বিএনএম নেতা কামরুলের ‘প্রতারণা’য় বহুজন নিঃস্ব

কিংস পার্টি হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্টের (বিএনএম) নেতা কামরুল আহসানের ‘প্রতারণা’র শিকার হয়ে সর্বস্ব হারানোর অভিযোগ করেছেন অনেকেই। ‘ভার্সেটিলো’ নামের কোম্পানি খুলে তুরস্ক ও রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশে শ্রমিক পাঠানোর নামে ৫টি এজেন্টের কাছ কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়াও ‘কামরুল এগ্রো’ নামের প্রতিষ্ঠান বিক্রি করার নামে প্রতারণা এবং তার প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যাওয়া কর্মকর্তাদের নানাভাবে হেনস্তা করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কামরুল আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এখন বেশিরভাগ সময় থাকেন দেশের বাইরে। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে এখন যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়েছেন ভুক্তভোগীদের অনেকে। অবশ্য কামরুল বলছেন, ‘তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সত্য নয়।’
ভুক্তভোগীদের একজন রাজধানীর শান্তিনগরের স্পেকট্রাম ইন্টারন্যালনের স্কুলের সিইও নূর আহমেদ খোকন। তিনি বলেন, ‘২০০৯ সালে কামরুলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। একপর্যায়ে ভালো সম্পর্ক তৈরি হলে কামরুলের মালিকানাধীন ‘কামরুল এগ্রো’ কেনার প্রস্তাব দেন। যার প্রেক্ষিতে ২০১০ সালে আমি ও আমার স্কুলের পরিচালক তানভীর ফয়সালসহ কয়েকজন মিলে ‘ভিভিড’ নামে প্রতিষ্ঠান খুলে ৮/১০ জনের কাছ থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকা দেই তাকে।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘চুক্তি অনুযায়ী কোম্পানি বুঝে না দিয়ে তিনি নানা অজুহাত শুরু করেন। ২০১১ সালের পর নিশ্চিত হই যে আমরা প্রতারণার শিকার। প্রায় দুই বছর পর ৫০ লাখ টাকার চেক দিলেও মাত্র ৫ লাখ টাকা পেয়েছি। কামরুলের দেয়া এবি ব্যাংকের চেক থাকলেও আজও বাকি টাকা আর পায়নি। চাইতে গেলে নানা হুমকি পেয়েছি। আমি বিচার চাই।’
একই ঘটনার ভুক্তভোগী উদ্যোক্তা তানভীর ফয়সাল বলেন, ‘ড. কামরুল আহসানের প্রতারণায় উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নে বিনিয়োগ করে জীবনের কয়েকটি বছর চোখের পানি নিয়ে কাটিয়েছি। টাকা চাইতে গেলে কামরুল আওয়ামী লীগের আমলে সরকারের মন্ত্রীসহ নানা লোকের সঙ্গে ছবি দেখিয়ে জীবন হারানোর হুমকি দিতেন।’
রাজধানীর বিজয়নগরের আল-রাজী কমপ্লেক্সে অফিস রয়েছেÑএমন একজন জনশক্তি রপ্তানিকারক এজন্ট নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘তুরস্ক, রাশিয়া ও হাঙ্গেরীতে জনশক্তি রপ্তানির কথা বলে কামরুলের মালিকানাধীন ‘ভার্সেটিলো গ্রুপ’ মাধ্যমে আমার কাছ থেকে দেড় কোটি টাকার বেশি নিয়েছেন। কিন্তু কাউকে বিদেশে পাঠাননি। এখন তিনি দেশের বাইরে। ফোনও ধরেন না। অথচ আমি মানুষের টাকা নিয়ে বিপদে। আমরা আইনি ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন ভুক্তভোগী প্রমাণপত্র দিয়ে বলেছেন, ‘তাদের কাছ থেকে তিনটি দেশে লোক পাঠানোর কথা বলে প্রায় চার কোটির বেশি টাকা নেয়া হয়েছে। লিখিত অ্যাগ্রিমেন্ট তৈরির পর কয়েক কিস্তিতে ওই টাকা দেন তারা। সব কাগজ রেডি হয়ে গেছে জানিয়ে, ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি তাদেরকে প্রত্যেক প্রার্থীর ভিসা ফি বাবদ ৩০ হাজার টাকা দেয়ার জন্যে ভার্সেটিলো এইচআর সলুশন স্কিলস এন্ড আউটসোর্সিং কোম্পানি থেকে তৎকালীন সিইও সাইফুর রহমান তাদেরকে চিঠিও দেন। সেই অনুযায়ী টাকা দেয়া হয়।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৫টি এজেন্টের মাধ্যমে শ্রমিক পাঠানোর কথা বলে টাকা নেয়ার পর ১ হাজার ৫৫৫ জন বিদেশ গমনেচ্ছুক ব্যক্তির মেডিক্যালও করানো হয়। এই তালিকা প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে।
স্বাভাবিকভাবে মেডিক্যাল করতে সর্বোচ্চ এক থেকে দুই হাজার টাকা লাগলেও মেডিক্যাল সেন্টার নির্দিষ্ট করে দিয়ে প্রত্যেক প্রার্থীর কাছ থেকে নেয়া হয়েছে ১০ হাজার টাকা। অর্থাৎ এখানেও প্রায় দেড় কোটি আত্মসাত করা হয়েছে। রাজধানীর পল্টনের ‘স্টার মেডিক্যাল’, ‘হাটখোলা রোডের ইদান মেডিক্যাল’, ‘ভাটারার স্ট্যান্ডার্ড মেডিক্যাল’ ও শান্তিনগর এলাকার ‘বসুন্ধরা মেডিক্যাল’ থেকে মেডিক্যাল চেক-আপ করাতে বাধ্য করা হয় তাদের। দীর্ঘদিন ধরে ঘুরে বিদেশ যেতে না পেরে তার্কি গমনেচ্ছুক হোসাইন খান (যার-পাসপোর্ট নং-০৭৪৩৯১৯২) বলেন, ‘বিদেশ যে না পেরে আমরা স্টার মেডিক্যাল সেন্টারে যোগাযোগ করলে জানতে পারি ‘ভার্সেটিলো’ গ্রুপের সঙ্গে তাদের কন্ট্রাক রয়েছে।’ এ ব্যাপারে রাজধানীর পুরানা পল্টনের স্টার মেডিক্যাল সেন্টারের ফ্রন্ট ডেস্ক অফিসার আসাদুর রহমান বলেন, ‘এতো বেশি টাকা কেন নিয়েছেন বা কেন মেডিক্যাল করার পরও ভুক্তভোগীরা বিদেশ যেতে পারছেন না, এটা আমাদের বিষয় নয়। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ভার্সেটিলো’র সঙ্গে মেডিক্যালের জন্যে তাদের চুক্তি ছিল। ভার্সেটিলো কর্তৃপক্ষ বলতে পারবেন কেন তারা পাঠাতে পারেননি।’
ভার্সেটিলো গ্রুপের চেয়ারম্যান কামরুল আহসানের সাবেক সেক্রেটারি আমিনুল হক বলেন, ‘২০২৪ সালের আগস্টের পরপরই তিনি চাকরি ছেড়ে আসেন। তিনি নিশ্চিত করেন, কামরুল রাশিয়াসহ তিনটি দেশে লোক পাঠানোর প্রকল্প নিয়ে কাজ করছিলেন। তিনি চাকরি ছেড়ে আসার আগেই দুইজন শ্রমিক পাঠানোর জন্যে যে টাকা দিয়েছিলেন, তা ফেরত চাইছিলেন। ভার্সেটিলোতে চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন এমন অনেকের টাকা-পয়সা নিয়েও ঝামেলা রয়ে গেছে।’
প্রভাবশালীদের ব্যবহার: কামরুল আহসান আওয়ামী লীগের প্রভাবশালীদের ব্যবহার করে প্রতারণা করতেন। প্রমাণ স্বরুপ একজন ভুক্তভোগী আওয়ামী লীগের সরকারের সাবেক প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমদ ও বিতর্কিত ব্যবসায়ী পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান নাফিস সারাফতের সঙ্গে কামরুল আহসানের ভিডিও সরবরাহ করেন। ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের বন্ধু পরিচয় দিতেন এই কামরুল। সাকিব আল হাসানের সঙ্গে তার রয়েছে ছবি।
অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে, ড. কামরুল আহসানের নামে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি চাঁদাবাজির মামলা রয়েছে। ২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি দায়ের করা ওই মামলার বাদী মো. জাহাঙ্গীর আলম। মামলায় ড. কামরুল আহসানকে ১৩ নম্বর আসামি করা হয়েছে এবং সেখানে তাকে স্বৈরাচারের সহযোগী হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, গত বছরের শেষ ভাগে ড. কামরুল আহসানকে ঘিরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয় যে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও রং পাল্টিয়ে সুযোগ নিচ্ছেন। বিদেশে অবস্থানরত এক সাংবাদিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে নিয়ে একটি স্ট্যাটাস দিলে বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগগুলো প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে।
অনুসন্ধান বলছেন, ২০২৪ সালের ‘একতরফা ও পাতানো’ নির্বাচনের আগে প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ও প্রশাসনের বিশেষ মহলের সহযোগিতায় কিংস পার্টি খ্যাত ‘বিএনএম’-এ যুক্ত হন কামরুল। বিএনপি নেতাদের বাগিয়ে নির্বাচনে আনার নেয়ার চেষ্টার করতেন তিনি।
বিএনএমের তৎকালীন চেয়ারম্যান শাহ মো. আবু জাফর বলেন, ‘ড. কামরুল আহসান আমাদের দলের কো-চেয়ারম্যান। এখনো তার নিয়ন্ত্রণে বিএনএম। গত নির্বাচনের আগে কামরুলই বিএনএম’র সব ছিল। আমি এখন আর নেই বিএনএমে নেই।’
বিএনএম গঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা ব্যারিস্টার এম. সারোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি ও মেজর (অব.) মো. হানিফসহ কয়েকজন মিলে ভালো উদ্দেশ্যে সংগঠনটি করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ’২৪-এর নির্বাচনের আগে মূল উদ্যোক্তাদের বাদ দিয়ে কামরুল আহসানসহ কয়েকজন সরকারের সহযোগিতায় দলটি কজ্বায় নেন। কামরুল প্রকৃতপক্ষে একজন প্রতারক। তার নামে শুনেছি, প্রতারণা মামলাও রয়েছে।’
নিজেকে বাঁচাতে মুক্ত রাখতে কামরুল এখন বিএনপির ছায়াতলে আসার চেষ্টা করছেন বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন। মাঝে মধ্যে ফোন ধরে কামরুল দ্রুতই বিএনপির কমিটিতে আসছেন বলেও প্রচার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে কামরুল আহসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে তা লিখিতভাবে জানাতে। পরে লিখিতভাবে তার বিরুদ্ধে প্রতারণা সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অভিযোগসমূহ সম্পূর্ণ বানোয়াট ও মিথ্যা। আমি লিখিত আকারে প্রমাণসহ প্রশ্নের উত্তর আগামী সপ্তাহের মধ্যে পাঠাবো।’
ভোরের আকাশ/এনএস