তারেক রহমান এখন বিএনপির চেয়ারম্যান

দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান স্বয়ংক্রিয়ভাবে চেয়ারম্যানের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর কারণে বিএনপির চেয়ারপারসনের পদ শূন্য হয়ে গেছে। কাজেই দলটির গঠনতন্ত্র মতে তারেক রহমান এখন বিএনপির চেয়ারম্যান। তবে দলটির পক্ষ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তারেক রহমানই এখন দলের চেয়ারম্যান। তবে কৌশলগত কারণে তা ঘোষণা করা হচ্ছে না। খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে পুরো দেশ এখন শোকার্ত। তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক গতকাল শেষ হলেও চলছে দলীয়ভাবেও সাত দিনের শোক। এমন পরিস্থিতিতে স্থায়ী কমিটির আগামী সভায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা আসবে বলেও দলটির বিশ^স্ত সূত্রে জানা গেছে।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর খালেদা জিয়া দলটির হাল ধরেন। রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার আড়াই বছরের মধ্যে তিনি চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। সেই দায়িত্বের ৪১ বছর পূর্ণ হয় গত মে মাসে। এই দীর্ঘ সময়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি তিনবার বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় যায়। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান।
বিএনপির গঠনতন্ত্রের ৭ (গ) ধারায় দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের কর্তব্য, ক্ষমতা ও দায়িত্বের উপধারা ২ অনুযায়ী চেয়ারম্যানের সাময়িক অনুপস্থিতিতে তিনিই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে চেয়ারম্যানের সমুদয় দায়িত্ব পালন করবেন। এই ধারার নিয়মে তারেক রহমান ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন। সেই থেকে তিনি এ দায়িত্ব পালন করছেন। এখন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গঠনতন্ত্রের ৭ (গ) ধারায় দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের কর্তব্য, ক্ষমতা ও দায়িত্বের উপধারা ৩ অনুযায়ী চেয়ারম্যান হয়েছেন।
সেখানে বলা হয়েছে, যে কোনো কারণে চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হলে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান বাকি মেয়াদের জন্য চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন এবং গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরবর্তী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্বে বহাল থাকবেন। গঠনতন্ত্রের এ বিধানের কারণে বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানের নিযুক্তির জন্য আলাদা কোনো ঘোষণা দেওয়ার দরকার নেই। যদিও দলের বিভিন্ন সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এখনও তারেক রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শুধু বিএনপির নেতাকর্মী নয়, পুরো দেশ অভিভাবকহীনতায় আছে। তাঁর ছেলে তারেক রহমানও শোকে মুহ্যমান। এ রকম পরিস্থিতিতে দলের পদ-পদবি নিয়ে কারও কোনো চিন্তা নেই। তবে অবশ্যই তারেক রহমান এখন দলের চেয়ারম্যান।
কারাবরন ও রাজনৈতিক ইতিহাস
তারেক রহমান (জন্ম: ২০ নভেম্বর ১৯৬৫) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। তিনি এর আগে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। মি: রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক উত্থান-পতনের একজন সাক্ষী এবং অংশগ্রহণকারী। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়, যখন তার পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং দেশকে স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধ শুরু করেন, তখন তাকে, তার মা এবং তার ভাইকে, অন্যান্য আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধা সামরিক কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের সাথে গ্রেফতার করা হয়। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য কারাবন্দী হওয়া সর্বকনিষ্ঠ কারাবন্দীদের একজন।
ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজে প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করে ১৯৮০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটল, হবস, লক, রুশো, ভলতেয়ার, কার্ল মার্কস এবং অন্যান্য ব্যতিক্রমী চিন্তাবিদদের রাজনৈতিক চিন্তাধারা পড়েছিলেন। ১৯৮৬ সালে, এরশাদ সরকারের পাতানো নির্বাচনের প্রাক্কালে, তিনি গৃহবন্দিত্ব এড়িয়ে এবং প্রেসক্লাবে একটি প্রেস কনফারেন্সে কীভাবে নিরাপত্তা সংস্থাগুলি একতরফা নির্বাচনের বিরুদ্ধে তাদের আন্দোলনকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল তাঁর বর্ণনা করেন। ফলস্বরূপ, তার কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার জন্য, জেনারেল এইচ এম এরশাদের স্বৈরাচারী সরকার তাকে তার মায়ের সাথে গৃহবন্দী করে রাখে একাধিকবার।
এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি তার মায়ের সাথে রাজপথে আন্দোলনে যোগ দেন এবং ১৯৮৮ সালে দলের গাবতলী উপজেলা ইউনিটে সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপিতে যোগদান করেন। তিনি তৃণমূল থেকে জনগণকে সংগঠিত করেছিলেন এবং এইচ এম এরশাদের সরকারের পতনে অবদান রেখেছিলেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে তিনি তার মা বেগম খালেদা জিয়ার সাথে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় প্রচারণা চালিয়ে নির্বাচনে বিজয় অর্জন করেন। তার মা বেগম জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।
তিনি বগুড়ায় তৃণমূল থেকে নেতা নির্বাচনের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সূচনা করেছিলেন, যেখানে বিএনপি শাখার একজন নির্বাহী সদস্য ছিলেন। ১৯৯৩ সালে বগুড়া জেলা ইউনিটে তিনি একটি সম্মেলনের আয়োজন করেন যেখানে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়। বগুড়ায় সফল সম্মেলনের পর তিনি অন্যান্য জেলা ইউনিটকে গণতান্ত্রিকভাবে নেতা নির্বাচন করতে উৎসাহিত করেন।
২০০১ সালের নির্বাচনের আগে, তিনি স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যা এবং সুশাসনের উপর গবেষণা করার জন্য ঢাকায় একটি অফিস প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের সদস্যদের সঙ্গেও তিনি আলোচনা করেন। তার প্রচেষ্টায় ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। চেয়ারপারসনের ছেলে হয়েও এবং তৃণমূল থেকে ব্যাপক সমর্থন পাওয়া সত্ত্বেও তিনি স্বজনপ্রীতি করে কোনো মন্ত্রিত্ব বা সংসদ সদস্যপদ গ্রহণ না করে দলের তৃণমূলের ক্ষমতায়নে মনোনিবেশ করেন। দল সংগঠনে তার প্রচেষ্টার স্বীকৃতি হিসেবে ২০০২ সালে স্থায়ী কমিটি তাকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক পদে মনোনীত করে।
২০০৫ সালে, তিনি দেশব্যাপী তৃণমূল সম্মেলন আয়োজন করেন এবং বাংলাদেশের প্রতিটি উপজেলা ইউনিটের সাথে মতবিনিময় করেন। এই সম্মেলনের সময় তিনি তৃণমূল নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলা, স্থানীয়দের সাথে মতবিনিময় করা এবং সমর্থকদের চিন্তাধারা শোনেন এবং জনগণের কাছে বিএনপির কর্মসূচী প্রচার করেছেন। তিনি কৃষকদের জন্য সরকারী ভর্তুকি, বয়স্কদের জন্য ভাতা, পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য প্লাস্টিক ব্যাগ বিরোধী আন্দোলন, এবং নারী শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি বিতরণ সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করেন, যা স্কুলে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য কমিয়ে ভারসাম্য আনতে সহায়ক হয়। তিনি ব্যক্তিগতভাবে সম্মেলনে নিবন্ধনকারীদের অন্তত ১৮০০০ চিঠির উত্তর দেন।
২০০৭ সালে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সামরিক শাসকদের বেআইনি ক্ষমতা দখলের পর জনাব তারেক রহমানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়। তখনকার সরকারি দপ্তরের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা জানান যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ব্যক্তিরা দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তাদের মি. রহমানের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করতে বাধ্য করেছিল। এসময় তার মা বেগম জিয়াকে দেশত্যাগে বাধ্য করতে তাকে গ্রেপ্তার করে নির্যাতন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে যেতে হয়েছিল।
তিনি ২০০৯ সালে বিএনপির সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ধীরে ধীরে বিএনপির পুনর্গঠনে যুক্ত হন। ২০১৮ সালে, যখন তার মা, সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, বেগম খালেদা জিয়া মিথ্যা অভিযোগে কারাগারে বন্দী হন, তখন তাকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন মনোনীত করা হয়। তখন থেকেই তিনি স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। জনকল্যানমূখী, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিব বাংলাদেশ গঠনে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা করছেন তিনি।
ভোরের আকাশ/এসএইচ