জাতীয় সংসদ নির্বাচন
বিএনপির নজরে তরুণরা

১২ দিন পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ও জামায়াতে ইসলামী জোটসহ ৫১টি দল। দলগুলোর এবং স্বতন্ত্র মিলিয়ে ভোট যুদ্ধে অংশ নিয়েছে প্রায় দুই হাজার প্রার্থী। ভোটের মাঠে জয় পেতে পুরোদমে প্রচার-প্রচারণায় রয়েছে প্রার্থীরা। আগামী নির্বাচনেও জয়-পরাজয়ে ‘ফ্যাক্টর’ হবে তরুণ ভোটার। আর এ বিষয়টিকে মাথায় রেখে গত বছর মে মাস থেকেই কাজ করছে বিএনপি। তারই ধারাবাহিকতায় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দলটির নির্বাচনি ইশতেহারেও সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে তরুণদের প্রত্যাশা-আকাক্সক্ষা। ক্ষমতায় এলে ১৮ মাসের মধ্যে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিক্ষিত বেকারদের জন্য এক বছরের ভাতা চালুর প্রতিশ্রুতি দলটির। কাজেই কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ প্রযুক্তিনির্ভর যুবশক্তি গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির-এমনটাই বলছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, দেশের ১৩ কোটি ভোটারের মধ্যে গত দেড় দশকে প্রায় ৪ কোটি নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছে। শেখ হাসিনার শাসন আমলের গত দেড় দশকের ভোট প্রয়োগের অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল এই তরুণরা। কাজেই ভোটের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ কাজে লাগিয়ে স্বাবলম্বী বাংলাদেশ গড়তে তরুণদের পাশে টানছে বিএনপি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তরুণদের মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষে গত বছর মে মাস থেকেই বিভিন্ন সভা-সেমিনার করেছে বিএনপি। কর্মসংস্থান, বহুমাত্রিক শিল্পায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মৌলিক অধিকার, কৃষি উন্নয়ন, পরিবেশ রক্ষা এবং নাগরিক সমস্যা নিয়ে তরুণদের বক্তব্য ও মতামতকে গুরুত্ব দিচ্ছে দলটি। তরুণদের আকাক্সক্ষা ও মতামতের ভিত্তিতেই আগামীতে পথ চলবে বিএনপি। কারণ তরুণরাই হচ্ছে একটি রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি। মেধাবী তরুণরা কর্মসংস্থান না পেয়ে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে। দেশ হারাচ্ছে মেধাবী সন্তান; যা উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তরুণদের এ মেধা, জ্ঞান এবং তাদের স্বপ্ন ধারণ করে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে চায় দলটি-মনে করছে রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, গত বছর জুলাই মাসে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) ও অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের যৌথভাবে পরিচালিত 'ইউথ ইন ট্রানজিশন' শীর্ষক জরিপে এমন তথ্য দেখা গেছে, ৩৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ তরুণ ভোটার বিএনপিকে ভোট দিতে চান। তরুণদের ভাবনায় দেশ গড়ার লক্ষ বিএনপির। ভোটের মাঠে প্রচার-প্রচারণাকালে সিলেট, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ ও রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের জনসভায় তরুণদের ভাবনা ও প্রস্তাবকে গুরুত্বের সঙ্গে শুনেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বিএনপির সূত্রে জানা যায়, জনগনের ভোটে ক্ষমতায় এলে ১৮ মাসের মধ্যে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিক্ষিত বেকারদের জন্য এক বছরের ভাতা চালুর অঙ্গীকার থাকছে দলটির।
সূত্র আরো জানায়, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০ রূপকল্প এবং তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফার আলোকে তৈরী হয়েছে বিএনপির ‘নির্বাচনী ইশতেহার’। এমনকি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফাকে ভিত্তি ধরে গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে বাস্তবধর্মী এই ইশতেহার প্রণয়নের কাজ প্রায় চূড়ান্ত।
ইশতেহার প্রণয়ন কমিটির একাধিক সদস্য জানান, এবারের ইশতেহারে নারীর ক্ষমতায়ন ও তরুণ প্রজন্মের চাহিদাকেই প্রধানত অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি থেকে শুরু করে কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি এবং বেকার ভাতা চালুর প্রতিশ্রুতি থাকছে নির্বাচনী ইশতেহারে। আটটি মৌলিক বিষয়ে বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, হেলথ কার্ড, জলবায়ু ও পরিবেশ রক্ষা, শিক্ষা ও দক্ষ জনশক্তি তৈরি, ক্রীড়া ও ধর্ম। বাসযোগ্য, আধুনিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে নানা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দিয়েছে বিএনপি। এ ছাড়া প্রিভেন্টিভ হেলথকেয়ারে গুরুত্ব দিয়ে চায় দলটি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন, বিএনপির এই পরিকল্পনা সাধারণ মানুষ ভালোভাবে গ্রহণ করবে। কারণ সমাজের শোষিত, নিষ্পেষিত মানুষ খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার জন্য নিশ্চয়তা চায়। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ যে পরিকল্পনার কথা তারেক রহমান তুলে ধরছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা এবং দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার মাধ্যমে তরুণদের ভবিষ্যৎ তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির। প্রাথমিক শিক্ষায় বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। প্রাথমিক থেকে দক্ষ করতে তুলতে বাংলা, ইংরেজি ভাষার বাইরেও একাধিক ভাষা শেখানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে। শিক্ষকদের অবস্থান ও আর্থিক সুরক্ষা উন্নত করা হবে। পাঠ্যক্রমের সঙ্গে শিল্প ও কর্মক্ষেত্রের বাস্তব যোগসূত্র তৈরি করা হবে, যেন শিক্ষার ফলটা বাস্তবে চাকরি ও উদ্যোগের ক্ষেত্রে কাজে লাগে।
একইসঙ্গে জোনভিত্তিক শিল্পায়নে বিএনপির পরিকল্পনায় রয়েছে ইপিজেড- কেইপিজেডের মতো অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করা। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে। শিল্পকে আধুনিক শিল্পে রূপান্তর করা হবে। এসএমই, ব্লু ইকোনমি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং আইসিটি খাতে ব্যাপক নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি করা হবে, যাতে পরিবারে আয় বাড়ে ও অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হয়। ক্রীড়াকে শুধু শখ নয়, পেশা হিসেবেও গ্রহণযোগ্য করতে বিএনপি সর্বস্তরে খেলাধুলার মানোন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেবে। স্কুল ও কলেজে খেলাধুলাকে বাধ্যতামূলক করা হবে এবং পর্যাপ্ত ক্রীড়া শিক্ষক ও প্রশিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে। বিএনপি নবায়নযোগ্য শক্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিং বাড়িয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করবে। পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন বাড়াতে এবং মৌসুমি বন্যা থেকে মানুষকে রক্ষা করতে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন করা হবে। বিএনপির পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি মসজিদের খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং অন্যান্য ধর্মের পুরোহিত, পাদ্রিসহ ধর্মীয় নেতারা মাসিক ভিত্তিতে সম্মানি পাবেন, যাতে তাঁদের জীবনমান উন্নত হয়।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, তরুণরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ। বিগত দেড় দশকে অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে জীবন বিলিয়ে দেওয়া শহীদদের কাক্সিক্ষত বাংলাদেশ তরুণদের হাত ধরেই গঠিত হবে। স্বাবলম্বী বাংলাদেশ গড়তে গত দেড় দশকে ভোট প্রয়োগের অধিকার বঞ্চিত তরুণদের সমর্থন ও সহযোগিতা চাই।
নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ ও রাষ্ট্র সংস্কারে তরুণ প্রজন্মের ভাবনাকে প্রাধান্য দিতে সম্প্রতি সিলেটে এক সভায় অংশ নিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, আগামীর বাংলাদেশ গড়তে হলে তোমাদের মেধা ও দক্ষতাকে কাজে লাগাতে হবে। কেবল পরিকল্পনা নয়, তরুণদের বাস্তবসম্মত পরামর্শই হবে রাষ্ট্র মেরামতের মূল ভিত্তি।
এ ব্যাপারে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, তরুণদেরকে মানব সম্পদে পরিনত করাসহ বিএনপি ঘোষিত রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফার আলোকে নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করা হচ্ছে।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ইশতেহার নিয়ে আমাদের কাজ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। সেখানে তরুণ প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ বেশ কিছু বিষয়ে অগ্রাধিকার থাকছে। কিছু স্বল্পমেয়াদি, কিছু মধ্যমেয়াদি, কিছু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকছে।
তিনি বলেন, তরুণদের অগ্রাধিকার দিয়ে কর্মমূখী ও গণমুখী কর্মসূচি থাকছে ইশতেহারে। এছাড়াও মূল ফোকাস রয়েছে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, পরিবেশে ও যোগাযোগ ব্যবস্থার দিকে। জিয়াউর রহমানের খাল কাটা কর্মসূচি আরো ব্যাপকভাবে চালু করে পানি ধরে রাখা, এর মাধ্যমে পানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।
ইশতেহার প্রণয়ন কমিটির সদস্য ও বিএনপি নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ডা. মাহদী আমিন বলেন, এবারের ইশতেহার কোনো গতানুগতিক ধারায় হবে না। কর্মমূখী ও কল্যাণমূখীসহ বাস্তবধর্মী জীবনধারা ইশতেহার ঘোষণা করা হবে। এমন ইশতেহার ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বাহরাইনে নিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রদূত ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী।
তিনি বলেন, ইশতেহার নিয়ে যেটুকু জেনেছি, এগুলো ভালো কর্মসূচি। আমি মনে করি, তরুণদের অগ্রাধিকার দিয়ে কর্মমূখী ও গণমুখী কর্মসূচি থাকছে ইশতেহারে। আমরা একটি কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থাও বিএনপির ইশতেহারে। ফ্যামিলি কার্ড, এটা গণমুখী। কৃষকদের যে কার্ডের কথা বলা হচ্ছে, এটা কৃষকের ভাগ্য উন্নয়নের পরিকল্পনা। এটা ইতিবাচক হিসেবে দেখি।
ভোরের আকাশ/এসএইচ