের উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলেও জানানো হয়েছে। সীমান্তবর্তী নদীর পানিবণ্টন প্রসঙ্গে বিএনপি অঙ্গীকার করেছে, পদ্মা, তিস্তা এবং বাংলাদেশের সব আন্তঃসীমান্ত নদীর ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা হবে। সীমান্ত নিরাপত্তা বিষয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জনগণের ওপর যেকোনো হামলা অগ্রহণযোগ্য এবং জাতীয় সীমান্ত সুরক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
ইশতেহারে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বিএনপির ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সম্পর্ক আরও গভীর ও শক্তিশালী করতে আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি)ভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে বিএনপি। এতে উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বৃত্ত পুঁজি এবং বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা ও মানবসম্পদ একত্র করে অর্থনৈতিক সংহতি গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব অংশীদারিত্বের আওতায় পারস্পরিক খাদ্য নিরাপত্তা, ডিজিটাল রূপান্তর, সাইবার নিরাপত্তা এবং সামরিক শিল্প ও প্রশিক্ষণে সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বিএনপি জানিয়েছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে শক্তিশালী করতে জনবল নিয়োগ বৃদ্ধি, বিদেশে মিশন কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন স্তরে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মন্ত্রণালয় ও বিদেশস্থ বাংলাদেশ মিশনগুলোর মানবসম্পদ, ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা ও দক্ষতা উন্নয়ন করা হবে। সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স)-এর নীতিতে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার কথা বলেছে বিএনপি। আইনগত ব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিক ও প্রতিরোধমূলক কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে এসব হুমকি সম্পূর্ণরূপে দমন করা হবে। অর্থনীতিতে গণতন্ত্র ফেরাতে অলিগার্কিক কাঠামো (মুষ্টিমেয় গোষ্ঠী বা ব্যক্তির হাতে অর্থনীতি কুক্ষিগত থাকা) ভেঙে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ঋণনির্ভর অর্থনীতিকে বিনিয়োগমুখী অর্থনীতিতে রূপান্তর করাকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া, ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার অঙ্গীকারও করা হয়েছে বিএনপি’র ইশতেহারে।
ইশতেহারে আরও বলা হয়, বৈদেশিক বিনিয়োগ জিডিপি’র ২ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। এছাড়াও বেসরকারি খাতের উন্নয়নে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং স্টার্ট-আপ খাতে গ্যারান্টি স্কিম, ক্যাশ-ফ্লো ভিত্তিক ঋণ, জেলার ক্যাপিটাল, ক্রাউডফান্ডিং ও ইনস্যুরেন্স কভারেজ বাড়ানো হবে। এই খাতে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা হবে। ব্যাংক খাতের সুশাসন, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার যৌক্তিকীকরণ এবং আস্থা ফেরাতে একটি অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠন করা হবে।
‘পুঁজিবাজার সুরক্ষা কমিশন’ গঠন করা হবে: পুঁজিবাজার সংস্কারে ও উন্নয়নে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন-এর স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা হবে। ‘পুঁজিবাজার সুরক্ষা কমিশন’ গঠন এবং গত ১৫ বছরে পুঁজিবাজারে সংঘটিত অনিয়ম তদন্তে বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরকে ঘিরে সমন্বিত লজিস্টিক হাব প্রতিষ্ঠা করা হবে। শিল্পখাতে বিনিয়োগ সহজ করতে কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন থেকে শুরু করে ব্যাংকিং সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ও সঞ্চালন ক্ষমতা বাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা হবে এবং সঞ্চালন লাইন ২৫ হাজার সার্কিট কিলোমিটারে সম্প্রসারণ করা হবে। পরিকল্পনায় অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক ব্যয় কমানো, ক্যাপাসিটি চার্জ, রেন্টাল ও স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থার পর্যালোচনা, স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করা হবে।
বিএনপি’র ইশতেহারে বলা হয়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়নে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে এবং হার্ডওয়্যার উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করা হবে। এই খাতে ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং সবার জন্য দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা হবে। ভবিষ্যতের গ্রাহক ও ব্যবসায়িক চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে একটি যুগোপযোগী ‘কানেক্টিভিটি ম্যানেজমেন্ট’ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হবে। রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এটি স্বল্পমেয়াদে ২ শতাংশ এবং মধ্যমেয়াদে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হবে। সরকারের ব্যয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা, রাজস্ব ব্যবস্থার ন্যায্যতা ও রাষ্ট্রীয় বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে।
দলটি বলেছে, দেশের সব অঞ্চলে সমতাভিত্তিক সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বিএনপি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ক্ষমতায় গেলে নগরায়ণ ও আবাসনে পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলা হবে। সীমিত আয়ের মানুষ ও বস্তিবাসীদের জন্য আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। সমন্বিত বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা, ‘ভূমি ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা, ‘ভূমিসেবা মেলা’ আয়োজন, স্থানীয় সরকার ক্ষমতায়ন এবং ‘সিটিজেনস সার্ভিস কর্নার’ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। নিজ ধর্ম পালনে প্রত্যেককে স্বাধীনতা দিতে চায় বিএনপি।
দলের ইশতেহারে বলা হয়েছে, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’। প্রত্যেক নাগরিক নিজের ধর্ম পালনের পূর্ণ অধিকার ভোগ করবেন। কাউকে কোনো নাগরিকের ধর্মবিশ্বাসে আঘাত করতে দেওয়া হবে না। খতিব, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও অন্যান্য ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বৃদ্ধি করা হবে। ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
সংবাদকর্মীদের কল্যাণে জাতীয় সাংবাদিক অবসর কল্যাণ বোর্ড গঠন করা হবে: গণমাধ্যম বিষয়ে বিএনপি’র প্রতিশ্রুতিতে বলা হয়, সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা ও কাজের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। আইনি জটিলতা ও হয়রানি দমন করা হবে এবং রাজনৈতিক পক্ষপাত বন্ধ করা হবে। জবাবদিহিমূলক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো প্রতিষ্ঠা ও সাংবাদিক হত্যায় বিচার নিশ্চিত করা হবে। সংবাদমাধ্যম কর্মীদের কল্যাণে জাতীয় সাংবাদিক অবসর কল্যাণ বোর্ড গঠন করা হবে।
ক্ষমতায় গেলে ৯টি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার বিএনপির: আগামী দিনে ক্ষমতায় গেলে ৯টি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে বিএনপি। নির্বাচনী ৯ প্রধান প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে- প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। অর্থসেবার এই পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে। কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষি বীমা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ জোরদার করা হবে। মৎস্যচাষী, পশুপালনকারী খামারি ও কৃষি খাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এই সুবিধা পাবেন। দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশব্যাপী ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা, মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা এবং রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন, প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা এবং ‘মিড-ডে মিল’ চালু করা হবে। তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্তকরণ এবং মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে। ক্রীড়াকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে।
পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে দেশপ্রেমী জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল খনন ও পুনঃখনন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে। ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করা হবে। ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম (পেপাল) চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ করা হবে।
ভোরের আকাশ/এসএইচ